ক্যান্সার চিকিৎসার সুযোগ সুবিধা

  • 0

ক্যান্সার চিকিৎসার সুযোগ সুবিধা

Category : Health Tips

ক্যান্সার চিকিৎসার সুযোগ সুবিধা

ডাঃ আহসান শামীম

ক্যান্সার রোগ সম্পর্কে আমাদের মাঝে পরিষ্কার ধারনা নেই। এর চিকিৎসা সম্পর্কে রয়েছে এক গম্ভীর হতাশা। এ রোগ হওয়া মানে ‘অবধারিত মৃত্যু’ এ রকম একটা দুশ্চিন্তা আমাদের অনেকের মাঝেই রয়েছে। আসল চিত্রটা কিন্তু এরকম নয়। মানুষের শিক্ষা, সচেতনাতা আর বিজ্ঞানের উন্নয়নে ক্যান্সার রোগ নির্ণয় যেমন দ্রুত ও সহজ হয়েছে তেমনি এর চিকিৎসার ক্ষেত্রে ঘটেছে বিপুল উন্নতি। বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশেরও এ সকল ক্ষেত্রে অনেক উন্নয়ন হয়েছে। সরকারী ও বেসরকারী উভয় পাতই এ কৃতিত্বের দাবিদার। আধুনিক যন্ত্রপাতি, উন্নত প্রযুক্তি, প্রশিক্ষিত দক্ষ জনবল ইত্যাদির সহযোগীতায় দেশে ক্যান্সার চিকিৎসার ফলাফর এখন অনেকটা আশাপ্রদ। বাংলাদেশে এখন ক্যান্সার চিকিৎসার এক উজ্জ্বল দিগন্তের দ্বারপ্রান্তে। ক্যান্সার চিকিৎসার প্রথম প্রয়োজন রোগের সঠিক ধরন, বিস্তৃতি আর আনুষাঙ্গিক শারীরিক পরিবর্তণ নির্ণয়। রোগটি ক্যান্সার কিনা তা এখন অনেক থানাতে বা সব জেলা সদরে বসেই সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব। ঢাকাসহ দেশের পুরোনো আটটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ক্যান্সার রোগের সুযোগ সুবিধা সম্প্রসারিত করা হয়েছে। এই রোগ নির্ণয়ে দেশে বিদ্যমান সুযোগ সুবিধা সর্ম্পকে প্রথমে আলোকপাত করছিঃ

রুটিন পরীক্ষা

এ সকল সাধারণ প্যাথলজী ও অন্যন্য পরীক্ষা কোন কোন থানায় এবং সকল জেলা সদরসহ বড় বড় শহরে করানো যায়। যেমনঃ

১) রক্তের টিসি,ডিসি, ইএসআর, সুগার,  ইউরিয়া ইত্যাদি।

২) এক্সরে যেমন বুকের হাড়ের ইত্যাদি।

৩) মল মুত্র।

বিশেষ পরীক্ষা

এ সকল পরীক্ষা একটু উন্নতমানের সকল সরকারী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সামরিক হাসপাতাল, ঢাকাসহ বড় বড় শহরে করানো যায়।

১) কনট্রাসট এক্সরে যেমন বেরিয়াম মিল আই ভি পি ইত্যাদি।

২)  এন্ড্রোসকপি উপরের খাদ্যনালী পরীক্ষা, মুত্রথলি ইত্যাদি।

৩) প্যাপম স্মীয়ার এটি একটি সহজ পরীক্ষা কিন্তু খুব প্রয়োজনীয় পরীক্ষা। যেহেতু বাংলাদেশে জরায়ুর ক্যান্সার বেশি তাই এ পরীক্ষা জরুরী। এতে জরায়ুর মুখের রস পরীক্ষা করেই রোগ ধরা যায়।

৪) এফএনএসি এটিও খুব সহজ ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা। সিরিঞ্জের ……….. …. ..ক্যান্সার কিনা বা কি ধরন যা বলে দেয়া যায় পরীক্ষা করে।

