গৃহবধুর মনোবিশ্লেষণ

  • 0

গৃহবধুর মনোবিশ্লেষণ

Category : Health Tips

নারী প্রসঙ্গ

গৃহবধুর মনোবিশ্লেষণ

অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল

অপর প্রাণ্ত থেকে ফিসফিস শব্দ ভেসে আসে।  আপা আমি নুরুল হক বলছি। স্যার, মানে জামান  স্যার একঘন্টা পূর্বে জেসমিনকে তার রুমে ডেকেছেন নোট নিতে। এখনও বেরোয়নি রুম থেকে। দরজার বাইরে  লালবাতি জ্বলছে। অর্থ্যাৎ কেউ রুমে এখন ঢুকতে পারবে না।

স্বামীর অফিসে রূপবতী পিএ

টেলিফোন শব্দ পেয়ে ড্রইংরুমে ছুটে আসেন মিসেস নাজমা জামান অপেক্ষা করছিলেন তিনি টেলিফোনের জন্য।

ইতিমধ্যেই শুনেছেন তিনমাস পূর্বে স্বামী খুরশীদ জামানের অফিসে নতুন এক পিএ চাকরি পেয়েছে। নাম জেসমিন। মেয়েটি অসাধারণ রূপবতী। নতুন পিত্র জয়েন করার পর জামানের আচরণে বিরক্তি দেখা যাচ্ছে। হঠ্যাৎ হঠ্যাৎ তিনি রেগে যাচ্ছেন। সকালে অফিসে যাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়েছেন।

আরও শুনেছেন প্রায়ই পিএ ডেকে তিনি সামনে বসিয়ে রাখেন। গল্প করেন। পিএ এর সাথে এত কি গল্প!

মন ছটফট করে নাজমার। ঘুম চলে গেছে। খাবার রুচিও কমে গেছে। চোখের নীচে কালি জমেছে। অল্প ক দিনে এমন অবস্থান।

অফিসে এক পরিচিত স্টাফ আছে। তাকে বলেছিলেন পিএ জেসমিন যখন  বসের রুমে ঢোকে, তাকে টেলিফোন করতে। সেই টেলিফোনের জন্যই অপেক্ষা করছিলেন মিসেস নাজমা।

উদ্বেগ বুকে পুরে টেলিফোন সেটটি তুলে নেন তিনি। মিসেস জামান বলছি। কে বলছেন প্লিজ ? অপর প্রাণ্ত থেকে ফিসফিস শব্দ ভেসে আসে। আপা আমি নুরুল হক বলছি। স্যার মানে জামান স্যার একঘন্টা পূর্বে জেসমিনকে তার রুমে ডেকেছেন নোট নিতে। এখনও বেরোয়নি রুম থেকে। দরজার বাইরে লালবাতি জ্বলছে। অর্থ্যাৎ কেউ রুমে এখন ঢুকতে পারবে না। ঝিমঝিম একটি তরঙ্গ হঠ্যাৎ করে জেগে ওঠে মাথায়। মাথা জ্যাম হয়ে যায়। কান গরম হয়ে ওঠে। মুখ লাল হয়ে ওঠে। প্রায় পড়েই যাচ্ছিলেন মিসেস জামান।

নিজেকে  সামলে নিলেন অল্পসময়ের মধ্যে। স্থির হয়ে বসে পড়লেন। টেলিফোন সেটটি কোলে টেনে নিয়ে স্বামীকে ডায়াল করেন। রিং হচ্ছে। রিসিভার কানের কাছে ধরে থাকেন মিসেস জামান। হ্যালো, স্বামীর কন্ঠ ভেসে আসে। তাহলে পিএ নিজ টেবিলে নেই। স্বামীর রুমে আছে। ব্যাপারটি বোঝা গেল। কারণ পিএই প্রথমে টেলিফোন রিসিভ করে। এখন রিসিভ করেছে স্বামী।

কী করছে ? থমথমে গলায় প্রশ্ন করলেন মিসেস জামান।

অফিসিয়াল কাজ করছি। উত্তর দিলেন জামান সাহেব। তোমার নতুন পি এ কোথায় ? নিজে টেলিফোন রিসিভ করলে কেন ? ওঃ! সে আমার সামনে আছে। নোট দিচ্ছি। এ কারণে সরাসরি টেলিফোনের রিং আমার টেবিলে চলে এসেছে।

কতক্ষণ নোট নিচ্ছো ? এই তো মাত্র এল।

ঠাস করে টেলিফোন রেখে দিলেন মিসেস জামান। স্বামী মিথ্যা বলছে। মিথ্যা বলার কারণ কী ? পি এ রুমে ঢুকেছে প্রায় এক ঘন্টা হয়েছে। সে বলছে মাত্রই এসেছে।

কষ্ট হচ্ছে, ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। মাথাব্যথা শুরু হয়েছে। বুকের তলায় বালিশ রেখে শুয়ে পড়েন তিনি। কান্না আসছে। বুক ভাসিয়ে কাদলেন তিনি অনেকক্ষণ।

