এ্যাজমাঃ শ্বাস কষ্টের কঠিন রোগ

  • 0

এ্যাজমাঃ শ্বাস কষ্টের কঠিন রোগ

এ্যাজমা বা হাঁপানি এক ধরনের শ্বাসকষ্টের রোগ। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে বঙ্কিয়াল এ্যাজমা বলে। এই রোগে আক্রান্তদের প্রায়ই শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। মুলতঃ শ্বাস ফেলবার সময়ই শ্বাসের কষ্ট বেশি দেখা দেয়। হাপানির আক্রমণ হঠ্যাৎ করে হয়ে থাকে। শ্বাসনালীর আকষ্মিক সংকোচন এবং বৈশ্বিক ঝিল্লির স্ফীত হওয়াই এ রোগের লক্ষণ। রোগী হাফ ছাড়তে অস্বস্তি বোধ করে থাকে। এ রোগে আক্রান্ত রোগীদের শ্বাস নেয়ার এবং শ্বাস ফেলার চেষ্টা করার সময় শ্বাসতন্ত্রের সবগুলো পেশীকে সক্রিয় করে তুলতে হয়। এর সঙ্গে কাশি থাকতে পারে। কয়েক ঘন্টা থেকে কয়েকদিন অথবা একনাগাড়ে অনেকদিন স্থায়ী হতে পারে। কয়েকদিন, কয়েক সপ্তাহ কিংবা মাসের ব্যবধানে পুনরায় এই রোগের আক্রমণ ঘটা আশ্চর্য নয়।

এক পরিসংখ্যান দেখা গেছে, আমাদের দেশের মোট জনসংখ্যার শতকরা ১০ থেকে ১২ জন লোক  এ্যাজমা বা হাঁপানীর রোগে আক্রান্ত। এই আক্রান্তের সংখ্যা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে।  শীতের সময় এই রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পায়।

স্বাভাবিক অবস্থায় শ্বাসনালীর ভেতর দিয়ে বাতাস শ্বাসযন্ত্রের সর্বত্র আসার যাওয়া করতে পারে। কিন্তু কোন রোগী এই রোগে আক্রান্ত হওয়া মানেই হল যখন কোন কারণে কোন এ্যালার্জিক বা উত্তেজক জিনিস শরীরে প্রবেশ করার ঠিক পরেই শরীরের ভিতরে মাস্ট সেলের ডিথ্রিীভেশন হয়ে হিস্টাসিন, সেরোটোনিন, লিউকোট্রিন, ব্রাডিকাইনিন শ্বাসযন্ত্রের

১. শ্বাসনালীসমুহের মাংসপেশীকে সংকোচিত করে শ্বাসনালীকে আরো সরু করে।

২. মিউকাসজাতীয় আঠাল কয়া নিঃসৃত হয়ে সরু শ্বাসনালী পথকে বন্ধ করে।

৩. শ্বাসনালীর ভিতরের মিউকাস আবরনী প্রদাহের কারণে ফুলে উঠে শ্বাসনালীর পথকে আরও সংকুচিত করে দেয়। ফলশ্রুতিতে শ্বাসনালী দিয়ে বাতাস যাওয়া আসা করতে পারে না বলে রোগীর শ্বাসের কষ্ট হয় এবং বাতাস সরু শ্বাসনালী দিয়ে যাওয়া আসা করায় রোগী সাঁহ সাঁহ শব্দ করে। মোট কথা এ্যাজমা রোগীরা শ্বাসকষ্ট, কফ, কাশিও সাহ সাহ শব্দ নিয়ে যখন জানে তখনই আমরা তাকে ব্রঙ্কিয়াল এ্যাজমা বলি। পাশাপাশি এ কথা মনে রাখতে হবে যে কার্ডিয়াক এ্যাজমা নামে হার্টের বিভিন্ন অসুখের  (যেমন এম আই উচ্চ রক্তচাপ ভাসকুলার ডিজিজ, কার্ডিও ম্যায়োপ্যাপি,  মায়োকার্ডাটিস) কারনে অন্য আরেক ধরনের এ্যাজমা আছে তাকে কার্ডিয়াক এ্যাজমা বলে। কার্ডিয়াক এ্যাজমার রোগীদের (হাপানির) চিকিৎসা দিলে রোগীর মারাত্মক ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে। সাধারণত এ্যাজমা বলতে ব্রঙ্কিয়াল এ্যাজমাই বুঝে থাকি।

