ডায়রিয়া ও তার প্রতিকার

  • 0

ডায়রিয়া ও তার প্রতিকার

Category : Health Tips

ডায়রিয়া ও তার প্রতিকার

স্বাস্থ্য সকল সুখের মুল, এই বাক্যটি শুধু ব্যক্তির ক্ষেত্রে নয় বরং ব্যাক্তি ও জাতি সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। একটি মানুস তার পাচটি মৌলিক অধিকারের মধে সুচিকিৎসা প্রাপ্তি তার অন্যতম জন্মগত অধিকার।

আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যত এবং আজকের শিশুই ভবিষ্যতে  এ দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হবে এ আশা সবাই করে। অর্থ্যাৎ আজকের শিশু আগামী দিনের দেশ ও দশের অবলম্বন। আজ জন্ম নেয়া শিশুটি পূর্ণ মাত্রায় বিকশিত না হতে পারলে অকালেই ঝরে যেতে হয়। উন্নত দেশের তুলনায় হার তুলনামুলকভাবে অনেক বেশি। একটি তথ্যে জানা যায়, অনুন্নত দেশে অধিক হারে শিশু মৃত্যুর অন্যতম কারণ হচ্ছে উদারময় বা ডায়রিয়া। ডায়রিয়া রোগের প্রাদুর্ভাব এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। তথ্যমতে, জানা যায়, আগে বছরে একটি নির্দিস্ট সময় উদারময় বা ডায়রিয়া রোগের সৃষ্টি হতো আর এখন বছরের প্রায় তসব সময়ই ডায়রিয়া রোগে আক্রান্ত রোগীর সংবাদ প্রায়ঃশই দেখা যায়। দেশে ঘূণিঝড়, বন্যা, খরা এইসব মৌসুমি সময় ছাড়াও সারা বছরেই লেগে আছে উদারময় রোগের দাপট। ডায়রিয়া বা উদারময় রোগের সৃষ্টি এবং এর প্রতিকার সম্পর্কে দেশের প্রায় সকল গণমাধ্যমে বিশেষভাবে প্রচার হয়ে আসলেও দুর্ভাগা জাতির সচেতনতা যে তেমন বৃদ্ধি পায়নি বা আজও যে,  ডায়রিয়ায় আকা্রন্ত রোগী মরার খবর সংবাদ মাধ্যমগুলোতে ছাপা হচ্ছে তাই প্রমাণ করে। এ যাবত গৃহীত ডায়রিয়া প্রতিরোধ ব্যবস্থা রোগের আক্রান্ত ক্ষমতার চেয়ে ‍বহু ‍গুণ দুর্বল বা অপরিপক্ব বললে তা মিথ্যে হবে না। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় বছরে সারাবিশ্বে প্রায় ৫শ মিলিয়ন লোক এই উদারময় রোগে আক্রান্ত হচ্ছে এবং এদের অধিকাংশই হচ্ছে তৃতীয় বিশ্বের অনুন্নত দেশগুলোতে। উদারময় রোগ শুধু মানুষের অকাল মৃত্যুর কারণই নয় বরং অনেক ক্ষেত্রে অপুষ্টির কারণ ও বটে। এ হিসাব এ পর্যন্ত উদারময় বা ডায়রিয়া রোগে আক্রান্ত রোগীর গড়ে শতকরা তিনজন মারা যায়। বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে আড়াই লাখ শিশু উদারময় সংক্রমণজনিত কারণে পানিশুণ্যতা ও অপুষ্টিতে মারা যায়। পক্ষান্তরে গণসচেতন হলেই এই রোগ হতে অতি সহজেই পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব। উদারময় রোগ চিকিৎসার চেয়ে সচেতন বা প্রতিরোধে অনেকাংশে এ হতে কাটিয়ে উঠা সম্ভব।

ডায়রিয়া রোগী মৃতু্যর কারণ পাতলা পায়খানা বা বমি নয় বরং পানিশূণ্যতা ও পাণিশূণ্যতা হতেই উদ্ভব হয় রোগীর অবনতির কারণ।

