কম পয়সার প্রোটিন

  • 0

কম পয়সার প্রোটিন

Category : Health Tips

কম পয়সার প্রোটিন

সরোজেন্দ্র মোহন ঘোষ

বিখ্যাত ফরাসী চিন্তানয়াক ও ব্রিলা সাভেরা (১৭৫৫ – ১৮২৬) একদা বলেছিলেন, আপনি কি খান আমাকে বলুন, আমি আপনাকে বলে দেব, আপনি কে এবং কি। জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার খাদ্যের ওপর (Tell me what you eat and I will tell you are. The destiny of a people depend on its diet)।

এই উক্তির নিহিতার্থ সম্বন্ধে সন্দিহান হওয়ার যুক্তি নেই। বস্তুত জাতির জীবনে খাদ্যের ভুমিকা অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্যের গুণগত মান সঠিক পর্যায়ের না হলে শারীরিক এবং মানসিক গঠনের মধ্যে অনেক খুত থেকে যায়। কৃশকায় এই প্রবন্ধে খাদ্য সম্বন্ধে বিশদ আলোচনা করার অবশাই নেই। এ ক্ষেত্রে শুধুমাত্র প্রোটিনসমৃদ্ধ একটি খাদ্য নিয়ে আলোচনা করছি। একথা অনস্বীকার্য যে এমাইনো অম্লজাত পদার্থ প্রোটিন সমৃদ্ধ খাদ্য শরীরের পক্ষে অপরিহার্য। প্রোটিন ভেঙ্গে এমাইনো অম্ল তৈরি হয়ে।

দেখা যায়, নিরামিষ খাদ্যে যতটুকু প্রোটিন থাকে (সাধারণত খাদ্য বাছাই করে না খেলে) সেই প্রোটিনে আমাদের শরীরের চাহিদা পরিপূর্ণ ভাবে মেটে না। এই পরিপ্রেক্ষিতে সয়াবিনের ভূমিকা সম্বন্ধে খানিকটা আলোচনা করা যায়।

জাপানীরা আজা ঢালাওভাবে সয়াবিনকে খাদ্য তালিকায় ব্যবহার করছে। এই উপমহাদেশে অবশ্য সয়াবিনের বাজার এখনো সীমিত। অথচ এই সয়াবিনের মধ্যে প্রোটিন খাদ্যের সবকটা গুনই প্রায় বর্তমান। এর মধ্যে প্রোটিন রয়েছে, রয়েছে কার্বোহাইড্রেট এবং স্নেহজাতীয় পদার্থ। স্বভাবতই প্রশ্ন আসবে সয়াবিন কি ?

সয়াবিনের িএকটা ইতিহাস আছে। সেটি হলো প্রায় ৪০০০ হাজার বছর আগে চীনের পূর্ব সীমানায় একবার একদল ধনী ব্যবসায়ী একটি দস্যুদল কর্তৃক আক্রান্ত হন। প্রাণভয়ে ওই ব্যবসায়ীরা নিকর্টবর্তী এক গিরি সঙ্কটে লুকিয়ে পড়েন। এভাবে অবরুদ্ধ অবস্থায় বেশ কদিন থাকার ফলে স্বভাবতই আহার্য এবং পানীয়ের অভাব ঘটে। এরা তখন ক্ষুধার তাড়নায় গিরিসঙ্কটের এধার ওধারে আহার্য অন্বেষণে মরিয়া হয়ে ঘুরতে থাকেন। এই সময়ে ওরা সীমের মত এক ধরনের ফল দেখতে পান। ক্ষুধায় ক্ষিপ্ত প্রায় ওই ব্যবসায়ীরা সীমের ভেতরকার দানা পেট পুরে খেতে বাধ্য হন। এরপর থেকে ওরা যতোদিন ওই গিরিসঙ্কটে অবরুদ্ধ ছিলেন, ততোদিন ওই দানা খেয়েই তারা জীবন ধারণ করেছেন। শুধু তাই নয় ওরা দানা খাওয়ার ফলে ওদের মধ্যে প্রচন্ড প্রাণশক্তি বেড়ে গিয়েছিলো।

যাই হোক, একদিন যখন এই ব্যবসায়ীরা গিরিসঙ্কট থেকে মুক্তি লাভ করেন, সেদিন তারা ওই জীবন রক্ষাকারী ফল সঙ্গে নিতে ভোলেন না। দেশে ফিরে ওই দানার চাষে মন দেয় ওরা। এশিয়াতে এভাবেই সয়াবিনকে বিশিষ্ট খাদ্য উপাদান হিসাবে মর্যাদা দেয়া হয়।