       এ্যাজমা সাধারণত দু ধরনের

১. এটালিক বা ‘অল্প বয়স সুচিত’ হাপানি। পুরুষের বেশি হয়।

২. নন এটালিক বা ‘বিলম্বে সুচিত’  হাপানি। সাধারণ মহিলারে বেশি হয়। প্রথমটির কারণ বহিরাগত বা এ্যালর্জি এবং দ্বিতীয় রকমের হাপানির কারণ ছাড়াও ভাইরাসের সংক্রমণে, ব্যায়ামের কারণে, পেশাগত কারণে, আবহাওয়া, মানসিক চাপের কারণ ছাড়াও  এ্যাসপিরন ও বিটা ব্লকজাতীড ওষুধ অতিরিক্ত সেবনের ফলে এ্যাজমা দেখা দিতে পারে।

যে সকল এ্যালার্জেন দ্বারা সাধারণঃ এ্যাজমা দেখা দিতে পারে তাদের মধ্যেঃ

১. ফুলের বা ঘাসের পরাগ রেনু

২. ঘরবাড়ির ধুলোতে অবস্থিত মাইট নামক কীট।

৩. পাখির পালক

৪. জীবজন্তুর লোম

৫. ছত্রাকের বীজ গুটি

৬. শিল্প কারখানায় ব্যবহৃত কিছু রাসায়নিক পর্দাথ

৭. কিছু খাবার

৮. কিছু কিছু ওষধ।

এ্যাজমা রোগ হলেই আমাদের দেশে রোগীরা ঝার ফুক, কবিরাজী, তাবিজ ইত্যাদি জাতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে যার কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নাই। আছে শুধু মিথ্যা সান্তনা পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মত আমাদের দেশেও এ্যাজমার রোগীদের জন্য আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা বর্তামানে প্রচলিত আছে।

শ্বাসকষ্টের রোগীকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করে তার কষ্টের লক্ষণসমূহ দুরীকরণ এবং শ্বাসযন্ত্রের স্বাভাবিক কর্মচালনা এবং মারাত্মক অবস্থা যাতে না ঘটে তার জন্য এ্যাজমা রোগীকে।

প্রথমঃ সর্তকতা অবলম্বন করা উচিত

দ্বিতীয়তঃ চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে নিয়মিত ওষুধ ব্যবহার সেবন করা উচিত।

তৃতীয়তঃ যেহেতু এই রোগ সমূলে সারে না, নিয়ন্ত্রনে রেখে স্বাভাবিক জীবন যাপনের নিমিত্তে চিকিৎসক প্রদত্ত উপদেশ মান্য করা উচিৎ।

       এ্যাজমা রোগী কি কি সর্তকতা অবলম্বন করবেন

১. এ্যালার্জির কারণে যে সকল রোগীর এ্যাজমা সেক্ষেত্রে রোগীকে নিজেই খুব সর্তকতার সাথে লক্ষ্য রাখতে হবে কোন বিশেষ জিনিসে তার এ্যালার্জি হয় বা শ্বাসকষ্ট হয় বাড়ে। তখন শুধু নির্ধারিত সেই সমস্ত জিনিসি যথাসম্ভব পরিহার করাই শ্রেয়।

যেমনঃ ধুলা, ঠান্ডা, পোষা কুকুর, বিড়াল, ফুলের রেণুর গন্ধ ইত্যাদি।

২. এ্যালার্জিক নয় তবুও শ্বাসকষ্টের মাত্রা বাড়াতে পারে সে সকল জিনিসের সংস্পর্শে যাওয়া উচিত নয়। যেমনঃ গুড়ো মসলার ঝাঝ, ধান, চাল, ডাল ঝাড়া বা বাছা, ঝুল ঝাড়া, ধোয়া, ধুলা, মসলার গন্ধ চুনকামে ব্যবহৃত রংয়ের গন্ধ, মশার ওষুধসহ ডিডিটি প্রভৃতি।

৩। নারিকেল, দই, আইসক্রিম বা ঠান্ডা জাতীয় খাবার খাবেন না। তার সাথে যে সকল খাবার ব্যক্তি বিশেষ খেলে কষ্ট হয়। শুধু সকল খাবার পরিহার করুন, ডালাওভাবে পরিবারের আজকাল যেমন কোন ‍যুক্তি নাই।

