ঘুমের সমস্যা ও প্রতিকার

  • 0

ঘুমের সমস্যা ও প্রতিকার

Category : Health Tips

ঘুমের সমস্যা প্রতিকার

ডা. ওয়ানাইজা রহমান

নিদ্রাহীন রাত নিয়ে যতই কাব্য, গান আর রোমান্স থাকুক না কেন, বাস্তব ক্ষেত্রে পরপর কয়েক দিন আখিপাতে ঘুম  না থাকলে আতঙ্ক হয়, শারীরিক, মানসিকভাবে বিধস্ত হয়ে পড়তে হয়। নিজের ওপর আস্থা হারিয়ে যায়। তখন যেকোনভাবে একটু ঘুমই শুধু কাম্য হয়ে ওঠে।

জীবনের এক তৃতীয়াংশরেও বেশি সময় আমরা ঘুমাই। বয়স অনুযায়ী অবশ্য ঘুমের একটা স্বাভাবিক ছন্দ আছে। শিশুরা খুব  বেশি ঘুমায়। বয়সের সাথে সাথে ঘুমের এই সময়সীমা কমে যায়। বৃদ্ধরা স্বাভাবিকভাবেই কম ঘুমান। আসলে শরীরবৃত্তীয় প্রয়োজনের ওপরই নির্ভর করে ঘুমের এই মাপ। তবে খুব কম বা খুব বেশি ঘুম কোনোটাই স্বাভাবিক নয়। চিকিৎসা শাস্ত্র মতে, একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের চার থেকে ৯ ঘন্টা ঘুম স্বাভাবিক এবং ছয় থেকে সাত ঘন্টা হলো আদর্শ। দেখা গেছে , যারা ৯ ঘন্টা বা তারও বেশি ঘুমান, তাদের মধ্যে বিভিন্ন অসুখের প্রবণতা বেশি। সুতারাং বয়স অনুপাতে ঠিক সময় ঘুমই সাস্থ্যের জন্য ভালো।

রিলাক্সেশন কৌশল

বিছানায় যাওয়ার আগে যা আপনার মানসিক ও শারিরীক আবেগ কমাতে সাহায্য করে। উদাহারণ স্বরূপ – শরীরের বিভিন্ন মাসল গ্রুপ পর্যায়ক্রম রিলাক্স এবং টেন্স করা।

নিয়মিত ব্যায়াম আপানাকে রাতে বেশি রিলাক্স  এবং ট্রায়াড বোধ করতে সাহায্য করবে এবং আরামপ্রদ ঘুম হবে। যদি সম্ভব হয় তবে বেশিরভাগ দিনেই কিছু ব্যায়াম করুন। যাহোক, আদর্শভাবে আপনার উচিত অন্তত ৩০ মিনিট মধ্যপন্থী ব্যায়াম সপ্তাহে চার পাচ দিন অনুশীলন করা। যদি আপনার গুরুতর স্থায়ী অনিদ্রা থাকে তাহলে ডাক্তার আপনাকে মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসার জন্য একজন মনোবিজ্ঞানীর কাছে পাঠাতে পারেন। বিভিন্ন ধরনের থেরাপি আছে, যা আপনার মস্তিষ্ককে পুণরায় প্রশিক্ষিত করতে সাহায্য করবে এবং যেভাবে আপনি অনুভব করেন ,  মনে করেন বা আচরণ করেন। গবেষকরা দেখেছেন, একটি Behavioural থেরাপির মাধ্যমে একজন প্রাপ্ত বয়স্ক অনিদ্রাজনিত কারণে আক্রান্ত মানুষের ভালো ঘুমের উন্নতি সম্ভব।

গ. Stimulas Control Theraphy: এটি আপনাকে ঘুমের সাথে বিছানা এবং বেডরুমের পুনঃ নির্ধারণ করতে এবং সঙ্গতিপূর্ণ ঘুম বা জাগরণের প্যাটার্ন পুণরায় স্থাপন করতে সহায়তা করবে।

ঘুমের ওষুধ খাব কি না ?

ঘুমের ট্যাবলেট এড়িয়ে চলাই ভালো। অতীতে ঘুমের ট্যাবলেট সাধারণত প্রেসক্রাইভড করা হতো। তবে কিছু সমস্যা দেখা  দেয়ায় ঘুমের ওষুধগুলো সাধারণত বেশি প্রয়োজন না হলে প্রেসক্রাইভড করা হয় না। ঘুমের ট্যাবলেটগুলোর সম্ভাব্য সমস্যা হলোঃ

১. পরের দিন ঝিমানো। আপানি ড্রাইভিং বা ভারী যন্ত্রপাতি চালানোর জন্য নিরাপদ নন।

২. অনেক সময় বয়স্ক মানুষ ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে ঘুমালে রাতে টয়লেটে যাওয়ার জন্য ঘুম থেকে উঠলে পড়ে গিয়ে কোমরের হাড্ডি ভাঙার ঝুকি থাকে।

৩. ঘুমের বড়ির নির্ভরশীল হয়ে গেলে   একসময় বেশি মাত্রার ঘুমর বড়ি খেয়েও ঘুম হয় না।

