চিকিৎসক সৃষ্ট হৃদরোগ

  • 0

চিকিৎসক সৃষ্ট হৃদরোগ

Category : Health Tips

চিকিৎসক সৃষ্ট হৃদরোগ

অধ্যাপক নুরুল ইসলাম

হৃদরোগের অন্যান্য অনেক  কারণের মধ্যে চিকিৎসক কর্র্তক সৃষ্ট হৃদরোগ অন্যতম। উন্নত দেশগুলোতে এটা প্রায়শই দেখা গেলেও আমাদের দেশে এর চরিত্রটা ভিন্নতর, যা গোটা দেশের সামগ্রিক অবয়বটির সাথে সংযুক্ত। বাংলাদেশে শিক্ষিতের হার শতকরা বাইশ এবং সারাদেশে চিকিৎসকের সংখ্যা কিঞ্চিতধিক দশ হাজার। এদেশে শতকরা ৮৫ জন লোক বাস করে গ্রামাঞ্চলে, কিন্তু শতকরা ৯৫ জন চিকিৎসক নিযুক্ত রয়েছেন শহরাঞ্চলে। কাজেই ব্যাপকসংখ্যাক নিরক্ষর মানুষের জন্য মাথাপিছু চিকিৎসকের সংখ্যা অনেক কম থাকাতে জনসাধারনের জন্যে চিকিৎসা সুবিধাদি অত্যন্ত অপর্যাপ্ত। এবারে দেখা যাক, এই আর্থ সামাজিক কাঠামোতে চিকিৎসক কর্তক কিভাবে হৃদরোগ সৃষ্টি হয়। অবশ্য এই প্রেক্ষিতটাই নয়, অন্যান্য কারণেও শিক্ষিত রোগীও শিক্ষিত ডাক্তারের পেশাগত অদক্ষতার কারণে হৃদরোগের শিকার হয়ে থাকেন।

জনগণের নিরক্ষতার সুযোগ নিয়ে কিছু বিশেষ শ্রেণীর  লোক চিকিৎসক সেজে গ্রামঞ্চলের প্রাকটিস করে যাচ্ছে এবং গ্রামাঞ্চরে লোকজনও উপায়ন্তর না দেখে স্বাভাবিক কারণেই এসব অজ্ঞ, দৃঢ় প্রকৃতির তথাকথিত চিকিৎসকদের শরণাপন্ন হচ্ছেন। ঐসব চিকিৎসকদের কাছে পেটের ব্যথা মানেই গ্যাস্ট্রিক’ বুকের ব্যথা মানেই ‘হৃদরোগ’ (হার্টি উইক) এবং গিটে ব্যথা মানেই ‘রিউম্যাটিজম’। নামের আগে স্বেচ্ছায় ডাঃ শব্দটা লাগিয়ে ভাড় সাজা ছাড়া এদের করণীয় আর কিছুই নেই: স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানের প্রশিক্ষণ তো নয়ই, অন্য কোনো  প্রকারের পেশাগত যোগ্যতাও এদের নেই। ধরুন, এরকই একজন চিকিৎসকের কাছে কেউ এসেছেন বুকের আশেপাশে কোনো ব্যথা নিয়ে বাস, তড়িঘড়ি করে পরীক্ষা করে ডাক্তার সাহেব বলে দিলেন যে রোগীর হার্ট খারাপ বা ঐ রকমই একটা কিছু। শুধু তাই নয়, খারাপ হার্টের জন্য ডাক্তার সাহেব ব্যবস্থাও দিয়ে দিলেন। আর যায় কোথায়, রোগী ধরেই নিলেন যে তার হার্ট অসুস্থ বা উইক’, যদিও বাস্তবে তার হয়তো দেহে কোনো রোগই নেই। এভাবেই একটা সুস্থ স্বাভাবিক হৃৎপিন্ড পরিণত হয় একটা মনোবিকলন রোগের আধারে (কার্ডিয়াক সাইকোটিক)। তারপরে যদি কখনো সুযোগ হয় শহরের ডাক্তারের কাছে আসার, সেই ডাক্তারটি প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করে রোগ নির্ণয় করতে পারলে রোগী ভালো হয়ে যায়; কিন্তু কোনো রোগের সন্ধান না পেয়ে যদি সেই ডাক্তার হার্ট দুর্বলতা বা ঐ রকমই কিছু বলে থাকেন, রোগীর অবস্থাটা আরো খারাপ হতে থাকে তার সুস্থ হৃৎপিন্ডটা বিনা কারণেই অসুস্থ হয়ে পড়ে। কাজেই দেখা যাচ্ছে, গ্রামের অজ্ঞ ডাক্তারই শুধু নয়, শহরের বিজ্ঞ ডাক্তারও হৃদরোগের সৃষ্টি করতে পারেন। আমরা এবারে তা নিয়েই আলোচনা করবে।

