নিঃসন্তান দম্পত্তিদের কৃত্রিম গর্ভলাভ

  • 0

নিঃসন্তান দম্পত্তিদের কৃত্রিম গর্ভলাভ

নিঃসন্তান দম্পত্তিদের কৃত্রিম গর্ভলাভ

        ‍অসহ্য বেদনা আর হতাশা শিকার নিঃসন্তান দম্পত্তির কাছে বিজ্ঞান আজ আনন্দঘন সুখবর এনে দিয়েছে এমন কয়েকটি পদ্ধতি যেগুলোর মধ্যে দিয়ে নিঃসন্তান দম্পত্তিরাও কৃত্রিম উপায়ে সন্তান উৎপাদনে সক্ষম হতে পারবেন। এ ব্যাপারে সমস্ত কিছু জানালেন ক্যালকাটা হসপিটালের বিশিষ্ট স্ত্রী রোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ আর বি চ্যার্টাজি। কৃত্রিমভাবে সন্তান সৃষ্টি প্রসঙ্গে প্রথমেই বিশেষ কতকগুলো সিষ্টেমের কথা বললেন তিনি। ইনভিট্রো ফার্টিলাইজেশন অর্থ্যাৎ আইভিএফ গ্যামেট ইন ফেলোপিয়ান টিউবি অর্থ্যাৎ প্রোগাম ও এমব্রো ট্রান্সফার অর্থ্যাৎ ইট পদ্ধতিতে কৃত্রিম ভাবে ফার্টিলাইজেশন করা যেমন সম্ভব, সেই সঙ্গে সন্তান না হওয়ার জন্য যারা অপারেশন করিয়েছেন প্রয়োজনে তারা আবার যাতে সন্তান উৎপাদন করতে পারেন সেই বিশেষ উপায়টিও আছে এই পদ্ধতিগুলোতে।

আইভিএফ অর্থ্যাৎ ইনভিট্রো ফার্টিলাইজেশন গর্ভস্থানে বাইরে স্বামী ও স্ত্রীর কীটের মধ্যে মিলন ঘটান হয়। মিলনের পরে এদের কিছুদিন রাখা হয় ইনকিউবিটরে। ইনকিউবিটর শুক্রানু ও ডিম্বানু মিলনের একটি আদর্শ যন্ত্র। ফার্টিলাইজেশন ঠিকমত হয়েছে কি না তা দেখা হয় মাইক্রোস্কোপের সাহায্যে। ফার্টিলাইজেশনের পর ওই ইনকিউবেটর টিউবটির মধ্যেই এর বাড়তে থাকে। চার থেকে ছটি সেল ডিভিশনের পর এদের প্রবেশ করানো হয় জরায়ুতে।

গ্যামেট ইন ফেলোপিয়ান টিউব যার সংক্ষিপ্ত নাম গিফট পদ্ধতি। কৃত্রিমভাবে গর্ভধারনের সফলতম পদ্ধতি এটি। এই পদ্ধতিতে স্ত্রী ও পুরুষের কীট ল্যাপ্রোক্সোপির সাহায্যে ফেলোপিয়ান টিউবে প্রবেশ করানো হয়। ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন পদ্ধতির চেয়ে এই পদ্ধতিতে সফলতার হার বেশি। গিফট সিস্টেমে কিথ ব্রেন এন্ড দিয়ে নেচারকে অনুসরণ করা হয়। সহজে সাফল্য পাওয়া গেলেও ওই পদ্ধতিতে জটিলতাও বেশি। আমরা সকলেই জানি মাতৃজঠরের জরায়ুতে অর্থ্যাৎ ইউটোরাস প্রেগন্যান্সি হয়। কিন্তু গিফট পদ্ধতিতে ইনকিউবেটর অর্থ্যাৎ টেস্ট টিউবে শুক্রানু ডিম্বানুর মিলনের পর ভ্যাজাইনার ছিদ্র দিয়ে ইউটোরাসে প্রবেশ করিয়ে দেয়া হয়।