পরামর্শ নেয়া উচিত। মনে রাখবেন ধুমপান সম্পূর্ণ নিষেধ।

৫. পরিশ্রম, ব্যায়ার যা দৌড়াদৌড়িতে যাদের শ্বাসকষ্ট বাড়ে ডাক্তারের পরামর্শে প্রয়োজনীয় ওষুধ সেবনের পর তা করা উচিৎ অথবা সম্ভব হরে বিরত থাকবেন।

৬. রোগীর পেশাগত কারণে এ্যাজমা হলে তার পেশা (ধুলার স্থান) পরিবর্তন সম্ভব হলে ভাল নতুবা ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা করেও অনেক সময় এই রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয় না।

৭. সামাজিক দুশ্চিন্তা, মানসিক ছাপ, উৎকণ্ঠাজনিত কারণে রোগীর শ্বাসকষ্ট রোগ হলে সেক্ষেত্র ঐ পরিবারের অন্যান্যের দায়িত্ব রোগীর মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে।

বর্তমানে আধুনিক এ্যাজমা চিকিৎিসা পদ্ধতিতে বৃটিশ থেরোসিক সোসাইটি  এ্যান্টি এল্যার্জি ভ্যাকসিনের মাধ্যমে এ্যাজমার চিকিৎসার সুপারিশ করে না। কারণ-

ভ্যাকসিন নিয়ে মাত্র শতকরা ৫ জন রোগী নিরাময় হয়। বাকি শতকরা ৯৫ ভাগ রোগীর সাময়িক কিছু উপকার হলেও তার জন্য সময় লাগে অনেকে বেশি। তাছাড়া প্রক্রিয়াটি ব্যয়বহুল, এদেশের রোগীদের পক্ষে ব্যয়ভার চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব প্রায়। তাছাড়া  এ ভ্যাকসিনের ইনজেকশনে কখনও এ্যাজমা প্রকট আকারে বৃদ্ধি পেতে পারে। আমাদের দেশে এ ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতির প্রচারের প্রসার বেশি হলেও এর কার্যকারিতা আশানুরূপ বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না তাই আমাদের দেশে এই ধরনের চিকিৎসা উপযোগী নয়।

৯. আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় নেবুলাইজার ও ইনহেলার সম্পর্কে ভ্রাণ্ত ধারণা এই যে এগুলো ব্যবহার করলে অন্য কোন ওষুধ কাজ করে না। এই সকল অপপ্রচার ও ভিত্তিহীন বাক্য পরিহার করে এ্যাজমা রোগীর মনে রাখা উচিৎ যে ইনহেলার এবং নেবুলাইজার চিকিৎসা পদ্ধতি অতি আধুনিক প্রথম ও সহজতর  এবং নেবুলাইজার চিকিৎসা পদ্ধতি অতি আধুনিক প্রথম ও সহজতর এবং অধিকতর কার্যকরী পদ্ধতি যেখানে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সাধারণতভাবে ব্যবহৃত ওষুধের তুলনা নাই বললেই চলে।

১০. এ্যাজমা রোগী কখন ডাক্তারের নিটক যাবেন, তার রোগের কি অবস্থা, কি পরিমাণ মাত্রায় ওষুধ ব্যবহার করবেন তা রোগী নিজেই জানার জন্য প্রতিটি রোগীর নিজস্ব পিক ফ্লো মিটার যন্ত্র রাখা উচিত। শ্বাসনালীতে বাতাস কি পরিমাণে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে শ্বাসকষ্ট হচেছ তা বুঝার জন্যই পিক মিটার যন্ত্রটি ব্যবহার করা হয়।

এ্যাজমরা রোগীর চিকিৎসা

দুঃসংবাদ হলেও সত্য যে এখনও পর্যন্ত পৃথিবীতে এমন কোন ওষুধ আবিষ্কৃত হয়নি যটা সেবন করলে এ্যাজমা রোগ সম্পূর্ণরূপে ভাল হেয় যাবে, তবে সুসংবাদ এই যে বর্তমানে বাজারে অনেক উন্নতমানের ওষুধ আছে যা চিকিৎকের নির্দেশনায় ব্যবহার করলে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের রোগীয় মত এ্যাজমাও সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রেখে স্বচ্ছ জীবনযাপন সম্ভব।

এ্যাজমা চিকিৎসায়

ব্রঙ্কোডাইলেটর বা শ্বাসনালী প্রসারক জাতীয় সালুব টামল, টারবুটাসিন সাসেফেট ক্রোমোগ্লাইকেটজাতীয় ওষুধ ব্যবহারের প্রচলন আছে।