নিম্ন রক্তচাপ

আমাদের দেশে একটা সাধারণ ধারণা প্রচলিত আছে যে, সহজেই কোনো কাজে ক্লান্তি এসে যাওয়া মানেই হচ্ছে ‘লো প্রেসার’। দুশ্চিন্তা বা আবেগের ভারসাম্যহীনতার কথা ভুলে গিয়ে রোগী লো প্রেসারের কথাই মনে গেথে নেন। তারপর সেই ‘রোগী’ ডাক্তারের কাছে এলে ডাক্তার যদি রক্ত চাপ মেপে কিছুটা কম রক্তচাপ রেকর্ড করেন (এমনিতেই মনোদৈহিক কারণে, কোনো রোগের জন্য নয়) এবং রোগীকে বলেন ‘লো’ প্রেসারের কথা, তাহলে এই ভ্রান্ত ধারণা আরো পাকা পোক্ত হয়ে যায় রোগীর মনে। রোগী ডাক্তারের কাছে ওষুধ চাইলে ডাক্তার তাকে ভিটামিন, টনিক, ভালো ভালো খাবার গ্রহণের উপদেশ দিয়ে থাকেন। রোগীও সেই অনুযায়ী সর্বস্ব খুইয়ে এই উপদেশ মেনে চলেন, কিন্তু সেই অল্পতে ক্লান্তি পাওয়া আর যেতে চায়না। উপরন্তু রোগী যদি ইতিপূর্বেই কিছুটা মেদবহুল হয়ে থাকেন, তিনি তার দেহে অতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয় কিছু ওজনই বাড়াতে পারেন মাত্র। সত্যি সত্যি রোগীর নিম্নচাপ আছে কিনা বা থাকলে তার নেপথ্য কারণটাই বা কি, তার পরীক্ষা ও রোগানুসন্ধানের মাধ্যমে নির্ণয় করে নিয়ে সেই নেপথ্য কারণটাকেই সারানো প্রয়োজন। কোনো নেপথ্য কারণ ছাড়া কেবলমাত্র মনোদৈহিক কারণে রক্তচাপ কিছুটা কম থাকলে ডাক্তার বা রোগী কারুর জন্যই কোনো রকম উদ্বেগের কারণ নেই। অথচ ভুল ডায়াগনোসিস এই উদ্বেগকে ডেকে আনতে সাহায্য করে।

 

উচ্চ রক্তচাপ

নিম্ন রক্তচাপের মতই ভূল উপায়ে রিডিং নিয়ে ভুল করে ডায়াগনোসিস করা হয়ে থাকে উচ্চ রক্তচাপের। কেবলমাত্র একবার রক্তচাপ মাপার যন্ত্রে মাপলেই রক্তচাপ নির্নয় করা যায় না। এর জন্য পুনঃ পুনঃ রক্তচাপ মাপার দরকার হয় এবং রোগীর বয়স ও সেই অনুপাতে স্বাভাবিক রক্তচাপ সর্ম্পকে নির্ভুল জ্ঞান থাকা প্রয়োজন হয় (পঞ্চাশ বছরের নিচের লোকদের জন্য ডায়াস্টোলিক প্রেসার স্থায়ীভাবে ৯০ এর উপর এবং পঞ্চাশোর্ধ লোকের জন্য ১০০ এর উপরে থাকলে রক্ত চাপ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বলে ধরা যাবে)। এভাবে যথাযথ পরিমাপণ এবং রোগীর বয়স ও স্বাভাবিক রক্তচাপের স্বাভাবিক সম্পর্ক না জেনে উচ্চ রক্তচাপ ডায়াগনোসিস করলে রোগীকে দুশ্চিনাতাগ্রস্থ করে দিলে স্বাভাবিক রক্তচাপ রক্তচাপে পরিণত হবে। শুধু তাই নয়, সেই সঙ্গে রক্তচাপ কমানোর ব্যবস্থাও যদি দেয়া হয় তাতে রোগীর স্ট্রোক হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে।