পানি সরাসরি শরীরে কোন শক্তি বৃদ্ধি করে না অথবা এ হতে কোন ক্যালরি উৎপত্তির সৃষ্টি হয় না তবুও পানি না হলে মানুষ বাচতে পারে না এবং এই কারণেই পানির অপর নাম জীবন। চিকিৎসা বৈজ্ঞানিক তথ্য সুত্র মতে একজন সুস্থ পূর্ণাঙ্গ মানুষ দৈনিক ৩৩শ সিসি পানি পান করে থাকে।

স্বাভাবিকভাবে বলতে গেলে একটি পানি ভর্তি কলসি ফুটো হলে যেমন পানি বেরিয়ে যায় একইভাবে পাতলা পায়খানা হলেই মানুষের শরীল হতে লবণ ও পানি বেরিয়ে যায়। পাতলা পায়খানা ও দুধ পায়খান ডায়রিয়ায়, কলেরা রোগের প্রাথমিক আলামত। একত্রে একাধিকবার পাতলা পায়খানা হতে থাকলে বমি, অরুচি, পেট ফাপা, হাতে পায়ে খিচুনিসহ নানা অস্বস্তিকর অবস্থার সৃষ্টি হয়। ঠিক তখনই আরম্ভ হওয়া পাতলা পায়খানা ডায়রিয়া বা উদারময় রোগের রূপ নেয়। এই রোগে আক্রান্ত হলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রোগী অল্প সময়ের মধ্যে মারা যায়। কারো পাতলা পায়খানা আরম্ভ হলেই বিন্দুমাত্র অবহেলা না করে সময়মত ব্যবস্থা নিয়ে ডায়রিয়ার হাত হতে রোগীকে বাচাতে হবে। ডায়রিয়া বা পাতলা পায়খানার চিকিৎসা হচ্ছে রোগীর শরীর হতে যে পরিমাণ লবণ ও পানি বেরিয়ে যায় তা তাৎক্ষনিকভাবে কোন না প্রকারে পূরণ করতে হবে। একজন রোগী শরীরে দুভাবে ক্ষয় যাওয়া পানি ঢুকানো যায় প্রথমঃ স্যালাইন ইনজেকশন দিয়ে দ্বিতীয়তঃ আক্রান্ত রোগীকে সরাসরি পানিতে মিশিয়ে স্যালাইন খাইয়ে। মানুষের যখন বার বার পাতলা পায়খানা হয় তখন ঐ রোগী মলের সাথে প্রচুর পরিমাণ পানি সোডিয়াম ফ্লোরাইড ও অত্যাবশ্যকীয় পটাশিয়াম বের হয়ে যায়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের গবেষণা প্রমাণিত হয়েছে বিশেষ পরিমাণে ঘণত্বে গ্লুকোজ থাকলে সোডিয়াম ও পটাশিয়াম রুক্ত মিশে শরীরের শক্তি যোগাতে সাহায্য করে।

