অবসেশন

  • 0

অবসেশন

অবসেশন

 

যখন আমি ক্লাস ফোরে পড়ি তখন কোন জায়গায় ময়লা দেখলে, আবর্জনা হতে দেখলে বা আবর্জনা হয়ে থাকলে আমি তা না পরিষ্কার করা পর্যন্ত স্থির থাকতে পারতাম না। না পরিষ্কার করলে মাথায় শুধু ঐ চিন্তায় ঘুরত, পরিষ্কার করা হলে তারপর ভাল লাগত। মনে হতো ঐ জামা না ঢিলা করা পর্যন্ত কিছুই করতে পারতাম না বা পড়তে পারতাম না। অতএব যখন ক্লাস নাইনে পড়ি তখন খুব বেশি ঘুম আসত। অতিরিক্ত ঘুম আসত। অতিরিক্ত ঘুম হতো। তারপর পরীক্ষার সময় কিছুই পড়া হয়নি, এই চিন্তা করতে করতে হঠ্যাৎ মাথা কেমন যেন হল। তিন মাস অসুস্থ থাকার পর সুস্থ হলাম। তারপর থেকে দেহের কোন বিশেষ অঙ্গ নিয়ে সন্দেহ হত। এই সন্দেহটা এমন যে, এটা সব সময় মাথায় থাকত। ভুলার চেষ্টা করলেও ভুলতে পারতাম না। এই সন্দেহটা এখনও আছে। ছোটবেলা থেকে কেনা অপরিচিত স্থানে গেলে অস্থির লাগতো। কোন ক্রমেই আনন্দ লাগত না। বিভিন্ন চিন্তা আসত। এইটে থাকতে যখন অসুস্থ হয়ে গেলাম তারপর থেকে বুকে ধড়ফড়ের রোগটা বেড়ে গেল। এখন যে কোন চিন্তা করলেই বুক ধড়ফড় করে। এমন অবস্থা তে হতে এখন যে কোন পদক্ষেপে বা সব সময় সব কিছুতেই সন্দেহ, উদ্বেগ, শংকা, ভয় লাগে।

আত্মবিম্বাস আনতে চাইলেও তা হারিয়ে যায় বা সবাই আমাকে এত বুঝাচ্ছে যে, এসব চিন্তা করো না তাতেও আমার কোন ভ্রুক্ষেপ হয় না বা কোন অনুভূতি বা বোঝ আসে না। বোঝ আনতে চাইলেও আসে না। আমি যখন অসুস্থ হয়ে যাই তখন আমার মনে হয় সবাই সুখে আছে আর আমি একমাত্র অসুখী। ছোটবেলা থেকেই বা বাসার কারও জন্য কোন মায়া লাগে বা কোন অনুভুতি নেই। মাঝে মাঝে এমন হয় যে,  ভয়ের জিনিস দেখলেও ভয় লাগে না আবার আনন্দের জিনিস দেখলেও আনন্দ লাগে না। কারও সাথে কথা বলতে গেলেও সংকোচে ভুগি। ভাবি তার সাথে ঠিকমত কথা বলতে পারছি কিনা। আবার মনে হয় হাটার সময় আমাকে কেউ পাগল বলছে। স্মার্ট হতে চাইলেও হতে পারি না। সব সময় মনে হয় মাথায় কোনো একটা সমস্যা আছে। এই ধরনের চিন্তা বার বার মাথায় আসে। ঘুম থেকে উঠেই চিন্তা শুরু হয়, সারাদিন একই চিন্তা করার পরে মাথা গরম হয়ে যায়। এখন আমার হাত ধোবার প্রবণতা বেড়ে গেছে। চারদিকে মলমুত্র আছে, নেংরা আছে তা মনে হয়।

আলোচনা

গ্রামেগঞ্জে আমরা উপরের রোগটিকে সূচীবায়ু বলে আখ্যায়িত করি। মেডিকেলের পরিভাষার অবসেশন। অবসেশন রোগটির মূলত দুটি ভাগ রয়েছে। একটি ভাগ মানুষের চিন্তা চেতনার আরটি ভাগ কাজের মধ্যে। উপরের উদাহারণে রোগীর দুই ভাগের উপসর্গের কথা জানা যায়। চিন্তা চেতনায় যারা ভোগেন তাদের মনে অসমাধানযোগ্য চিন্তা আসে। যেমন- মানুষ কেমন করে নিঃশ্বাস নেয়, শিশুরা কি করে ডোক গেলে, পৃথিবীর কেমন করে সৃষ্টি ইত্যাদি। যেমন- মানুষ কেমন করে নিঃশ্বাস নেয়, শিশুরা কি  করে ডোক গেলে, পৃথিবীর কেমন করে সৃষ্টি ইত্যাদি। আর কাজেকর্মে যাদের অবসেশন ঘটে তাদের মধ্যে এতে কাজ করার প্রবণতা থাকে। যেমন- নোংরা লেগেছে বলে হাত পার বার বার ধোয়া, ওজু ভেঙে গেছে বলে বার বার ওজু করা, বাথরুমে বেশিক্ষণ সময় থাকা। অবসেশন রোগটিকে বলা হয় নিঃসঙ্গ মহামারী। বাংলাদেশের এক বিশাল জনগোষ্ঠী এই রোগে ভুগেন।

চিকিৎসা

নতুন আবিষ্কৃত এনটি অবসেশনাল ওষুধ যেমন- সারটালিন, ফ্লোকসিটিন, ক্লোফ্যালিন দ্বারা এর চিকিৎসা করা হয়। ওষুধ চিকিৎসার পাশাপাশি বিহেভিয়ার থেরাপিও এই চিকিৎসায় অত্যন্ত উপকারী। ইদানিং মানসিক গবেষণায় এটি প্রমাণিত হচ্ছে যে, অবসেশন অসুখটি বংশ পরম্পরায় চলতে থাকে অর্থ্যাৎ পরবর্তী জেনারেশনের এই রোগটি হতে পারে।

 

অধ্যাপক ড. এ এইচ মোহাম্মদ ফিরোজ

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, মনোজগত সেন্টার


Leave a Reply