বুকে ব্যথা

হৃৎপিন্ডের রক্ত সঞ্চালনে গোলমাল দেখা দিলে বুকে ব্যথা হয় এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিভাষায় একে  এ্যানাজাইনা বলে। এই এ্যানাইজাইনার ব্যথার চরিত্র, দৈহিক পরিশ্রমের সঙ্গে এর উর্ধগতি এবং বিশ্রামে ব্যথা সেরে যাওয়া এসব বিশেষ বৈশিষ্ট্য দিয়ে এ্যানজাইনার ব্যথা ডায়াগনোসিস করা হয়। কিন্তু অন্য কোনো কারণে বুকে ব্যথা হলে এই ব্যথার বৈশিষ্ট্য হবে আরেক রকম। কাজেই হৃৎপিন্ড ছাড়া অন্য কোনো কারণে বুকে ব্যথা হলে (যেমন ঘাড়ের মেরুদন্ডের রোগ বা পেট থেকে পাকস্থলী বুকের উঠে যাওয়া ইত্যাদি) ডাক্তারকে সঠিকভাবে ব্যথার কারণ খুজে বের করতে হবে। তা না করে যদি অশুদ্ধভাবে রোগীকে (যদিও আসল কারণ অন্যত্র) তাহলে রোগী তাই ধরে নিয়ে ভ্রান্তভাবে ভাবতে শুরু করবে যে পরিশ্রমে তার ব্যথা হয়, বিশ্রামে ব্যথা সেরে যায়। এভাবে রোগী সত্যি সত্যিই এ্যানজাইনায় আক্রান্ত হয়ে যেতে পারে দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হয়ে

ইসিজি

ইসিজি ইলেক্ট্রোকার্ডিওগ্রাম (সংক্ষেপে ইসিজি) নামক যন্ত্রের সাহায্যে হৃৎপিন্ডের অনেক রোগ নির্ণয় করা যায় অতি সহজে, কিন্তু এই যন্ত্রের অপব্যবহারও হয় প্রচুর। কারণ, যন্ত্র ও যন্ত্রী উভয়েরই সমান পারদর্শিতার প্রয়োজন হয় অতীব মূল্যবান এই যন্ত্রের সঠিক ব্যবহারে। শুধু তাই নয়, ইসিজিতে রেকর্ডিংয়ের নির্ভুল ব্যাখা করার জন্যেও প্রয়োজন যথাযথ তত্বীয় ধারনার যার উপরে সম্পূর্ণবাবে নির্ভর করে নির্ভূলভাবে হৃদরোগ নির্ণয়। খোদ ঢাকা শহরেই রয়েছে বেশ কিছু পুরনো, জরাজীর্ণ ইসিজি মেশিন এবং তাতে ভূল রেকর্ডিং হয়ে থাকে প্রায়ই। সেই সঙ্গে কার্ডিওলোজিষ্টের ‘হতে পারে’ হয়তো এ ধরনের শব্দ ব্যবহার রোগ নির্ণয়ে মারাত্মক অসুবিধার সৃষ্টি করে থাকে। ফলে অনেক সুস্থ মানুষকেও রোগী সাজতে হয়, আবার অনেক রোগীকেও রোগ নির্ণয় করে ব্যবস্থা নেয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে।

পরিশেষে বলবো যে, রোগীর প্রতি ডাক্তারের মনোভাব, ডাক্তারের শব্দোচ্চরণ, ডাক্তারের কর্তব্য জ্ঞানই নির্ধারণ করে ডাক্তার রোগীর সম্পর্ক। এটাই যদি ঠিকমতো কাজ না করে তবেই সৃষ্টি হয় এ সমস্ত চিকিৎসক সৃষ্ট ব্যাধির, যা সহজেই প্রতিরোধ করা যায়, নিয়ন্ত্রণ করা যায়। দায় দায়িত্ব সর্ম্পকে ডাক্তারের সচেতনতা, পরিপূর্ণ পেশাগত দক্ষতা এবং প্রশাসনিক সুব্যবস্থা চিকিৎসক সৃষ্ট হৃদরোগ প্রতিরোধ সক্ষম।

 


Leave a Reply