কিন্তু কোন কারণে প্রেগন্যান্সি ইউটোরাসে না হয়ে ফেলোপিয়ান টিউবে হওয়ারর সম্ভাবনা খুব বেশি। একটোপি প্রেগন্যান্সি নামে পরিচিত এই বিশেষ ধরনের প্রেগন্যান্সি কোন কারণে ইউটোরাস আর ফেলোপিয়ান  টিউবের মাঝখানের ফাক বন্ধা হয়ে যাওয়ার দরুন হয় । অসহ্য যন্ত্রনায় গর্ভবতী তখন ছটফট করে। সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে না নিয়ে যাওয়া হরে গর্ভবতী মায়ের মৃত্যু খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। একটোপি প্রেগন্যান্সি ফেলোপিয়ান টিউবে প্রেগন্যান্সি হওয়ায় এক সময়ে টিউবটি ফেটে যায়। আসন্ন প্রসবার মাতৃজঠরের ভেতরেই রক্তপাত হতে শুরু হয়। সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়াই বাঞ্চনীয়। একটোপি প্রেগন্যান্সির লক্ষণ ইউটোরাসের পাশে ফেলোপিয়ান টিউবে অসহ্য যন্ত্রণা।

নিঃসন্তান দম্পত্তির কৃত্রিম গর্ভ সাধারণের জন্য যে পদ্ধতিগুলোর কথা বলা হয়েছে তার প্রত্যেকটি ব্যয়সাপেক্ষ। সম্পূর্ণ কাজটির জন্য প্রয়োজন একটি সুসংগঠিত টিমের। এই টিমের দলগত প্রচেষ্ঠার উপরই সমস্ত কিছু নির্ভর করে। যেখানে গাইনোক্লোজিস্ট থেকে শুরু করে ইউরোলজিস্ট, এমব্রলজিস্ট, এনডোগাইনোকলজিস্ট, ক্রায়োবায়োলজিস্ট, অ্যানাসথেটিস ট্রেড নার্স প্রত্যেকেরই দরকার।

কৃত্রিমভাবে গর্ভসঞ্চারণের একটি প্রধান কাজ স্ত্রীর ওভারি অর্থ্যাৎ ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বানু সংগ্রহ। দু ভাবে এই ডিম্বাণু সংগ্রহ করা যায় – ল্যাপ্রোস্কোপি যন্ত্রের সাহায্যে ও আলট্রা সোনোগ্রাফি পদ্ধতির সাহায্যে। মেয়েদেরর ওভারিতেই তৈরি হয় ওভাম অর্থ্যাৎ ডিম্বানু। ল্যাপ্রোস্কোপির সাহায্যে দেখে নেয়া হয় ওভারিতে কীট তৈরি হয়েছে কিনা। এইবার ফলিকলের সাহায্যে অ্যাবডোমিনাল রুট দিয়ে তা বার করে নেয়া হয়। দ্বিতীয় পদ্ধতিটিতে অর্থ্যাৎ আলট্রা সেনোগ্রাফ পদ্ধতিতে এগ কালেকশন অর্থ্যাৎ ডিম্বানু সংগ্রহ হয় ভ্যাজাইনার মধ্যো দিয়ে।

বিদেশ থেকে এ ব্যাপারে বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত ডাঃ চ্যাটার্জির মত, ঠিক কোন সময়টিতে এগ সংগ্রহ করা উচিত এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নির্দিষ্ট সময়ে ডিম্বানুকে ডেভল্যাপ করিয়ে নেয়া হয়। স্ত্রীর হরমোন পরীক্ষা করলেই এটি ধরা পড়ে। এ ক্ষেত্রে এল এইচ এ্যাগোনিষ্ট কিংবা লুক্রিন হরমোন ইনজেকশন করে ওভামকে ডেভল্যাপ করিয়ে নেয়া হয়।

এছাড়া ইস্ট্রোজেন লেভেলে ব্লাড কোমোরইন টেস্ট করিয়ে যেমন ডিম্বানু ফার্টিলাইজ করার মত বেড়েছে কিনা দেখে নেন এমব্রোলজিস্ট। সেনোগ্রাফির সাহায্যে ফলিকলের সংখ্যা ও আকৃতি দেখে নেয়া হয়। ফার্টিলাইজেশনের পক্ষে উপযুক্ত একটি ডিম্বানুর দৈর্ঘ্য ১৮ – ২২ মিলি মি এর মধ্যে। এতক্ষণ যে পদ্ধতিগুলোর কথা বলা হল এগুলো মেয়েদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

কৃত্রিমভাবে গর্ভসঞ্চরাণে পুরুষদের ভূমিকাও কিছু কম নয়। মেয়েদের ডিম্বানু সংগ্রহের মতই পুরুষদের শুক্রানু সংগ্রহও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

