উদ্বেগ রোগ

  • 0

উদ্বেগ রোগ

উদ্বেগ রোগ

অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার বা দুশ্চিন্তা রোগ একটি মৃদু মাত্রার মানসিক অসুখ। একটি স্বাভাবিক সীমা পর্যন্ত অ্যাংজাইটি বা চিন্তাকারকে আমরা ডিসঅর্ডারের মধ্যে গণ্য করি না।  আমাদের দৈনন্দিন কার্যকালাপ, শিক্ষাগত নানা দিক, পেশাগত প্রক্রিয়া ইত্যাদি সবকিছুতেই স্বাভাবিক সীমা পর্যন্ত চিন্তা থাকা চাই। এটিকে কিন্তু আমরা ডিসঅর্ডার বলব না। যখন এই দুশ্চিন্তার মাত্রা আমাদের নানাবিধ জ্ঞানীয় প্রক্রিয়া এবং বাস্তব জীবনের প্রেক্ষিতে সমস্যার সৃষ্টি করে তখনই তাকে আমরা ডিসঅর্ডার হিসেবে গণ্য করে থাকি। জীবনে চলতে গেলে কতক পরিমাণ অ্যাংজাইটি থাকবে। একেবারে দুশ্চিন্তা ছাড়া বেচে থাকা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। কিন্তু এই দুশ্চিন্তাকে একটি স্বাস্থ্যকর সীমার মাঝে ধরে রাখতে পারলে সবকিছুতে আমাদের পারফরমেন্স ঠিক থাকে। উল্লেখ থাকে যে, দুশ্চিন্তা বা অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার যেমন বাস্তব কোনো ঘটনা ,  পরিস্থিতি, বিষয়, পরীক্ষা ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে পারে ঠিক তেমনি  কোনো কল্পিত বিষয়ের ওপর ভিত্তি করেও অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার দেখা দিতে পারে। এ সময়ে ব্যক্তি তার নিজের ভেতরে ব্যক্তিনিষ্ট কতক মানসিক চাপ বা টেনশনবোধ করে এবং সাথে দেকা যায় কতক সোমাটিক বা দৈহিক উপসর্গ যেমন মাংসপেশিতে টানটান ভাব, শরীর অতিরিক্ত ঘামা, মাথা, হাত পা কাপা, ঘনঘন শ্বাস প্রশ্বাস নেয়া বা হার্টবিট বেড়ে যাওয়া ইত্যাদি কতিপয় উপসর্গ। অনেক সাইকোলজিক্যাল সমস্যায় সাথে সমন্বিত হয়ে এই অ্যাংজাইট ডিসঅর্ডার দেখা দিতে পারে। তাই অন্যান্য মানসিক সমস্যার সাথে যেহেতু এর যোগসুত্রতা রয়েছে ফলে প্রকৃত সমস্যাটি কী বা  এই্ অ্যাংজাইটি ডিসসঅর্ডারের মূল কারণগুলো কী সেগুলো আগে নিশ্চিত করা যায়। যদি অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার রোগ হিসেবে নির্ণয় করা হয় তবে দেখা যাবে সুনির্দিষ্টভাবে এই ডিসঅর্ডারের যেসব উপসর্গ রয়েছে সেগুলোই রোগীর মাঝে মূল উপসর্গ হিসেবে বিরাজ করছে। অবশ্যিই  এটা ঠিক যে, অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার খুব প্রচলিত একটি মৃদুমাত্রার মানসিক ব্যাধি।

