এক সূত্রে গাঁথা মা ও শিশু

  • 0

এক সূত্রে গাঁথা মা ও শিশু

Category : Health Tips

এক সূত্রে গাঁথা মা ও শিশু

মা শিশুর নিরাপদ আশ্রয়। মা ও শিশুর পুষ্টিগত সম্পর্কে অত্যন্ত নিবিড়। সন্তান যখন মায়ের দেহ থেকে পুষ্টি উপাদান নিয়ে ক্রমে নিজের দেহ গঠন করে তখন তার জন্য মাকে অতিরিক্ত খাদ্য চাহিদার সম্মুখীন হতে হয়ে। মায়র খাদ্যে যদি তার নিজের ও সন্তানের চাহিদ পুরনের জন্য উপযুক্ত পুষ্টি উপাদান না থাকে তবে মায়ের শরীর ক্ষয় হয়ে শিশুর প্রয়োজন মেটাবার চেষ্টা চলে। ফলে এমন অবস্থায় মা ও শিশু উভয়েই পুষ্টিহীনতার শিকার হয়। মায়ের বয়স যদি ২০ বছরের কম হয় অর্থ্যাৎ মায়ের নিজের দেহের গঠনই যদি সর্ম্পূন না হয়ে থাকে, তখন গর্ভবতী হলে নিজের দেহ গঠনের চাহিদা ও সন্তানের দেহ গঠনের চাহিদা এই দুই অতিরিক্ত চাহিদার দরুন মাকে বিরাট ও জটিল এক চাপের সামনে পড়তে হয়। সুতারাং গর্ভধারণকাল ও স্তন্য দান কালে এই দুই সময়ই মায়ের জন্য অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় পুষ্টিচাহিদা পুরণ না হলে মা ও শিশু উভয়েরই স্বাস্থ্যহানি ঘটবে।

গ্লাসেন্টার মাধ্যমে শিশু ও মায়ের রক্তের আদান প্রদান হয়ে থাকে। এভাবে মায়ের রক্তের পুষ্টি উপাদানগুলো শিশুর চাহিদা অনুযায়ী তার রক্তে আসে এবং তার দেহের গঠন ও পুষ্টি সাধন করে। শিশু ও মা দুয়ের উপরিই পুষ্টি প্রভাব অত্যান্ত স্পষ্ট।  একটা শিশুর সার্বিক সুস্থতা কেবল জন্মের পরের পুষ্টির ওপর নির্ভর করে না বরং যেদিন থেকে মাতৃগর্ভে তার জীবনকালের সুচনা হয় সে সময়কার যথাযথ পুষ্টির ওপর নির্ভর করে এবং তা ক্রমাগত চলতে থাকে। এই কারণে গর্ভাবস্থায় পুষ্টি তথ্য খাদ্য গ্রহণের বিষয়টি অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মায়ের গর্ভে থাকাকালে একটি শিশুর সম্পূর্ণ পু্ষ্টি চাহিদা মেটাতে সক্ষম একজন সুস্থ ও স্বাস্থ্যবর্তী মা। কিন্তু মা যদি নিজেই অসুস্থ ও অপুষ্টির শিকার হন তবে তার কাছে একজন অপুষ্ট শিশুর ছাড়া কিছুই আশা করা যায় না। কারণ জন্মকালীন পুষ্টির উপরই শিশুর পরবর্তী জীবনের সাফল্য ও সুস্থতা নির্ভর করে। জন্মের সময় বেশ কিছু খাদ্যেপাদান শিশুর লিভার বা যকৃতে সঞ্চিত থাকাটা স্বাভাবিক। তার মধ্যে ভিটামিন এ এবং লৌহ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। গর্ভবতী মায়ের খাদ্যে যদি এসব উপাদান ‍যথেষ্ট পরিমাণে না থাকে তবে এ উপাদানসমূহ সঞ্চয় সম্ভব হয় না। ফলে জন্মের পর শিশুর অপুষ্টিজনিত সমস্যা দেখা দেয়ার আশঙ্খা থাকে। এ সময় পুষ্টি উপাদানের অভাব যদি তীব্র হয় তবে মায়ের দেহের পুষ্টি উপাদান দিয়ে ও শিশুর শরীর গঠন সম্ভব হয় না। ফলে অপরিনত, বিকলাঙ্গ এমনকি মৃত সন্তানও ভূমিষ্ট হতে পারে। শিশুর দেহ গঠন প্রধানত আমিষ বা প্রোটিনের উপরেই নির্ভরশীল। তাই গর্ভাবস্থায় এই উপাদানটির চাহিদাই সর্বাপেক্ষা বেশি। এ সময় প্রোটিনের চাহিদা ঠিকমতো পূরণ না শিশুর মস্তিস্কের বর্ধন ও ঠিকমতো হয় না।