৪. অনেকে ঘুমের বড়ির ওপর এমনভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে যে, বড়ি বন্ধ করলে Withdrawal symptom develop করে।

তবে কখনও কখনও ঘুমের বড়ির পরামর্শ দেয়া হয়। মাঝে মাঝে ডাক্তার ঘুমের বড়ি প্রতিদিন না খেয়ে সপ্তাহে দু তিন দিন খাওয়ার জন্য পরামর্শ দিয়ে থাকেন। এভাবে খেলে ঘুমের বড়ির ওপর নির্ভরশীলতা তৈরি হয় না। সর্বশেষে আপনি যদি মনে করেন, অসুস্থতা বা ওষুধটি অনিদ্রার কারণ তাহলে ডাক্তারের পরামর্শ নিন। যেকোনো অর্ন্তনিহিত অবস্থা, যা অনিদ্রার সৃষ্টি করছে তার চিকিৎসা করলে অনিদ্রার উন্নতি হতে পারে। বিশেষ করে বিষণ্নতা ও উদ্বেগ অনিদ্রার সাধারণ কারণ, যা চিকিৎসাযোগ্য।

ইনসমনিয়া আসলে কী ?

ঘুম এবং স্বপ্ন চিরকালই মনো বিজ্ঞানীদের কৌতুহলের বিষয়। বিজ্ঞানীদের মতে, ঘুমের মধ্যে দুই ধরনের দশা থাকে। একটিকে বলা হয় আরইএস’ বা র‌্যাপিড আই মুভমেন্ট দশা’ আরেকটিকে বলা হয় ‘এনআরইএস বা নন র‌্যাপিড আই মুভমেন্ট দশা’। এক ঘুমের মধ্যেই এই দুই টি দশ ঘুরেফিরে চলতে থাকে। আরইএস দশায় শরীরে গরম বেশি লাগে, পালস রেট ও রক্তচাপ বেড়ে যায় এবং এই দশাতেই মানুষ স্বপ্ন দেখে। এটিকে বলা হয় পাতলা ঘুমের স্তর। এনআরইএস দশায় মানুষ গভীরভাবে ঘুমায়। ইনসমনিয়াকে তিনভাগে ভাগ করা হয়েছে ০১. ইনিশিয়াল বা প্রাথমিক ইনসোমনিয়াঃ যাদের ঘুম আসতে দেরি হয় বা অসুবিধে হয়। ০.২ মিডল ইনসমনিয়াঃ যাদের ঘুম বারবার ভেঙে যায় এবং ০৩. টারমিনাল ইনসমনিয়াঃ যাদের ঘুম তাড়াতাড়ি ভেঙে যায়। আর যাদের সব অসুবিধাই আছে, তাদের ক্ষেত্রে বলে গ্লোবাল ইনসমনিয়া।

দিনভর ঘুম ঘুম ভাব, অসুস্থতার লক্ষণ ?

সকাল বেলা অ্যালার্ম বেজেই যায় কিন্তু ঘুম আর কিছুতেই ভাঙতে চায় না মন বলে, পাঁচ মিনিট একটু ঘুমাই, তারপর উঠছি ভোরবেলা বিছানা ছেড়ে উঠতে গেলে, এই ভাবনা ভাবেন সকলেই কিন্তু ধরুণ, তাড়াহুড়ো নেই সকাল ন টায় সময় আপনি অ্যালার্ম দিয়ে রেখেছেন ইতিমধ্যেই সাত আটঘন্টা ঘুমিয়েছেন আপনি কিন্তু তা স্বত্তেও ঘুম থেকে উঠতে ইচ্ছে করছে না জোর করে ঘুম থেকে উঠতে হচ্চে আপনাকে বাড়ির বড়রা  বলতেই পারেন, এটি অলসতার লক্ষণ কিন্তু চিকিৎসকরা বলছেন অন্য কথা তাদের মতে, আপনার শরীরে বাসা বেধে রয়েছে কোনো জটিল রোগ চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় শারীরিক এই অবস্থার নাম ডাইসোনিয়া ক্লিনোম্যানিয়া বলেও পরিচিত।

রোগটি চিকিৎকদের মতে এই উপসর্গ দেখা দিলেও কোনো সময়ই ঘুম সম্পূর্ণ হয় না সাত ঘন্টা ঘুমানোর পরও ক্লান্তিভাব দেখা দিতে পারে। ঘুম থেকে সময় মতো উঠতে পারেন না বলে, উদ্বিগ্নতাতেও ভোগেন এই রোগীরা তার ফলে স্বাভাবিকভাবে বহুবার ঘুম ভেঙে যাওয়ার সমস্যাতেও ভোগেন তারা দীর্ঘদিন ধরে এই সমস্যায় ভোগার ফলে খিটখিটে হয়ে যান অনেকেই চিকিৎসা বিজ্ঞান যথেষ্টে এগোলেও, এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়ার মতো কোনো ওষুধই এখনও পাওয়া যায় না বলেই জানান চিকিৎকরা তবে কিছু নিয়ম মেনে চললে, এই রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব বলেও মত চিকিৎসকদের।