মনোদৈহিক বিশ্লেষণ

উদ্বেগ, উৎকন্ঠা মানবমনে নেতিবাচক চিন্তার বিস্তার ঘটায়। একটি নেতিবাচক চিন্তা দেহের কোষে কোষে লক্ষ্য রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটায়- চোখ অশ্রুতে ভেসে যায়, হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়, রক্তচাপ বাড়ে, শ্বাস প্রশ্বাসের অনিয়ম দেখা দিতে পারে, দেহের পেশিতে টেনশন তৈরি হতে পারে, পেটে টেনশন হতে পারে ইত্যাদি নানা উপসর্গ ছড়িয়ে পড়তে পারে দেহে।

মিসেস নাজমা জামানের এখনকার অবস্থা তেমন পর্যায়ে রয়েছে। চিকিৎসকরা পরীক্ষা নিরীক্ষার পর এ ধরনের উপসর্গের কোনো প্যাথলজি খুজে পান না। অর্থ্যাৎ রোগ ধরা পড়ে না দেহের। তখন রোগীর উদ্বেগ অশান্তি আরও বেড়ে যায়। কারণ উপসর্গের যাতনায় রোগী কষ্ট পায়। রোগ নেই বললেই সেই কষ্টের লাঘব হয় না। যাতনা বাড়তেই থাকে। মনের স্বাস্থ্যে ধস নামতে থাকে। ফলে দৈহিক সমস্যা প্রকট হতে থাকে, দৈহিক স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে মানসিক স্বাস্থ্য হচ্ছে মূল স্বাস্থ্যের বড় একটি অংশ। অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক রয়েছে দেহ ও মনের মধ্যে। দৈহিক স্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ অ  ঙ্গ প্রতঙ্গ হচ্ছে ফুসফুস, হার্ট, লিভার, কিডনি,ব্রেইন ইত্যাদি।

মনের স্বাস্থ্যের তেমনি গুরুত্বপূর্ণ ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া হচ্ছে প্রত্যক্ষণ, আবেগ, প্রেরণা, চিন্তা, শিক্ষা মেমোরি ইত্যাদি।

দেহের স্বাস্থ্য নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন হই, ছুটে যাই চিকিৎসকের কাছে। মনের স্বাস্থ্যের অংশ যেমন আবেগ, চিন্তা, প্রেষণা, প্রত্যক্ষণ আক্রান্ত হলে আমরা বুঝি না, চিকিৎসার প্রয়োজন টের পাই না অজ্ঞতার কারণে। ফলে ভুগতে থাকি, কুসংস্কারাচ্ছন্ন থাকি।

ঘরের মেঝেতে একটি তেলাপোকা মরে থাকতে আমরা দেখি। কিন্তু মন মরে আমরা থাকলে দেখি না বা খেয়াল করতে চাই না। মনের কষ্ট ‍দুর করতেও কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করি না।

নিবন্ধের শুরুতে মিসেস নাজমা জামানের জীবনের ছোট অথচ গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপটে আমরা দেখতে পাই; তার চিন্তনে ঝড় শুরু হয়েছে। চিন্তার ঝড় আবেগে হানা দিয়েছে। উদ্বেগ, উৎকন্ঠা বেড়েছে। বিশ্বাসের ভিত টলে উঠেছে।

ভালোবাসা হারানোর থ্রেট জেগে উঠেছে মনে। একধরনের গোপন স্ট্রেস দেহের বায়োকেমিক্যাল সিস্টেমেও  এলোমেলো ঢেউ তোলে। স্ট্রেস হরমোন কার্টিসল এবং এড্রেনালিন বেড়ে থাকে দেহে। ফলে দেহে আরও বহুমাত্রিক উপসর্গ বাড়তে থাকবে।

মিসেস জামানের যাতনা দীর্ঘস্থায়ী হলে ক্রমাগত স্ট্রেস হরমোনের দাপটে নান রোগ তৈরি হয়ে যেতে পারে, দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ধস নেমে যেতে পারে।

মিসেস জামানের তাৎক্ষনিক তীব্র প্রতিক্রিয়ায় আমরা দেখেছি দৈহিক ‍উপসর্গ মাথাব্যথা, নিদ্রহীনতা,খাবারে অরুচি। এগুলো শারীরিক উপসর্গ। আরও দেখেছি কষ্ট। মনের কষ্ট। মনের বিষাদ, উদ্বেগ এবং দেখেছি কানাসিক্ত প্রতিক্রিয়া। এগুলো মানসিক প্রতিক্রিয়া, মানসিক উপসর্গ।

দেহমন এভাবে পরস্পরের সাথে সম্পর্কিত। মনের কারণে দেহে উপসর্গ আসে। আবার দেহে ব্যাধি হলে যেমন হৃদরোগ, ডায়াবেটিস , এইডস, ক্যান্সার ইত্যাদি রোগের পর নানা ধরনের মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। বিশেষত বিষণ্নতা রোগ বাসা বাঁধে মনে। বিষন্ণতার কারণে মূল দৈহিক সমস্যঅ আরও প্রকট আকার ধারণ করে।