উদ্বেগ রোগ

উদ্বেগ রোগ

কারণ

এই ডিসঅর্ডার বা অসুখটির সাথে অনেকগুলো কারণ যোগসাজশ থাকতে পারে। এই নিয়ে পরিচালিত হয়েছে নানা ধরনের গবেষণা নিরীক্ষা। মনোবিজ্ঞানী এবং মনোচিকিৎসকরা অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডারের উদ্ভব সম্পর্কে বলেতে গিয়ে প্রথমত উল্লেখ করেছেন হেরিডিটরি ফ্যাক্টর বা বংশগত উপাদান। দেখা গেছে যে,  পিতা মাতার মাঝে এই ডিসঅর্ডারের নানা উপসর্গ ‍থাকলে অন্যদের অপেক্ষা তাদের সন্তানদের মাঝে এই অ্যাংজাইটি অসুখটি পরিলক্ষিত হয়েছে। শিশু যখন তার একেবারে প্রারম্ভিক জীবনের দুই থেকে পাচ বছর বয়স পর্যন্ত আবেগ জনিতভাব ত্রুটিপূর্ণ অভিজ্ঞতা বা বিকাশের শিকার হয় তবে জীবনের পরবর্তী পর্যায়ে তার এ ডিসঅর্ডারটি দেখা দিতে পারে। যেসব শিশু তাদের শৈশবকালে অনিরাপত্তা/ নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, তাদের যদি আদর, ভালবাসা বোধের অভাব থাকে, তাদের কেউ যদি নজর না দেয়, অন্য ভাইবোনদের সাথে বাবা মা যদি হরহামেশা শিশুকে তুলনা করে এসব ক্ষেত্রে দেখা যায় শিশুর নিজের প্রতি নিজের বিশ্বাস বা আত্মবিশ্বাস অনেক কমে যায়। কাজেই শিশুটি কি পরিবেশে বড় হলো তার ওপর ভিত্তি করেও পরবর্তী অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডারের সূচনা হওয়া খুব স্বাভাবিক ঘটনা। প্রাপ্তবয়ষ্কদের ক্ষেত্রে প্রেম বিরহ, পিতা মাতার মৃত্যু, প্রিয়জনকে হারানো, নিজের ক্যারিয়ার বা ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা এবং বাসা বাড়িতে যদি দীর্ঘমেয়াদি কোনো মানসিক জটিলতা চলতে থাকে তাদের ক্ষেত্রে অ্যাংজাইটি বা দুশ্চিন্তা রোগ বেশি হয়ে থাকে। পরিলক্ষিত হয়েছে এরা দৈনন্দিন রুটিন অনুযায়ী কাজ অতিরিক্ত দুশ্চিন্তায় জন্য করতে পারে না। অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডারের উপসর্গগুলোর কতক মনোগত এবং কতক শরীরে প্রকাশিত হয়। নিচে আমরা কিছু উপসর্গ উল্লেখ করলাম-

মাসল টেনশন বা মাংসপেশিতে টানটান অনূভূতি, অস্তিরতাবোধ, হাত পা কাপা, মাংসপেশিতে ব্যথা,  মুখমন্ডল টেন্স বা টানটান লাগা, হৃদকম্পন বেড়ে যাওয়া শরীর অতিরিক্ত ঘামা, হাত পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া, মুখ শুকিয়ে যাওয়া, মাতা হাল্কাবোধ হওয়া, মাতায় চাপচাপ অণূভূতি লাগা, পাকস্থলিতে অস্বাচ্ছন্দ্যতা, খাবারের অনীহা বা খাবার রুচি কমে যাওয়া, এই বুঝি কোনো বিপদ সামনে আসবে এ রকম কোনো ভিতি সব সময় মনে বিরাজ করা, হাইপার অ্যালার্টনেস বা অতি সচেতনতাবোধ, উত্তেজনাবোধ, অল্পতে বিরক্তভাব প্রকাশ করে,  মনোযোগের ঘাটতি, মাতা ভারি ভারি লাগা, অল্পতেই একাগ্রতা ও ধৈর্য্য হারিয়ে ফেলা।

অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডারের যেসব নানা ধরনের উপসর্গ রয়েছে সেগুলোর সঙ্গে মিল আছে এ রকম অনেক মানসিক অসুখও রয়েছে। তাই সম্পূর্ণভাবে অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডারকে রোগ হিসেবে নির্ণয় করতে গেলে  একে  একটি বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিচের কতক মানসিক এবং শারীরিক সমস্যা থেকে আলাদা করতে হয়। এগুলো হলো-

