অস্থির শিশু – কিশোর

  • 0

অস্থির শিশু – কিশোর

Category : Health Tips

অস্থির শিশু – কিশোর

ওরা অকারনে চঞ্চল। হ্যাঁ, শিশু কিশোর বয়সে থাকে অফুরন্ত শক্তি প্রাচুর্য, প্রতিক্ষণে চঞ্চলতা আর চাপলতায় তারা তাদের শক্তি প্রাচুর্যকে ক্ষয় করে। কিন্তু এমনটি যদি হয় তারা চঞ্চলতার সীমা ছাড়িয়ে ক্ষতিকারক ভাঙ্গনের দিকে যাচ্ছে। এমনটি যদি হয় যে তাদের এই চঞ্চলতার সঙ্গে আনন্দের কোন যোগ নেই। তারা নিজেরা তো পাচ্ছে না কোন আনন্দ অন্যকেও আনন্দ বিলাচ্ছে না। তবে সে চঞ্চলতা চপলতাকে সন্দেহের চোখে দেখতে হবে।

যেমন ধরুন সজীবের কথা। ও ক্লাস টুতে পড়ে, ওর বয়স ৮ বছর। হঠাৎ করে E, D অক্ষরগুলো উল্টো করে লিখতে শুরু করল। সব সময় অস্থির বাড়িময়। হট্রগোল করাই যেন ওর মজা, কখনও কখনও মারামারি ভাংচুর করে। ওর মা প্রমা বুদ্ধিমতি, শিক্ষিত। কোথায় যেন পড়েছিল অক্ষর ৭ বছরের পর উল্টো করে লিখলে অবশ্যই তা অস্বাভাবিক। তখনই সে সজীবকে একজন শিশুভিত্তিক সাইকিয়াস্ট্রিটকে দেখালেন। ডাক্তার বললেন সজীবের বাংলায় বলতে গেলে অতি অমনোযোগী প্রতি অস্থির বালক। তাহলে তাকে বলব আমরা এ্যাটেনশন ডেফিসিটি হাইপার এ্যাকটিভ ডিস অর্ডার ? যদি বাচ্চার মনোযোগ খবুই কম এবং কম সময় স্থায়ীকাল এবং বয়স অনুপোযোগী এক অস্বাভাবিক আবেগ তাড়না এবং সঙ্গে সঙ্গে অস্বাভাবিক অস্থিরতাকে আমরা ADHD হলে সন্দেহ করব।

আমরা সন্দেহ করব, যদি এমনটি হয় কখনই সে স্থির নয় তাকে আমরা সন্দেহ করব। সাধারণত শতকরা ১০ থেকে ১৫ টি বাচ্চা এই এডিএইডি রোগে ভোগে। ছেলেরা মেয়েদে চেয়ে প্রায় ৪ গুন বেশি ভুগে থাকে। রোগের অনেক লক্ষণ সাধারণত ৪ বছর বয়সের আগেই প্রকাশিত হয়; তবে অব্যশই ৭ বছরের আগে। যদিও এই বয়সে তার শিক্ষনে অত প্রভাব ফেলে না। প্রভাব ফেলে সে যখন হাইস্কুলে ওঠে, তখন। এডিএইচডি একা একা থাকতে পারে। অথবা অন্য রোগের সঙ্গে যেমন বুদ্ধি প্রতিবন্ধী, অস্বাভাবিক আচরণের সঙ্গে সঙ্গে থাকতে পারে।

এই অস্থিরতায় পরিবারের প্রভাব থাকে। যেসব পরিবারে এটপিক রোগ যেমন হে ফিবার, এ্যাকজিমা, এ্যাজমা, রোগের প্রকোপ থাকে সেসব পরিবারের সদস্যদের এই অস্থিরতা রোগটা বেশি হতে পারে। যে বাচ্চা ছোটবেলায় ম্যানিনজাইটিসে ভুগেছে তার ক্ষেত্রে এর প্রকোপ বেশি দেখা যায়। যে বাচ্চা মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়েছে তার ক্ষেত্রে এর প্রকোপ বেশি দেখা যায়। যে মা এ্যালকোহল ও টোব্যাকাতে আসক্ত এবং গর্ভে থাকাকালে এই আসক্তির প্রভাবে পরবর্তীতে বাচ্চার মধ্যে এই এডিএইচডি রোগ বেশি দেখা যায়।

অমনোযোগীতার লক্ষণ

কোন কিছু পুঙ্খানুপুঙ্খ জানার বিষয়ে আগ্রহ কম বা পারে না * পড়ালেখা  এবং খেলায় মনোযোগ ধরে রাখতে ব্যর্থ, * এক বস্তু থেকে অন্য বস্তুতে সহস্য স্থানান্তরিত হয়, * টিভি চ্যানেল মিনিটে মিনিটে পরিবর্তন করতে চায়, * কথা জানতে  একদম অন্যগ্রহ ০ উপদেশ ভুলে যায়, * ভুলের কাজ অগোছালো এবং অযত্ন ও ভূলে ভরা, * সহসাই অন্যত্র তাড়িত হয়, * যে কাজগুলোই মনোনিবেশ করা দরকার সে কাজগুলো করতে ব্যর্থ হয়,* সব সময় ছোটখাটো জিনিস হারাতেই থাকে।