গিফটগ প্রোগ্রামে ডিম্বানু সংগ্রহের অন্তত দু ঘন্টা আগে পুরুষের শুক্রানু ও ডিম্বানুর মিলনে সৃষ্টি হয় একটি নতুন প্রাণ। ধর্মীয় সংস্কারের গোড়ামিতে অনেকেই চান না মায়ের শরীরের বাইরে নতুন প্রাণের সৃষ্টিকে। তাই টেষ্টটিউব অর্থ্যাৎ ইনকিউবেটরের মধ্যে যাতে শুক্রানু ডিম্বানুর মিলন না হয়,  সে জন্য কিছুটা এয়ার বাবল এদের মধ্যে মাঝখানে ঢুকিয়ে দেয়া হয়, যাতে ফার্টিলাইজেশন ইনকিউবেটরে না হয়ে ইউটোরাসের দু পাশে যে ফেলোপিয়ান টিউব আছে তার একটিতে হয়্ অনেক সময়  একজন পুরুষ যথেষ্ট পরিমাণে শুক্রাণু তৈরি করতে পারে না। স্ত্রী ও পুরুস দু জনের ক্ষেত্রেই যথেষ্ট পরিমাণে এগুনো না থাকলে হরমোন প্রয়োগ করে এগুলো বাড়ানো হয়। একটি ডিম্বাণূর পরিবর্তে যাতে তিন চারটি ডিম্বানু তৈরি হয় সে কারণেই প্রয়োগ কার হয় এই হরমোন।

আইভিপি পদ্ধতিতে ডিম্বানু সংগ্রহের পনেরো মিনিটের মধ্যে পুরুষের শুক্রাণূ সংগ্রহ করে এনডোগাইনোকোলজিস্ট। সেই বিশেষ মুহূর্তে কোন পুরুয যদি শুক্রাণু উৎপন্ন করতে না পারেন তবে সেক্ষেত্রে স্ত্রীর এগ সংগ্রহের এক সপ্তাহ আগে পুরুষের  কীট সংগ্রহ করে তাকে ফ্রিজিং করা হয় অর্থ্যাৎ ফ্রিজের মধ্যে রাখা হয়। ফ্রিজে থাকার ফলে এটি ঠান্ডা হয়ে গেল ডিম্বানু সমেত এটিকে ইউটোরাসে প্রবেশ করানোর বেশ কিছুক্ষণ আগে এটিকে সাধারণ তাপমাত্রায় নিয়ে আসা হয়। ফ্রিজিং করা থেকে শুরু করে শুক্রাণুকে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় নিয়ে আসার কাজটি করেন ক্রায়ো বায়োলজিজিস্ট সিমেন তৈরি করেন এনড্রোলজিস্ট।

একটু থামলেন ডাঃ চ্যার্টাজি – দেখছেন তো কি বিরাট কর্মযজ্ঞ। আগেই বলেছি না, কোন  একজনের পক্ষে এই বিশাল কর্মযজ্ঞটি সম্পূর্ণ করা সম্ভব নয়। ডিম সংগ্রহ থেকে শুরু করে একেবারে ইউটোরাসের মধ্যে প্রবেশ করানো পর্যন্ত যে বিশাল কর্মযজ্ঞ তাতে একজন গাইনোকোলজিস্ট ভূমিকা শুধুমাত্র এগ কালেকশন করা ও ফার্টিলাইজড ওভামকে আইভিএফ কিংবা গিফট ইটি পদ্ধতির সাহায্যে ইউটোরাসে প্রবেশ করান। তাহলে এনডোগাইনোকোলজিস্ট কি করেন ? তার প্রধান কাজ এগের অর্থ্যাৎ কীটগুলো ঠিকমত বেড়েছে কি না তা দেখা অর্থ্যাৎ প্রজননের পক্ষে এরা যথোপযুক্ত হয়ে কি না তা পর্যবেক্ষণ করা। আইভিপিইটি কিংবা গিফট যে পদ্ধতিতেই গর্ভসঞ্চারণ করা হোক না কেন এনডোগাইনোকোলজিস্টকে আরও একটি কাজ করতে হয়। শুক্রাণু ডিম্বাণুর স্বাভাবিক মিলনে প্রেগন্যান্সি যেখানে সম্ভব নয় সে ক্ষেত্রে এনডোগাইনোকোলজিস্ট হরমোন ইনজেক্ট করে প্রেগন্যান্সি ডেভল্যাপ করে।