এরপরে দেখা যাচ্ছে,  এঞ্জেলবার্ট কেমফার নামে এক জার্মান উদ্ভিদ বিজ্ঞানী ১৭৯২ খ্রিষ্টাব্দে জাপান থেকে ইউরোপে সয়াবিন আমদানি করেন। ১৮০৪ খ্রীষ্টাব্দে জাহাজ বাহিত মালের সন্ধানে আমেরিকান একটি জাহাজ চীনের উপকুল পথ বেয়ে ধীরে ধীরে ভেসে চলছিলো। এই যাত্রা দীর্ঘকালিন হওয়ার সম্ভাবনায় ওই জাহাজের ক্যাপ্টেন খাদ্য ঘাটতি মেটানোর জন্য চীন থেকে কয়েক ব্যাগ সয়াবিন তুলে নিয়েছিলেন। আমেরিকাতে সয়াবিন পৌছে গেলো। কিন্তু পরবর্তী শতাব্দীতে আমেরিকাতে কিন্তু সয়াবিন তেমন আদর পেলো না। শুধুমাত্র অশ্ব এবং গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে এর ব্যবহার সীমিত রাখা হলো। এ সময় ওদের ধারণা হয়েছিলো রঙ উৎপাদনের সহায়ক হিসাবে তেল অপেক্ষা সয়াবিন তেলের গুণমান নিকৃস্ট এবং খাদ্য হিসেবেও  এই তেল কার্পাস বীজের তেল থেকে নিম্নমানের। পশুর খাদ্য হিসাবে সয়াবিনের স্থান নির্দিষ্ট হলো দ্বিতীয় শ্রেণীতে। স্বভাবতই প্রথম স্থান অধিকার করে নিলো তিসি।

কিন্তু এরপরেই আমেরিকাতে আবার সয়াবিনের কদর বাড়তে থাকে। এ জন্য অবশ্য আমেরিকান কৃষিবিদ উইলিয়াম যোসেফ মোরস অনেকখানি কৃতিত্ব দাবি করতে পারেন। এই ভদ্রলোক সয়াবিনের স্বপক্ষে জোরালো মতবাদ প্রচার করতে শুরু করেন। তিনি সয়াবিনকে গবাদিপশুর একমাত্র উপযুক্ত খাদ্য হিসাবে সুপারিশ করে সরকারকে জানান। মোরস অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা করে সয়াবিনের গুণমান সমন্ধে নিশ্চিত হওয়ায় চাষীদের কাছে সয়াবিনকে জনপ্রিয় করার উদ্দেশ্য দেশের কৃষি পত্রিকাগুলোতে প্রবন্ধ লেখা শুরু করলেন। এছাড়া উদ্ভিদ বিজ্ঞানী এবং চাষীদের বিভিন্ন সভা সমিতিতে সয়াবিন সর্ম্পকে বক্তৃতা দিয়ে বেড়াতে লাগলেন। এভাবে  একদিন আমেরিকা বাসীর কাছে সয়াবিন একটি গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য উপাদান হিসাবে স্বীকৃতি পেয়ে যায়।

আমেরিকার সরকার সয়াবিনের মূল্যামন সম্বন্ধে নিঃসন্দেহ হয়ে মোরসকে সয়াবিন সম্বন্ধে একগুচ্ছ প্রচার পুস্তিকা লিখতে অনুরোধ জানান। মোরস অনুরোধে সাড়া দিয়ে এ ধরনের চল্লিশখানি প্রচার পুস্তিকা প্রকাশ করেন। শুধু তাই নয়, তিনি ঝটিকাগতিতে দেশের এ প্রান্ত থেকে সে প্রান্ত ঘুরে ঘুরে চাষী, গবেষণা বিজ্ঞানী এবং শিল্পপতিদেরকে সয়াবিন উৎপাদন বাড়াতে এবং উচ্চমানের সয়াবিন বীজ তৈরি করতে অনুপ্রাণিত করেন। তারই একক প্রচেষ্ঠায় পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজারেরও বেশি ধরনের বীজ ভার্জিনিয়াতে এসে পৌছায়। এভাবে পরীক্ষা নিরীক্ষা এবং গবেষণার ক্ষেত্র আরো প্রসারিত হয়। তিনি প্রমাণ করলেন, বিশেষ প্রক্রিয়ায় তৈরি এক কিলোগ্রাম সয়াবিনে ৭৯২ গ্রাম উচ্চমানের প্রোটিন এবং ১৭৮ গ্রাম তৈল থাকে। তিনি আরো বলেন, সারা পৃথিবীতে যখন প্রোটিনের অভাব চলেছে, সেই মুহূর্তে দামি মাংসের তৈরি খাদ্য থেকে প্রোটিন সংগ্রহ না করে স্বল্পদামের সয়াবিন থেকে মাংস অপেক্ষা বেশি প্রোটিন সংগ্রহ করা সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত। তার কথা আজ সত্য হয়েছে।