বিষণ্নতা (সাথে উত্তেজনা), প্রারম্ভিক পর্যায়ের সিজোফ্রেনিয়া, সুপ্রাভেন্টিকুলার টেকিকার্ডিয়া,  থাইরয়েড গ্ল্যান্ডের অল্প কর্মক্ষমতা বা হাইপোথাইরয়েডিজম, মাইগ্রেন।

চিকিৎসা

সমর্থনমূলক সাইকোথেরাপিঃ দেখা গেছে,  যেসব রোগী এই মানসিক অসুখটিতে ভুগছেন তারা অত্যন্ত বেশি দুশ্চিন্তাগ্রস্থ এবং অস্থিরতা সম্পন্ন মানসিক অবস্থা নিয়ে সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে এসে থাকেন। এ জন্য রোগীর নানা ধরনের কষ্ট এবং যে সমস্যা সেগুলো কমাতে ডাক্তার চেষ্টা করেন এবং সমস্যার মূলে কী রয়েছে সে কারণগুলো খুজে বের করার চেষ্টা করেন। এ কারণগুলো খুঁজে বের করে এর নানা ধরনের সমাধান, ত্রুটি বিচূতি, ভালো মন্দ ইত্যাদি ডাক্তার সাহেব রোগীর কাছে তুলে ধরেন। প্রথমত তিনি রোগীকে আশ্বস্ত করে থাকেন যে, এ রকম মানসিক সমস্যা হতেই পারে, এটি একটি মৃদু প্রকৃতির মানসিক সমস্যা এবং এর খুব ভালো চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা রয়েছে। রোগী যাতে দুশ্চিন্তা উদ্রেককারী পরিস্থিতি এড়িয়ে না চলে বরং যেসব পরিস্থিতিতে তার অ্যাংজাইটি বেড়ে যায় সেগুলোকে মোকাবিলা করতে পারে সে জন্য নানা দৃষ্টিকোণ থেকে মনোবিশ্লেষণ করে ডাক্তার রোগীকে সাহস জুগিয়ে থাকেন। যেহেতু এই রোগটিতে কোনো কিছুতে মনোনিবেশ করার ক্ষমতা, সিদ্ধান্ত নেয়ার দক্ষতা এবং অল্পতে একাগ্রতা হারিয়ে ফেলা- এসব উপসর্গ থাকে তাই রোগী প্রায়শ ছোটখাটো সমস্যাকেও অনেক বড় মনে করে, সাহস করে এগোতে পারে না। সে ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ সাইকিয়াট্রিস্ট বা মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ নানা ধরনের কগনিটিভ বা জ্ঞানীয় আলোচনার মাধ্যমে রোগীকে তার  সমস্যার সমাধানের সত্যিকার চিত্রটি তার সামনে তুলে ধরেন। ফলে রোগী সাহস নিয়ে কাজটি সমাধান করতে পারেন। এভাবে আস্তে আস্তে করতে করতে দেখা যায় যেসব পরিস্থিতিতে আগে ডিসঅর্ডারের উপসর্গ দেখা দিত সেগুলো কমে যায়।

 

বিহেভিয়ার থেরাপি

আচরণগত চিকিৎসা ব্যক্তিকে তার সমস্যা সমাধানে নানাভাবে সহায়তা করে থাকে। যেহেতু অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডারকে এক ধরনের মানসিক অসঙ্গতি বিধানের এবং অসঙ্গতিমূলক আচরণেল সাথে তুলনা করা হয় তাই এক্ষেত্রে বিহেভিয়ার মোডিফিকেশন থেরাপি বেশ ভালো ভূমিকা রাখে। রোগীর যেসব উপসর্গ মনে এবং শরীরে বিরাজ করে মোডিফিকেশন থেরাপির মাধ্যমে সেগুলোকে আস্তে আস্তে দূর করা যায়। অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডারের বিহেভিয়ার থেরাপির মাঝে রয়েছে-