শিশুর অস্থি গঠনে ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি প্রয়োজ গর্ভবতী মায়ের খাদ্যে এসব উপাদানের অভাব হলে মায়ের হাড় থেকে ক্যালসিয়াম অপসারিত হয়ে শিশুর হাড় গঠনে ব্যবহৃত হয় যার ফলে মায়ে হাড় ক্রমশ পাতলা, দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। গর্ভস্থ শিশু ও মায়ের নিজের রক্তের লোহিত কনিকার পরিমাণ বৃদ্ধি এই দুই কারণে গর্ভবতী মায়ের প্রচুর আয়রণ বা লৌহযুক্ত খাদ্য গ্রহণ করা প্রয়োজন। মায়ের খাদ্য প্রচুর লৌহ থাকলে গর্ভস্থ শিশুর যকৃতে যথেষ্ট লৌহ সঞ্চিত হতে পারে। শিশু জীবনের প্রথম কয়েক মাস শুধু দুধ পান করে বেচে থাকে। দুধে লৌহের পরিমাণ খুবই কম এবং এই সময় শিশুর দেহে চাহিদা মেটাবার জন্য তার নিজের যকৃতির সঞ্চিত লৌহ ব্যবহৃত হয়। রক্ত গঠনে লৌহের মতো ভিটামিন সি ও ফলিক এ্যাসিড বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মায়ের খাদ্যের পুষ্টি উপাদানগুলা যে শুধু গর্ভাবস্থায়ই শিশুর দেহ গঠনে ব্যবহৃত হয় তা নয় স্তন্যদানকালে ও এর ‍গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ জন্মের পর শিশুর বেচে থাকার প্রধান উৎসই হলো মায়ের বুকের দুধ। মায়ের দুধে গরুর দুধ অপেক্ষা ৬ গুন বেশি ভিটামিন সি আছে। সরাসরি পান করে বলে এই ভিটামিনের সবটুকুই শিশু পায়। তাই মায়ের খাদ্যে রক্ত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ এসব উপাদানের অভাব ঘটলে মা ও শিশু উভয়েই এনিমিয়া বা রক্ত স্বল্পতায়  আক্রান্ত হয়।

মায়ের দুধে শিশুর দৈহিক বৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য স্নেহজ এ্যাসিড যথা লিনোলেইক এ্যাসিড অনেক বেশি থাকে যার অভাব হলে শিশুর দেহের বৃদ্ধি বন্ধ হয় এবং তার ত্বকের মসৃণতা চলে গিয়ে খসখসে ও চুলকানিযুক্ত ত্বকের সৃষ্টি হয় সয়াবিন তেল,  সরিষার তেল,  বাদাম তেল, জলপাই তেল ইত্যাদি উদ্ভিজ স্নেহে লিনোলেইক এ্যাসিড বিদ্যামান।

উল্লেখিত তথ্যসমূহ হতে দেখা যাচ্ছে যে, মা ও শিশু অপুষ্টির মূলে প্রধান কারণ হলো পুষ্টিকর খাদ্যের অভাব। তবে এটাই যে শুধু একমাত্র কারণ তা নয় পরিবারে খাদ্যের অসম বন্টন এক খাদ্য সর্ম্পকে মায়েদের কুসংস্কারও সমানভাবে দায়ী। ঐতিহ্যগতভাবে প্রায় বাঙালি পরিবারেই মেয়েরা খায় পুরুষদের পর সবচেয়ে শেষে। তখন খাদ্য বলতেও থাকে যৎ সামান্য যা তার নিজের চাহিদা ঠিকমতো মেটায় না। উপরন্তু গর্ভবতী মায়েরা অজ্ঞতার কারণে খাদ্য সর্ম্পকিত কুসংস্কার দ্বারা ভীষণভাবে প্রভাবিত হওয়ায় অসুস্থ ও অপুষ্ট শিশু জন্ম দেন। সেজন্য শিশুর জন্য প্রথমেই নিশ্চিত করা উচিত একজন সুস্থ মা। আর সুস্থ মা এর জন্য চাই উপযুক্ত ও পর্যাপ্ত আহার ও পুষ্টি।

তাই প্রত্যেকটা মা যেন সুস্থ ও নিরোগ সন্তান জন্ম দিতে পারেন সেজন্য পরিবারে খাদ্যের সুষম বন্টন নিশ্চিত করতে হেব এবং খাদ্য সর্ম্পকে কুসংস্কার বর্জন করার লক্ষ্যে মায়েদের সচেতন করতে  হবে ও তাদের পুষ্টি শিক্ষা দিতে হবে। এর ফলে একটি কর্মক্ষম ও সুস্থ সবর জাত হিসেবে আমাদের গড়ে উঠার সুযোগও বাড়বে।

সোনালী দাস


Leave a Reply