৫) হিসটোপ্যাথলজিঃ টিউমারের অংশ কেটে এনে এর ধরন ও আকৃতিগত সীমানা নির্ণয় করা যায়।

৬) রক্তের বায়োকেমিক্যাল পরীক্ষাঃ ক্যান্সার হলে রক্তে অনেক পরিবর্তণ হয় যা এ টেস্ট করে বোঝা যায় যেমন এস জি পি টি ইউরিয়া।

৭) আইসটোপ পরীক্ষাঃ  থাইরয়েড গ্লান্ডের ক্যান্সার বা কার্যকক্ষতা হাড়ের টিউমার ইত্যাদি ধরা যায়।

৮) আলট্রাসনোগ্রাম, ইসিজি ইত্যাদি।

উন্নত বিশেষ পরীক্ষা

এ সকল পরীক্ষা প্রধানত ঢাকায়, কোন কোন বিভাগীয় শহরে করানো সম্ভব। ঢাকার পিজি হাসপাতাল, বার্ডেম হাসপাতাল, ক্যান্সার হাসপাতাল, সিএমএইচ আইসিডিডিআরবি ঢাকা মেডিকেল,  হলিফ্যামিলি হাসপাতাল ও কিছু কিছু প্রাইভেট ল্যাবরেটরিতে এ সকল টেস্ট করানো যায়।

১) সিটি স্ক্যানঃ একটি উন্নত এক্সরে যাতে খুব ছোট আকৃতির টিউমার ধরা যায়।

২) ব্রংকোসকপিঃ ফুসফুসের ভিতরে রোগের ধরণ ও বিস্তার এবং বায়েপসি বা রস এনে পরীক্ষা করা যায়।

৩) ল্যাপারসকপিঃ খুব সামান্য কেটে পেটের রোগের ধরণ, বায়োপসি অপারেশন ইত্যাদি করা যায়,  রোগী দ্রুত সেরে ওঠে।

৪) কলপোসকপিঃ জরায়ুর মুখে রোগ নির্ণয়, আকৃতি, বিস্তৃতি ও অপারেশন করা যায়।

৫) ই ই জি ই এম জিঃ মস্তক ও মাংসের কার্যকক্ষতা দেখা যায়।

৬) আইসোটোপ স্ক্যানঃ লিভার, ব্রেইন,  হাড়ের  টিউমার ধরা যায়।

৭) সাইটোপ্যাথলজিঃ টিউমারের রস বা ছড়ানো কোষের ধরণ নির্ণয় করা যায়।

৮) হরমোনের মাত্রা নির্ণয়ঃ ক্যান্সারে যে সকল হরমোনের মাত্রায় পরিবর্তন হয় তা ধরা যায়।

৯) টিউমার মার্কায়ঃ কোন কোন টিউমার হলে রক্তে বিশেষ ধরনের পরিবর্তণ হয় তা এই পরীক্ষায় নির্ণয় করা যায়।

১০) ফ্রজেন সেকশন বায়োপসিঃ অপারেশন চলাকালীন দ্রুত টিউমারের ধরণ ও আকৃতিগত সীমানা নির্ণয় করা যায়।

১১) জটিল এন্ডাসকপিঃ ন্যাসোফেরিংস, কোলন, ইউরেটর ইত্যাদি দেখা যায়।

১২) ই আর সিপিঃ পিত্তথলির পথ, অগ্নাশয়, খাদ্যনালী ইত্যাদি দেখা যায়।

১৩) ম্যামোগ্রাফীঃ মেয়েদের স্তনের প্রাথমিক অবস্থায় খুব ছোট আকৃতির টিউমার নির্ণয় করা যায়।

১৪) উন্নত অ্যালট্রাসোনোগ্রাম।

১৫) সিটি স্ক্যান,  এক্সরে বা আলট্রাসনোগ্রামের সাহায্যে এফএনএসি পরীক্ষা।

১৬) এমআরআইঃ এটি একটি উন্নত এক্সরে এর মত ছবি তোলে। ঢাকাতে দু টো মেশিন শিগগিরি চালু হবে।