ক) মাসকুলার রিরাক্সেশন টেকনিকঃ এই পদ্ধতির মাধ্যমে সারা শরীরের মাংসপেশীতে প্রথমে ইচ্ছকৃতভাবে এক ধরনের টানটান অনূভূতির সৃষ্টি করা হয়। পরে ধারাবাহিকভাবে আবার রিলাক্স বা শিথিলদায়ক অণূভূতির সঞ্চার করা হয়। এভাবে কিছুক্ষণ করা হলে মনোপাত এবং শারীরিক যেসব উপসর্গ রয়েছে সেগুলো কমে যেতে শুরু করে। এগুলো বিশেষজ্ঞ সাইক্রিয়াটিস্টের কাছে থেকে শিখে নিয়ে ব্যাক্তিগত পর্যায়ে করা যেতে পারে।

খ) ইয়োগা ঃ ইয়োগা এক বিশাল ধরনের যোগব্যায়াম পদ্ধতি। এটি দুশ্চিন্তা রোগের চিকিৎসা হিসেবে ভারত, চীন, জাপান   এমনকি পশ্চিমের দেশগুলোতেও বহুলভাবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এগুলো ডাক্তারের পরামর্শক্রমে করলে দুশ্চিন্তা রোগের নানা উপসর্গ থেকে  রেহাই পাওয়া যায়।

গ) সিস্টোমিক ডিসেনসিটাইজেশন টেকনিকঃ  এটির মাধ্যমে রীতিবদ্ধভাবে যেসব বিশেষ পরিস্থিতিতে রোগীর মাঝে দুশ্চিন্তাকারক মানসিক অবস্থা বিরাজ করে সেগুলোকে মোকাবিলা করে ধীরে ধীরে দুশ্চিন্তার মাত্রা কমিয়ে আনা হয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় রোগীর মাঝে এক ধরনের ভাসমান দুশ্চিন্তার মতো মানসিক অবস্থা বিরাজ করে। এর কোনো কারণ খুজে বের করা যায় না। এ কারণবিহীন দুশ্চিন্তারোগ বা বাকে ফ্লিফ্লটিং অ্যাংজাইটি বলে তার চিকিৎসা করা একটু জটিল। তবে এটা ঠিক যে, নানা ধরনের মনোভঙ্গি বা দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখা করে মনোচিকিৎসক যখন রোগীকে বারবার আশ্বস্থ করে এবং রোগীর মনের ভেতরের সতিক্যার সাহসকে জাগিয়ে তোলে তখন অনেকটা ইতিবাচক ফল পাওয়া যায়।

ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা

দুশ্চিন্তা রোগ চিকিৎসা করতে প্রেসক্রিপশনে যত রকম ড্রাগ বা ওষুধ দেয়া যায় ততই  ভালো। তাই সুনির্দিষ্ট এবং কম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পন্ন ওষুধ অল্প কয়েক দিনের জন্য দেয়া যেতে পারে। কিন্তু এর মূল চিকিৎসা হলো সমর্থনমুলক সাইকোথেরাপি ও বিহোভিয়ার থেরাপি। এগুলোতে কাজ না হলে সাথে ওষুধ ব্যবহার করা যায়। তবে আমাদের দেশের প্রেক্ষিতে দেখা গেছে, ডাক্তাররা এ  রোগের চিকিৎসায় হরহামেশা দীর্ঘদিনের জন্য ওষুধ প্রয়োগ করে থাকেন। আসলে এ ধরনের চিকিৎসা অর্জন করা উচিত।

 

অধ্যাপক ডা. এ এইচ মোহাম্মদ ফিরোজ

পরিচালকঃ মনোজগত সেন্টার, রোড নং-৪, বাড়ি নং-৫, ধানমন্ডি , ঢাকা।


Leave a Reply