অস্থিরতার লক্ষণ

০ সব সময় চিন্তার আস্ফালন, ০ সব সময় হাত পা চলছে, ০ ক্লাসরুমের সিট ছেড়ে উঠে পড়ছে বার বার, ০ অযথা দৌড়া দৌড়িতে লিপ্ত অথবা অকারণ সিড়ি বেয়ে উঠছে কিংবা নামছে। ০ বড় বেশি কথা বলতে থাকে, ০ কোন কিছুতেই সন্তুষ্ট নয়, সব সময় এটার বায়না, ওটার জন্য বায়না, ০ আপনাকে ক্লান্ত করে সে ক্লান্ত হয় না, ০ রাতে বার বার ঘুম ভেঙ্গে যায়।

অতি আবেগের লক্ষণ

০ সে বিপদ কোনটি তা বোঝে না, ০ প্রশ্নের আগেই উত্তর দিয়ে দেয়, ০ তার পালা আসার জন্য অপেক্ষার পক্ষপাতী সে নয়, ০ শৃঙ্খলকে ভেঙ্গে ফেলে, ০ চিন্তা ছাড়া কাজ করে, ০ অল্পতেই মনোযোগ শেষ, ০ নিষেধ নামক শব্দটি তার খুবই অপছন্দের।

কি করতে হবে এই রোগে

এসব লক্ষণ যদি আপনার বাচ্চার মধ্যে দেখা যায় তবে সন্দেহ করতে আরম্ভ করুন এবং ডাক্তারের সঙ্গে দেখা করুন।

কোন সিটি স্ক্যান বা কোন পরীক্ষাতে কিছু পাওয়া যাবে না। আপনার বাচ্চার আইকিউও কম হবে না্। এডিএইচডি কি পুরোপুরি সেরে যেতে পারে ? না। পুরোপুরি না সারলেও ওষুধ ও পরিবেশ এবং বাবা মা ও শিক্ষকের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অভাবনীয় উপকার পেতে পারেন।

যেসব বাচ্চা বেশি বেপরোয়া নয় কিংবা সুস্থ পরিবেশে মানুষ হয়েছে তাদের ক্ষেত্রে এই সাইকোস্টিমেুলেন্ট ওষুধ মিথাইল ফেনিডেট (রিটালিন) মারাত্মক কাজ করে। তেমন কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও নেই তাতে। একটা বড়ি প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার আগে খাওয়াতে হবে।

বাবা মায়ের জন্য পালণীয় বিষয়

০ যখন সে ভাল কাজ করবে তখন তাকে প্রশংসা করুন। প্রশংসা তাকে অভাবনীয়ভাবে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। ০ তাকে বকা যাবে না, মারা যাবে না। তাতে আরও খারাপ হবে। বার বার ভালবাসার সঙ্গে তাকে সংশোধন করুন। ০ যেখানে ছেলেটাকে বেশিক্ষণ বসে থাকতে হবে স জায়গাটা তার জন্য পরিত্যাগ করাই ভাল। ০ পরিষ্কার কিছু পজিটিভ নিয়ম বেধে দিন সেখানে আপনার মনোভাব সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে, ০ সকাল বেলাতে শারীরিক কসরত করান।

০ কম্পিউটার কিংবা পাস টপস দিন ওকে। ০ চেষ্টা করুন তাকে দিয়ে জোরে জোরে পড়বার, নেটা করবে সে। ০ পড়াশোনা এমন একটা শান্ত পরিবেশে করবে যেখানে আসবে না কোন ফোনের রিং টোন। ০ টিভি দেখা কমিয়ে দিতে হবে। ০ যোগ আসন আপনার বাচ্চার মস্তিস্কে শান্ত করবে। ০ প্রার্থনারও আছে অলৈাকিক শান্ত করার ক্ষমতা ও আপনার ডাক্তারের সঙ্গে যথাযথ যোগাযোগ অব্যহত রাখুন। শিক্ষকেরও ভূমিকা অনেক বেশি। তাকেও একটা পজিটিভ সহযোগীতার হাত বাড়াতে হবে।

পরিশেষেঃ এডিএইচডি পুরোপুরি ভাল হবে না। তবে তারা পরিবেশের সঙ্গে কেমন করে খাপ খাওয়াতে হবে তা শিখবে। তারা স্কুলে ভাল না করলেও কর্মক্ষেত্রে করতে পারে ভাল। সুতারাং হতাশ হবার কিছু নেই।

যেসব ক্যারিয়ার এডিএইচডি বাচ্চাদের জন্য ভাল তা হলো যুক্তিনির্ভর, আইটির কাজ, খেলাধুলার জগত, সম্পাদনা ও ব্যবসা বাণিজ্য।

যদি এডিএইচডি বাচ্চার চিকিৎসা না হয় তবে সে তার স্কুলে খারাপ করতে পারে। আত্মমর্যাদাহীণ হতাশাগ্রস্থ ব্যক্তিত্বে রূপান্তরিত হতে পারে। আজকের এই যে অদম্য তরুন অথবা ৪০ বছরের কাজে পারদর্শী সকল ব্যক্তি একদিন ছোট ছিল। সবাই ছোট ছিল এবং সাহায্য নিয়েছিল বেড়ে ওঠার।

ডা.   এটি এম রফিক (উজ্জ্বল)

রেজিষ্টার, শিশু বিভাগ, হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট হাসপাতাল, ঢাকা।


Leave a Reply