চিকিৎসা

ক্যান্সার চিকিৎসা প্রধানত তিনভাবে করা যায়।

১) শৈল্য বা সার্জারি, ২) বিকিরণ বা রেডিয়েশন, ৩) কেমোথেরাপি বা ওষুধ প্রয়োগ। কোন কোন ক্যান্সার রোগীর জন্য একাধিক পদ্ধতির প্রয়োজন হতে পারে বাংলাদেশে সুযোগ সুবিধাগুলো সম্পর্কে এখন আলোকপাত করছিঃ

শৈল্য বা সার্জারি চিকিৎসা

এই চিকিৎসায় টিউমার কেটে ফেলা হয় বা আকৃতিতে ছোট করা হয় অথবা রোগীর উপযোগী সুবিধাজনক কোন অপারেশন করা হয়। এই সকল অপারেশন তিন ভাগে ভাগ করা যায়, মাইনর অপারেশন, মেজর অপারেশন, বিশেষ জটিল অপারেশণ।

মাইনর অপারেশন

শরীরের বাইরের দিকে, ছোট বা আকৃতি বোঝা যায় এমন অপারেশন এবং যেখানে রোগীকে সম্পূর্ণ অজ্ঞান করতে হয় না। থানা জেলা সদর বা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সব জায়গাই এই অপারেশন করা যায়। প্রতিটি থানায় মেডিকেল গ্রাজুয়েট ডাক্তার রয়েছেন। বায়োপসি করাতেও এ রকম অপারেশন বেশির ভাগ প্রয়োজন হয়।

মেজর অপারেশন

এ সকল অপারেশনে রোগীকে সম্পূর্ণ অজ্ঞান করতে হয়। এর মধ্যে জেনারেল সার্জারি, গাইনি সার্জারি, শিশুদের সার্জারি জেলা সদর থেকে সব জায়গায় করানো যায়, প্রতিটি জেলাতে বিভিন্ন বিষয়ে পোস্ট গ্রাজুয়েট চিকিৎসক রয়েছেন।

বিশেষ জটিল অপারেশন

এ সকল অপারেশনে জটিল পদ্ধতি অনুসারণ করা হয়। উন্নত অপারেশন থিয়েটার, আধুনিক যন্ত্রপাতি, উচ্চতর প্রযুক্তি এতে ব্যবহৃত হয়। কিছু কিছু মেডিকল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকার সরকারী ও বেসরকারী হাসপাতাল,  এবং ক্লিনিক, সিএমএইচ চট্রগ্রামের দু চারটি ক্লিনিকে এ অপারেশনের সুযোগ রয়েছে। ক্যান্সার সংক্রান্ত এ সকল অপারেশনের মধ্যে রয়েছেঃ

ক) নিউরো সার্জারী

খ) ইউরো সার্জারী

গ) তোরাসিক সার্জারী

ঘ) হেপাটোবিলিয়ারী ও গ্যাস্ট্রে এন্টারিক সার্জারী

ঙ) অর্থোপেডিক সার্জারি

চ) ল্যাপারসকোপিক সার্জারী

ছ) হেডনেক সার্জারী

জ) প্লাস্টিক রিকনস্ট্রাকটিভ সার্জারী

ঝ) ফ্যাসিও ম্যারিক্সলারী সার্জারী

ঞ) ক্রায়ো সার্জারী

ট) এন্ডাসকপি সার্জারি ইত্যাদি

       বিবিকরণ বা রেডিয়েশন চিকিৎসা

এই চিকিৎসায় তাপবিহীন এক বিকিরণের মাধ্যমে টিউমারকে ধ্বংস বা ছোট করে দেয়। এর মধ্যে টেলিথিরাপীতে কোবাল্ট ৬০ নামক মেশিন দিয়ে চিকিৎসা করা হয় যা এখন ঢাকা মেডিকেল । মহাখালীর ক্যান্সার হাসপাতালে ও ঢাকার একটি প্রাইভেট ক্লিনিকে দেয়া হয়। বাকী ছয়টি পুরেনো মেডিকেলে এই মেশিন শিগগিরই কাজ শুরু করবে। সিজিয়াম ১৩৭ মেশিন শুধু ঢাকা মেডিকেরে এবং ডীপ এক্সরে নামক মেশিন ঢাকা, চট্রগ্রাম,রাজশাহী, সিলেট ও ময়মনসিংহ মেডিকেলে চালু আছে।