ফার্টিলাইজেশন কখন করা হবে সেটি নির্ধারণ ও টিস্যুর কাজকর্ম তিনিই পর্যবেক্ষণ করেন। কীট যার মধ্যে থাকে সেই ফলিকলের বৃদ্ধি লক্ষ্য করেন আলট্রাসোনোগ্রাফার। ফার্টিলাইজেশন পরে ইউটোরোসে ভ্রুণ কতটা পরিমাণে বাড়ছে তিনিই তা লক্ষ্য করেন সেদিক থেকে বলতে গেলে এনডোলজিস্টের কাজ খুবই অল্প। শুধু সিমেন তৈরিও তাকে বের করে আনা তার কাজ।

কথা প্রসঙ্গে বেরিয়ে এল যে ভারতবর্ষের বোম্বাইয়ের কিং এডওয়ার্ড মেমোরিয়াল হাসপাতালে ২৩ বছরের মনি শ্যামজি চাউডা একটি কন্যা সন্তানের জন্ম দেন। কেম হাসপাতালের অভিজ্ঞ স্ত্রী রোগ চিকিৎসক ডাঃ ইন্দিরা হিন্দুজার পরিচালনায় চাউডার পরিবারে যে টেস্ট টিউব শিশুটি জন্মায় তার ওজন ছির ২.৮ কেজি। ভারতে প্রথম টেস্টটিউব বেবি তৈরিতে স্বীকৃতি পেয়েছে  এই হাসপাতাল। ১৯৭৮ সালে জুলাই মাসে কলকাতা এ ব্যাপারে সাফল্য পেলেও প্রমাণযোগ্য কোন নথিপত্র না থাকায় কৃত্রিমভাবে গর্ভসঞ্চারের স্বীকৃতি আদায় করে নিয়েছে বোম্বাই।

আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে ৩০০০ এর বেশি শিশু জন্ম নিয়েছে এই ভাবে। যে সমস্ত দেশ এ ব্যাপারে অংশ নিয়েছে তার একটি তালিকা তৈরি করলে দেখা যাবে প্রথম স্থানটি নিয়েছে ব্রিটেন। সাফল্যের চাবিকাঠি ব্রিটেন ছিনিয়ে নিয়েছিল ১৯৭৮ সালে। ইংল্যান্ডের এডওয়ার্ড স্টেপটো, লেসকি ব্রাউনের মত বিশিষ্ট চিকিৎসকদের চেষ্টায় আইডিএফ ও অন্যান্য পদ্ধতিগুলোর সুযোগ সুবিধা পৌছে যাচ্ছে একের কাছ থেকে অন্যোর কাছে। আমাদের দেশে সরকারীভাবে কোন প্রচেষ্টা নেয়া হয়নি। যেটুকু হয়েছে তার সবটুকুই ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায়।

একটি সুস্থ সবল শিশু কে না চায়। কিন্তু এমন অনেক দম্পত্তি আছেন যারা স্বাভাবিকভাবে একটি সুস্থ শিশুর জন্ম দিতে অপারগ। তাদের ধারণা, আইভিএফ কিংবা গিফট পদ্ধতিতে সব কিছুই সম্ভব। কিন্তু না, সব সময়ই যে সাফল্য পাওয়া যাবে তা নয়। ডাঃ চ্যার্টাজির ভাষায় অনেক, অনেক ব্যর্থতার পর হয়ত একটিমাত্র ক্ষেত্রে পরীক্ষা নিরিক্ষা করে সাফল্য পাওয়া গেল। তাই স্বামী স্ত্রী কে মানসিক দিক থেকে সম্পূর্ণভাবে নিজেদের তৈরি করে নিতে হবে। কে না জানে বলুন ব্যর্থতার মধ্যেই নিহিত থাকে সাফল্যের বীজটি। ভাবলেও ভালো লাগে যে মানুষ নিজেই আজ আবিষ্কার করেছে সৃষ্টির চাবিকাঠি। জয় হোক মানুষের, জয় হোক মানবতার।

(মূল আলোচনা কলকাতার মনোরমা থেকে নেয়া)


Leave a Reply