জন্ডিসের কথা

  • 0

জন্ডিসের কথা

Category : Health Tips

জন্ডিসের কথা

জাকির আজাদ

জন্ডিস অতি পরিচিত একটি ব্যাধি। চালিত কথায় এ ব্যাধিকে বলা হয় কমলা, নাভা বা হলদে রোগ। এই রোগ দেখা দিলে বুকের পাজর বেরিয়ে শরীর শুকিয়ে যায়। চোখ ও গায়ের রঙ হলদে হয়ে যায়। এমনকি প্রস্রাবও হলুদগোলা পানি।

দেহের পিত্তথলীর বিভিন্ন উপাদানে তৈরি তার মধ্যে বিলিরুবিন একটি। যার রঙে হলদে। কোন কারণে রক্তে বিলিরুবিন বা পিত্তের আধিক্য হলে জন্ডিস দেখা দেয়।

পিত্ত কণিকা অতিরিক্ত মাত্রায় রক্তে সঞ্চিত হলে, সেগুলো ডিফিউসন পদ্ধতিতে চামড়া বা চোখের কনজাংকটাইভাতে গিয়ে সঞ্চিত হয়। এর ফলেই চামড়া বা চোখের রং হলদে হয়ে যায়। শুধু গায়ের রং ই নয়: প্রসাবেও গাঢ় হলুদ বর্ণ ধারণ করে। এই প্রশ্নের উদয় হওয়া স্বাভাবিক পিত্ত কণিকা বেশিমাত্রায় রক্তে আসে কেন? তার কারণ সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে বড় নালা তৈরি করে এবং সর্বশেষে বাম এবং দক্ষিণ হিপাটিক ডাররূপে যকৃৎ থেকে বেরিয়ে আবার পরস্পর সংযুক্ত হয়। এবারে এর নাম হয় ‘কমন হিপাটিক ডাক্ট। এটি ডিউডেনামে প্রবেশ করে। মজার ব্যাপার এই যে, যকৃতে সর্বদাই পিত্ত তৈরি হচ্ছে, অথচ সব সময়ে ডিউডেনামে পিত্তরস প্রবেশ করে না। কমন বাইল ডাক্ট থেকে সিস্টিক ডাক্ট’ নামে আর একটি নালী গলব্লাডার বা পিত্তথলিতে প্রবেশ করে। গলরাডার হচ্ছে পিত্ত সংরক্ষনের কেন্দ্র। প্রয়োজন অনুসারে পাতাভ সবুজ রঙের এই পদার্থটিকে অন্ত্রে প্রবেশ করায়্।

পিত্তাধিক্যের জন্যে যখন রোগ হয়, তখন অনেকেরই মনে হওয়া স্বাভাবিক পিত্তকনিকার প্রয়োজন কি ? দেহভ্যান্তরে থেকে যদি পিত্তথলি উপড়ে ফেলা যায়, তা হলে অনেক রোগের হাত থেকে রেহাই পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু পিত্তকনিকা অকেজো তো নয়ই, বরং জীবনধারনের পক্ষে অতি প্রয়োজনীয়। এর স্বাদ তিক্ত। এতে আছে সোডিয়াম, পটাশিয়াম,  ক্যালসিয়াম ক্লোরাইড, কার্বনেট ফসফেট, লবণ, সোডিয়াম টরকোলেটে, সোডিয়াম গ্লাইকোকোলেট দেখা যাচ্ছে পিত্তরসে কোন এনজাইম নেই, যার সাহায্যে খাদ্য পরিপাক হয়। অথচ খাদ্য পরিপাকের জন্য এর প্রয়োজন অপরিসীম। এছাড়া মানুষ বাচাতে পারে না।

চর্বিজাতীয় খাদ্য পরিপাকে কিয়দংশ আমিষ এবং শ্বেতসার  জাতীয় খাদ্য পরিপাকেও পিত্তরসের খুবই প্রয়োজনীয়। অস্ত্রে প্রবেশ করবার পর পিত্তরস অন্ত্রের পেরিস্টলটিক মুভমেন্টের সহায়তা করে। এক কথায় অন্ত্রাশয়ের সুস্থ এবং স্বাভাবিক ক্রিয়া বজায় রাখবার জন্য পিত্তরসের প্রয়োজনীয়তা যথেষ্ট। দেহাভ্যন্তরস্থ জীবাণু ধ্বংস করতেও পিত্তরসের সাহায্য প্রয়োজন। আধুনিক কালের বিজ্ঞানীরা বলেন যে, হিমোগ্লোবিন তৈরির সময় অন্যতম সহায়ক হচ্ছে পিত্তকনিকা। এস্থলে পিত্তকণিকার জন্মবৃত্তান্ত এবং পরিণতি একটি ছকের সাহায্যে দেখানো হলোঃ

যকৃত যখন অসুস্থ হয় তখন ইউরোবিলিনোজেন অধিক পরিমাণে অন্ত্রে সঞ্চিত হয়। তার ফলে প্রস্রাবে রোবিলিনোজেন এবং   ইউরোবিলিনের আধিক্য ঘটে। প্র্রস্রাবের রং হয়ে যায় গাঢ় হলুদ। আমরা তখন বুঝতে পারি, যকৃত স্বাভাবিকবাবে কাজ করছে না।