ঘরে এবং নানাজাতীয় শিল্প সম্ভারে সয়াবিন বাইপ্রোডাক্টের ব্যবহার সত্যিই চমকপ্রদ। কৃত্রিম মাখন থেকে শুরুক করে হিমশীতল মিষ্টান্ন এমনকি আঠা ও ছাপার কালিতেও সয়াবিন বাইপ্রোডক্টস যাদুর চমক আনছে। দুধ সাদা রঙে, পিচ্ছিলকারী তেলে, রাবার টায়ারে এবং অ্যান্টিবায়োটিকসে পর্যন্ত সয়াবিনের উপাদান ব্যবহার করা হচ্ছে। কেক, রুটি, মচমচে বিস্কুট ইত্যাদিকে উৎকৃষ্টতর করার জন্যও সয়াবিন মেশানো হয়। জমির সার কাঠে লাগানোর আঠা, নৌকার ছিদ্র বন্ধ করা, কীটপতঙ্গ বিধ্বংসী ওষুধ, পরিশোধকী পদার্থ ইত্যাদিও সয়াবিন লাগে।

সয়াবিন থেকে তোফু নামে এক রকমের সুস্বাদু দই তৈরি করা যায়। এটি খুবই মুখরোচক। শুকনো সয়াবিনের সঙ্গে চর্বি মিশিয়ে এক ধরনের পনির তৈরি করা যায়। এর থেকে মাখন বের করে নিয়ে একটা প্রেসারের মধ্যে রেখে শক্ত গুট তৈরি করা যায়। এগুলো মাংসের মতো রান্না করে বা তরকারির মধ্যে দিয়ে রান্না খেতেও ভালো লাগে, উপরন্তু প্রচুর প্রোটিন সঞ্চয় করা যায়।

আজকাল আটা, রুটি, বিস্কুট ইত্যাদিকে উন্নতমানের পুষ্টি জোগানের জন্য সয়াবিন মেশানো হচেছ। সয়াবিনের খাদ্য শরীরে বল যোগায় এবং শরীরে চর্বি ও চিনির ভারসাম্য বজায় রাখে। সে জন্য বহুমুত্র এবং কোলেস্টরল সমস্যাজনিত রোগের পক্ষে সয়াবিনের খাদ্য বিশেষ উপকারী প্রমাণিত হচ্ছে। বিশেষ ‍উপকারী প্রমাণিত হচ্ছে যারা গরুর দুধ হজম করতে পারে না, তাদের জন্য সয়াবিন মিশ্রিত দুধ খুবই উপযোগী। কারণ এই দুধে সোডিয়ামের মাত্রা গরুর দুধ থেকে অনেক কম থাকে। রক্তের উচ্চ চাপজনিত রোগের ক্ষেত্রেও এই দুধ উপকারী।

আমেরিকার এক সমীক্ষাতে দেখা যায়, ১৯৩০ এ এরা সয়াবিন উৎপাদন করেছিলো ৩৭৮,০০০ টন। এর ঠিক পঞ্চাশ বছর বাদে ১৯৭৮ – ৮০ তে বছরে গড়ে সয়াবিন উৎপাদন হয়েছিলো ৫৪.৪ মিলিয়ন টন। প্রায় ৬৩০, ০০০ আমেরিকান চাষী। ২৭.১ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে সয়াবিনের চাষ করে। প্রতি হেক্টরে গড়ে ৩৪৭ কিঃ গ্রাম সয়াবিন উৎপাদন হয়।

অধুনা আমেরিকান কৃষি গবেষকরা বিভিন্ন আবহাওয়া উপযোগী এবং স্বল্প বৃষ্টিতে উন্নত ধরনের প্রচুর দানাবিশিষ্ট সয়াবিন উৎপাদনের জন্য দো আশলা বীজ উৎপাদনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। গবেষকরা ধারণা করছেন এভাবে বীজ সৃষ্টি করা সম্ভব হলে পৃথিবীতে সব প্রান্তেই সয়াবিন চাষ সম্ভব করে তোলা যাবে। ফলে প্রোটিন অপুষ্টিতে আক্রান্ত জনসাধারণের পক্ষে এটা হবে আর্শীবাদ। তুলনা টেনে ওরা দেখিয়েছেন, এক হেক্টর জমি যদি পশুপালনের জন্য বরাদ্ধ করা যায়, তবে সেই পশু মাংসে থেকে একজন লোকের ১৯০ দিনের উপযোগী প্রোটিন পাওয়া যায়। যদি ওই জমিতে গমের চাষ করা যায় তবে একজনে উপযোগী ২১৬৭ দিনের প্রোটিন মিলবে কিন্তু যদি ওই জমিতে সয়াবিন চাষ করা যায় তাহলে একজনের উপযোগী ৫৪৯৬ দিনের প্রোটিন পাওয়া যাবে।

অতএব নিঃসন্দেহে সয়াবিন হলো প্রোটিন সমৃদ্ধ এক উন্নতমানের প্রাকৃতিক সম্পদ এই উদ্ভিদের উৎপাদন, গুনগত মান বাড়ানো এবং খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করার মধ্যে পৃথিবীর লোকের বাচার সংস্থান ‍লুকানো রয়েছে। আজ – কাল আমাদের দেশেও এটা প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যাচ্ছে। তাই আমাদের রোজকার খাদ্য তালিকায় সয়াবিনের স্থান বিশিষ্ট হওয়া  উচিত।


Leave a Reply