লিনিয়ার িএকসিলিরেটর নামক উন্নত রেডিয়েশন মেশিন ঢাকার সি এম এইচ এ আছে। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে কাজ করছে না। বিকিরণ চিকিৎসা দেয়ার জন্য প্রতিটি মেডিকেলে ও ক্যান্সার হাসপাতালে পোষ্ট গ্রাজুয়েট ডাক্তারসহ আলাদা বিভাগ ও দক্ষ লোকবল রয়েছে।

ব্রাকিথিরাপি

টিউমারের খুব কাছে বা লেগে থেকে এ বিকিরণ দেয়া হয়। ঢাকার ক্যান্সার এ চিকিৎসা দেয়া শুরু হয়েছে। শিগগিরই আরো উন্নত মেশিন চালু হবে।

কনট্যাকট থিরাপী

চোখের কিছু টিউমারে ঢাকার পিজি হাসপাতালের নিউক্লিয়ার মেডিসিন বিভাগ এ চিকিৎসা দেয়।

এ্যাবলেশন চিকিৎসা

কোন কোন থাইরয়েড ক্যান্সারে এ রকম চিকিৎসা পিজি হাসপাতালের নিউক্লিয়ার মেডিসিন বিভাগ দিয়ে থাকে।

কোমোথিরাপি

এ জাতীয় ক্যান্সার চিকিৎসার ওষুধ প্রয়োগ করে ক্যান্সার কোষ ধ্বংস বা নিয়ন্ত্রণ করে, ট্যাবলেট, ইনজেকশন এ সকল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকার বড় হাসপাতাল ও প্রাইভেট ক্লিনিক বা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মাধ্যমে চিকিৎসা নেয়া সম্ভব। এর ওষুধগুলো বাংলাদেশের ঢাকাসহ বড় বড় শহরে পাওয়া যায়। সরকারী বড় হাসপাতালেও পাওয়া যায়।

ক্যান্সার হসপিস, পুনর্বাসন ও পেইন ক্লিনিক

ঢাকায় একটি ক্লিনিক রয়েছে। ক্যান্সারজনিত অত্যাধিক ও ক্রনিক ব্যথার জন্য এখানে ব্যবস্থা দেয়া হয়। ক্যান্সার রোগীর টার্মিনাল কেয়ার ও পূনবার্সনের দু একটি প্রতিষ্ঠান পরিকল্পনা করেছেন। কাজ শুরু হয়নি।

ক্যান্সার ইনস্টিটিউট

ক্যান্সার চিকিৎসার এটি একটি সরকারী জাতীয় প্রতিষ্ঠান। সকল আধুনিক সুযোগ সুবিধা এখানে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে। রোগীর চিকিৎসার জন্য সপ্তাহের তিন দিন বিভিন্ন বিশেষজ্ঞরা বোর্ড করে সিদ্ধান্ত দেন, কোমোথিরাপীর জন্য ডে কেয়ার এর ব্যবস্থা আছে। প্রাথমিকভাবে ক্যান্সার রোগ নির্ণয়ের বিশেষ সুযোগ সুবিধা এখানে আছে। বাংলাদেশের ক্যান্সার চিকিৎসার সুযোগ সুবিধা সর্ম্পকে এখানে একটা সংক্ষিপ্ত স্বচ্ছ ধারণা দেয়া হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে রোগীর পরিবার পরিজন নিজেরাও সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন রোগীকে কখন কোথায় নিতে হবে আর চিকিৎসার কি কি সুবিধা এখানে সহজলভ্য। ক্যান্সার রোগীকে নিয়ে আপনার আর অকারণে দেরি করতে হবে না।

 


Leave a Reply