নিয়মগুলি হলো

১. প্রতিদিন  একই সময়ে ঘুমাতে যান ঘুমাতে যাওয়ার আগে গান শুনুন তবে শোওয়ার ঘরে কোনো শব্দ যাতে না ঢোকে সেদিকে খেয়াল রাখুন প্রয়োজনে সব আলোই বন্ধ রাখুন একই সময়ে ঘুম থেকে ওঠারও অভ্যাস করুন।

২. অনেকেই পোষ্য বিড়াল, ‍কুকুরকে নিয়ে রাতে ঘুমাতে যান সেই অভ্যাস থাকলে কিন্তু বাড়তে।

৩. প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে ব্যায়াম করুন যোগাভ্যাসের মাধ্যমে দুশ্চিন্তা মুক্ত হতে পারেন আপনি।

৪. আপনার ডায়েটে কি কফি জাতীয় সামগ্রী রয়েছে ? তবে তা এখনই খাওয়া বন্ধ করুন ভালো ঘুমের জন্য তার পরিবর্তে আপনার ডায়েটে থাক দুধ চা কিংবা গ্রিণ টি।

৫. মধ্যপান থেকে বিরত থাকুন ধুমপানও কিন্তু আপনার রাতের ঘুম কাড়ার জন্য যথেষ্ট তাই এড়িয়ে যাওয়াই ভালো।

ঘুম এবং স্বপ্ন চিরকালই মনো বিজ্ঞানীদের কৌতুহলের বিষয় বিজ্ঞানীদের মতে, ঘুমের মধ্যে দুই ধরনের দশা থাকে একটিকে বলা হয় আরইএসবা ্যাপিড আই মুভমেন্ট দশাআরেকটিকে বলা হয়এনআরইএস বা নন ্যাপিড আই মুভমেন্ট দশা এক ঘুমের মধ্যেই এই দুই টি দশ ঘুরেফিরে চলতে থাকে আরইএস দশায় শরীরে গরম বেশি লাগে, পালস রেট রক্তচাপ বেড়ে যায় এবং এই দশাতেই মানুষ স্বপ্ন দেখে এটিকে বলা হয় পাতলা ঘুমের স্তর

চিকিৎসা

ইনসনিয়া যে কারণে হয়েছে, তার চিকিৎসাই প্রথমে করা হয়। তাছাড়া ইনসনিয়ার জন্য আলাদা করে কিছু বিশেষ ওষুধ দেয়া হয়। কোনো কোনো রোগী অবশ্য শুধু ইনসনিয়ার চিকিৎসাই করাতে চান,  কিন্তু সেক্ষেত্রেও রোগীর কেস হিস্ট্রি নিয়ে বিচার বিবেচনা করতে হয়।

ইনসমনিয়ার রোগীর চেহারায় একটা অবসাদ, ক্লান্তিভাবে আসে। অনেক সময় রোগী নিজেই ঘুমের ওষুধ নিয়ে থাকেন। এর ফলাফল ভয়াবহ হতে পারে। নিচের নিয়মগুলো মেনে চললে উপকার পেতে পারেনঃ

  • বিছানার শুধু ঘুমের জন্যই নির্দিষ্ট রাখুন। বিছানায় বসে টিভি দেখা, আড্ডা দেওয়া, খাবার খাওয়া বন্ধ করুন।
  • খালি পেটে কখনও শুতে যাবেন না। তবে রাতে গুরুভোজ করবেন না। বেশি ভরা পেটে শুতে যাওয়াও ঠিক নয়। আবার খেয়েই সাথে সাথে শুয়ে পড়াও অনুচিত। খাওয়া ও শোয়ার মধ্যে সময়ের ব্যবধান রাখুন।
  • শোয়ার আগে এক গ্লাস দুধ খেতে পারেন। দুধে থাকে, ট্রিপটোফ্যান, যা আপনাকে ঘুমাতে সাহয্য করবে।
  • নিয়মিত গোসল করবেন এবং শুতে যাওয়ার আগে ঘাড়ে, মুখে ও পায়ে পানি দিয়ে মুছে নিতে পারেন।
  • ঘুমাতে যাওয়ার সময় সারদিনের ক্লান্তি, বিপর্যয় বা উত্তেজনার কারণগুলা নিয়ে চিন্তা করবেন না।
  • খুব বেশি উত্তেজিত হয়ে বিছানায় যাবেন না।
  • ঘুমের আগে কোনো ভারী কাজ বা অত্যাধিক মাথার কাজ করা থেকে ‍বিরত থাকুন।
  • প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়ার চেষ্টা করুন।
  • দুপুরের ঘুম আপনার শুধু কর্মক্ষতাই কমায় না, আপনার রাতের ঘুমও নষ্ট করে। অতএব, এটি বাদ দিন।
  • ঘুমাতে যাওয়ার আগে সিগারেট, তামাক, চা, কফি না খাওয়াই ভালো।
  • দু এক দিন ঘুম না হলেই দুশ্চিন্তা গ্রস্থ হবেন না। তবে নিয়মিত না হলে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

 

লেখিকাঃ অধ্যাপিকা

ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ, ঢাকা।

 

 


Leave a Reply