কোন কোন ক্ষেত্রে রোগীকে দীর্ঘমেয়াদী কিটো টোফেন সেবনের পরামর্শ দেয়া হয়। সঠিকভাবে্ ইনহেলার টানতে পারলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই শ্বাসকষ্ট কমে পারে,  অবশ্য সঠিক পদ্ধতিতে টানতে না পারলে উপকার পাওয়া যায় না।  তাই কোন ভ্রান্ত কথায় কান না দিয়ে চিকিৎসকের কাছ থেকে টানার সঠিক পদ্ধতি অবশ্যই জেনে নেয়া উচিত।

শ্বাসকষ্টের বড়ি সিরাপজাতীয় ওষুধ বেশি করে সেবন করলে রোগীর হাত, পা কাপে, বুক ধড়ফড় করে, ঘুম কম হয় ও অন্যান্য পাশ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়। অন্যদিকে ইনহেলার এসকল পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া নেই বললেই চলে। তাই শ্বাসকষ্টের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ মোতাবেক ইনহেলার ব্যবহারই উত্তম।

এ্যাজমা রোগীর যত্ন

রোগীকে বালিশের সাহায্যে ঠেস দেয়ার ব্যবস্থা করে এমন একটা অবস্থায় রাখতে হবে, যা তার পক্ষে আরামদায়ক হবে। মুক্ত বায়ু সঞ্চালনের জন্য রোগীর ঘরে দরজা জানালা খোলা রাখতে হবে।

রোগীর পরণে আটোসাটো পোশাক থাকলে তা ঢিলে করে দিতে হবে। কোষ্টবদ্ধতা এবং পেট ফাঁপার উপশমের দিকেও নজর দেয়া দরকার। কখনও কখনও রোগী শ্বাসকষ্টের তীব্রতা কমানোর জন্য স্ট্যামোসিয়াম, পটাশিয়াম নাইট্রেট ও বেলেডোনার পাতায় তৈরি সিগারেট ব্যবহার করে থাকে। এ জাতীয় ধুমপান নিরুৎসাহিত করা উচিত।

যে কারণ আক্রমণ ঘটে তার প্রতি মনোযোগী হওয়াই এ্যাজমা রোগীর যত্নের মূল কথা।

১। এ্যালার্জি হওয়ায় এমন অবস্থায় দূরীকরণ হাপানি এক ধরনের এ্যালার্জির প্রকাশ। অথবা কোন বস্তুর সম্পর্কে অতিরিক্ত অনুপ্রবণ তারও ফল বলা যেতে পারে।

২। আদ্রর্তার বৃদ্ধিসহ মেঘাচ্ছন্ন আবহাওয়া কিছু লোকের মধ্যে কখনও কখনও আক্রমণের প্রবণতা জমায়। আবার অন্য কারো ক্ষেত্রেও ঠান্ডা শুষ্ক আবহাওয়া আক্রমণ ঘটাতে পারে।

তাই বুঝতে হবে কোন আবহাওয়া কার পক্ষে অনুপোযোগী এবং তাকে সে আবহাওয়া পরিহার করতে হবে।  এদেশের শ্বাসকষ্টের রোগীদের অসীম কষ্টের কথা বিবেচনায় রেখে খ্যাতনামা মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক প্রভাকর পুরকায়ন্থ, এফআরসিপি এর সভাপতিত্বে গড়ে ওঠে এ্যাজমা সোসাইটি অব বাংলাদেশ। এই সোসাইটি সেবার্থে কাজ করে যাচ্ছে। বর্তমানে সোসাইটি পরিচালিত আধুনিক  দাতব্য এ্যাজমা চিকিৎসা কেন্দ্র এ্যাজমা ক্লিনিক’ বাড়ি নং- ৬৩ রোড নং – ৮/এ  (নতুন) ধানমন্ডি ঢাকায় অবস্থিত। সোসাইটিতে সক্রিয় ভূমিকায় রয়েছেন অধ্যাপক এ্ফএইচ নাজির, ডাঃ এম এ ওহাব, জনাব শামীম এ রায়হানুদ্দিন,  অধ্যাপক মোঃ ফজলুল হক, অধ্যাপক মোঃ তাহির, মেজর জেনারেল ডাঃ আনিস ওয়াইজ (অবঃ),  অধ্যাপকজ মাহমুদ হাছান, অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ, ডাঃ কর্ণেল এমবি রাব্বানী।


Leave a Reply