জন্ডিস মূলতঃ যকৃত  ও পিন্ড সংক্রান্ত ব্যাধি। জন্ডিসকে মোটামুটি পাচ ভাগে ভাগ করা হয়েছে।

১। হিমোলাইট্রিক জন্ডিস

২। টক্সিক এন্ড ইনফেকটিভ জন্ডিস

৩। অবস্ট্রকটিভ জন্ডিস

৪। লেটেন্ট জন্ডিস

৫। ক্রনিক ইন্টারমিন্টেট জুভেনাইল জন্ডিস।

১। হিমোলাইটিক ধরনের জন্ডিস লোহিত কনিকাগুলো ক্রমশঃই ভেঙ্গে যেতে থাকে। এর ফল ভগ্ন যেতে থাকে। এর ফলে ভগ্ন হিমোগ্লোবিন থেকে অতিরিক্ত পরিমাণে বিলিরুবিন রক্তে নির্গত হয়। অতিরিক্ত পরিমাণে সঞ্চিত হলে পিত্তকণিকা দেহের সর্বত্র কম করতে পারে না। মুত্রে, চামড়ার নীচে এবং চোখে পিত্তকণিকার প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।

২। এই ধরনের জন্ডিসরোগ সচারাচর হয়ে থাকে। যকৃতের কোষ কোন কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হলে অথবা কোন জীবাণুর আক্রমণ যকৃত অকেজো হয়ে পড়লে যকৃতের পক্ষে রক্ত থেকে পিত্তকণিকাগুলোকে বাইল ক্যাপিলারিতে প্রেরণ করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। কাজেই বেশ কিছু পরিমাণ পিত্তকণিকা রক্তে থেকে যায়। এর ফলে দেহ, চোখ এবং প্রস্রাব হলদে হয়ে যায়।

৩। পিত্তথলীতে পাথুরী হলে ডিওডেনাম থেকে গোল কৃমি কোন প্রকারে কমন বাইল ডাক্টে প্রবেশ করলে , পিত্তনালীর পথ অবরুদ্ধ হলে, যকৃত বা পাকস্থলীতে কারসিনোমা (কর্কট রোগ) হলে এই শ্রেণীর জন্ডিসের  সৃষ্টি হয়। জন্মগত সিফিলিস রোগ থাকলেও এই রোগ হতে পারে।

৪। Pernicious anemia নামে এক অতি মারাত্মক ধরনের রক্তের রোগে অথবা যকৃতে টিউবারকিউলোসিস বা অন্য কোন শক্ত রোগ হলে এই ধরনের জন্ডিস রোগ হতে পারে।

৫। এই ধরনের জন্ডিস রোগের তেমন কোন সঙ্গত কারণ জানা যায়নি। বংশপরম্পরায় এই রোগ হতে পারে। তবে দেখা গেছে, মদ্যপান, অনিদ্রা, অতিরিক্ত পরিশ্রম এবং মানসিক দুশ্চিন্তার ফলে এই ধরনের রোগ উৎপন্ন হয়ে থাকে।

জন্ডিস রোগ স্ত্রী পুরুষ উভয়ের যেকোন বয়সে হতে পারে। সদ্যেজাত শিশুর হিমোলাইটকি ধরনের জন্ডিস রোগ হবার খুব সম্ভাবনা থাকে বলে জানা যায়। হিমোলাইটিক জন্ডিস রোগে গায়ের রং কমলালেবুর রঙের মত হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে সব সময়ে চোখ হলদে নাও হতে পারে। চামড়ার উপরে লাল ছোপ দেখা যায়। দেহাভ্যন্তরে রক্তক্ষরণের ফলে এরূপ হয়ে থাকে। এই অবস্থাকে বলা হয় পারপিউরা। নাক, মাড়ি ও দাত দিয়ে রক্ত পড়ে। যকৃত ব্যথা হয়। আক্রান্ত ব্যক্তি বিছানা ছেড়ে উঠতে পারে না।

জন্ডিস রোগ থেকে অতি সহজেই মৃত্যু ঘটতে পারে এ কথা সবারই মনে রাখা উচিত, কারণ যকৃত এবং পিত্তথলি মানুষের পক্ষে অতি প্রয়োজনীয়। হাত পা নষ্ট হলে মানুষ মরে না, কিন্তু যকৃত না থাকলে বা গুরুত্বররূপে অসুস্থ হলে মানুষের পক্ষে বাচা কঠিন।

কিন্তু দেখা যায়, দৈব চিকিৎসার মাধ্যমে জন্ডিস ভালো হওয়ার প্রচেষ্টায় অনেকে লিপ্ত হন। এর মধ্যে একটি মালা পরা। মালাটি গলায় পরিধান করতে হয় এবং জন্ডিস কমার সাথে সাথে নাকি মালাটিও বাড়তে তাকে। এ রোগ নিয়ে আমাদের দেশে কিভাবে কুসংস্কার চলে। অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চিকিৎ]সা করে কত লোককে যে অকাল মৃত্যুর দিকে ঠেলে নিচ্ছে তার কোন ইয়ত্তা নেই। সময়ে চিকিৎসকের স্মরণাপন্ন হলে অনেক রোগ অল্পতেই ভালো হয়ে যায়। একথা আমাদের দেশে অনেক শিক্ষিত ব্যাক্তিরাও বুঝে উঠতে চান না।


Leave a Reply