সপ্তদশ শতকের গোড়ার দিকে পশ্চিমা দেশগুলোর সংস্কৃতিতে মন  এবং দেহকে আলাদা ভাবা হতো। মেডিকেল সায়েন্স তখন কেবলমাত্র দৈহিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোঁড়াখুঁড়ি করত, পরীক্ষা নিরীক্ষা করত। তখন মনের অনুষঙ্গগুলোকে মসজিদ, মন্দির কিংবা গির্জার আরাধনার বিষয় হিসেবে চালিয়ে দেয়া হতো।

গত ত্রিশ বছরে বিজ্ঞানীরা পূর্বের ধারনা থেকে বেরিয়ে এসেছেন। দেহ মনের কানেকশন নিয়ে গবেষণার পর গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। গবেষকরা বলছেন, যারা দারিদ্রতা, কর্মক্ষেত্রে অশান্তি, চাপ ইত্যাদি ভুগছেন, যারা সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে একাকী জীবনযাপন করছেন এবং যারা আচমকা প্রিয়জন হারানোর বেদনায় পুড়ছেন তারা দৈহিক এবং মানসিক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ক্ষেত্রে সন্তুষ্ট সুখী মানুষ অপেক্ষা বেশি ঝুকিপূর্ণ।

স্বাস্থ্য সেবার ক্ষেত্রে একুশ শতকের ‘মাইন্ড বডি মেডিসিন’ এর যুগান্তকারী দাবি হচ্ছে জীবন যাপনের বহুমাত্রিক পরিবর্তন যেমন লাইফ স্টাইল বদলানোর মাধ্যমে আমরা অনেক ‍অসুখ বিসুখ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারি।

ওষুধ ব্যবহার করে ট্রাডিশনাল প্রথায় সেটে থেকে ভালো থাকার চেয়ে লাইফস্টাইল এবং আচরণ বদলে আমরা অনেক বেশি ভালো থাকতে পারি।

ভালোবাসার হারানোর থ্রেট জেগে উঠেছে মনে। এক ধরনের গোপন স্ট্রেস দেহের বায়োকেমিক্যাল সিস্টেমেও এলোমেলো ঢেউ তোলে। স্ট্রেস হরমোন কর্টিসল এবং এড্রেনালিন বেড়ে থাকে দেহে। ফলে দেহে আরও বহুমাত্রিক উপরসর্গ বাড়তে থাকবে।

অস্বাস্থ্যকর জীবন যাপন, খাদ্য গ্রহণে অনিয়ন্ত্রিত অভ্যাস, দৈহিক কর্মকান্ডে স্থবিরতা গতিহীণতা এবং মানসিক চাপ বর্তমান বিশ্বে বহু ধরনের শারীরিক এবং মানসিক রোগের জন্য দায়ী। ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ফিজিক্যাল ট্রমার চেয়েও উদ্বৃত্ত বিষয়গুলো বেশি ক্ষতিকর বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ মুড, এটিচুড, এবং বিশ্বাস প্রত্যেকটি ইস্যু দীর্ঘমেয়াদী রোগের অবস্থা প্রভাবিত করে। ভয়, হতাশা, নৈরাশ্য, অসহায়ত্ব দেহের ক্ষতি করে, পক্ষান্তরে সাহস, আনন্দ উচ্ছ্বাস, আশা এবং নিজেকে কন্ট্রোলের ক্ষমতা দেহে প্রশান্তি ছড়িয়ে দেয়।

মিসেস জামানের দিকে আমরা আবার ফিরে তাকাতে পারি। তিনি কষ্টকর ঘটনার কারণে অনিয়ন্ত্রিত হয়ে যাচ্ছেন। তাকে সুস্থ করে তুলতে প্রয়োজন মনোচিকিৎসা, সাইকোথেরাপি।

সার্পেটিভ সাইকোথেরাপি এবং মেরিটালথেরাপি।  এসব থেরাপি মিসেস জামানকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে সাহায্য করবে। মনোচিকিৎসার প্রধান কাজ হচ্ছে তার বর্তমান সমস্যা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং সেটা নিয়ে আলোচনা করা, যুক্তি পরামর্শ আশ্বাস দিয়ে উৎকন্ঠা লাঘব করা।

ইতিবাচক মূল্যায়ণের মাধ্যমেও মিসেস জামান আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। সন্দেহ সত্যি নাও হতে পারে। সত্যি হলে অবশ্যই মনোচিকিৎসা দরকার। আমাদের মনে রাখতে হবেঃ There is no health without mental health

অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল রচিত

মনোসমস্যা মনোবিশ্লেষণ’ নামক

বই থেকে সংকলিত

 


Leave a Reply