একজন মানুষের গ্লুকোজের ঘনত্বের ত্রুটি দেখা দিলেই বা হেরফের গ্রহণ ক্ষমতার পার্থক্য ঘটায়। এর ফলেই শতকরা ৮০ ভাগ ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগীয় ক্ষেত্রে “লবণ পানির মিশ্রিত সরবত” প্রয়োগ করে বা খাইয়ে  এই রোগ প্রতিরোধ সম্ভব হচ্ছে। সেহেতু আমাদের মত গরীব দেশে যোগাযোগ অপ্রতুলতায় প্রায় গ্রামেগঞ্জে তাৎক্ষনিককভাবে স্যালাইন ইনজেকশন পাওয়া যায় না। তা ব্যবহারের জন্য ডাক্তার পাওয়া যায় না। তা ব্যবহারের জন্য ডাক্তার পাওয়া যায় না এবং যেহেতু এদেশের অধিকাংশ লোক দারিদ্র্য সীমার নীচে জীবন যাপন করে সবচেয়ে বড় কথা ইনজেকশন স্যালাইন ব্যয়বহুল তাই “ওরাল স্যালাইন এই রোগের একমাত্র ওষুধ। অত্যন্ত কম খরচে এবং অতি সহজেই যেকোন স্থানে, যেকোন জায়গায় যেকোন পরিবেশে লবণ, গুড় ও পানি দিয়ে স্যালাইন বানানো সম্ভব। কম খরচে ধনী দরিদ্র সকলের জন্য সহজ পদ্ধতি তৈরি খাওয়ার স্যালাইন বানাতে বা খাওয়াতে কোন ডাক্তারের প্রয়োজন হয় না,  ফলে বর্তমানে গ্রামেগঞ্জে ডায়রিয়া প্রতিরোধের প্রাথমিক এবং গ্রহণযোগ্য পদক্ষেপ হিসেবে খাওয়ার স্যালাইন ব্যবহার বেড়েছে ব্যাপকভাবে। খাবার স্যালাইন বানানোর পদ্ধতিরঃ যেকোন কেউ ঘরে বসে আধাসের বিশুদ্ধ আধাসের (চাপকলের পানি) পানিতে তিন আঙ্গুলের এক চিমটি লবণ ও একমুঠো গুড় ভালভাবে মিশাতে হবে। স্যালাইন তৈরির সময় লবণ, গুড় ও পানির পরিমাণ কোনটা কমবেশি যাতে না সে দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। স্থান কাল বিশেষে যদি কলের পানি পাওয়া না যায় তাহলে প্রথমে পানি ফুটিয়ে নিতে হবে তার পর ঠান্ডা পানিতে এই স্যালাইন তৈরি করতে হবে।

একজন রোগীর পাতলা পায়খানার শুরু হলেই পায়খানা শুরুর প্রথম দিক হতেই ঐ রোগীকে স্যালাইন খাওয়ানো আরম্ভ করতে হবে। দু হতে তিনবার পাতলা পায়খানার পর রোগীকে বানানো স্যালাইন খাইয়ে দিলেই রোগীর শরীর হতে বেরিয়ে যাওয়া লবণ ও পানির ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হতে পারে। অবস্থার শোচনীয়তার ওপর নির্ভর ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগীকে স্যালাইন ইনজেকশন প্রয়োগ করতে হবে। একজন পূর্ণবয়স্ক লোককে অবশ্যই আধা সের পরিমাণ স্যালইন খাওয়াতে হবে আবার শিশু হতে আরম্ভ করে বিভিনন্ বয়সের বাচ্চাদের বেলায় তাদের চাহিদা অনুযায়ী অর্থ্যাৎ ঐ বাচ্চা যতটুকু খেতে চায় তাকে ততটুকু দিতে হবে। মনে রাখা অবশ্যক যে বাচ্চাদের বেলায় ঘন ঘন স্যালাইন খেতে দিতে হবে বা খেতে বাধ্য করতে হবে। অন্ততঃ বাচ্চাদের বেলায় স্যালাইন শেষ হয়ে খেলে তা পুনঃ বানিয়ে নিতে হবে। ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগীকে খাওয়ার স্যালাইনের পাশাপাশি রোগীকে স্বাভাবিক সব খাবার যেমন ভাত, মাছ, ডাল,  সব্জি ও দুধ এস খাওয়ার দিতে হবে। রোগী যদি দুধের বাচ্চা হয় তাকে তার মায়ের দুধ অবশ্যই খেতে দিতে হবে, কোন অবস্থায় শিশুকে তার মায়ের দুধ হতে বঞ্চিত করা যাবে না। ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগী বা সচেতন মহলকে বিশেষভাবে স্মরণ রাখতে হবে যে কোন ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগী যদি ২৪ ঘন্টায় ও পানি শুণ্যতার কোন উন্নতি না হয় অর্থ্যাৎ তিন দিন বা ৭২ ঘন্টায় ও পাতলা পায়খানা বন্ধ না হয় তবে ঐ রাগীকে যেকোন কিছুর বিনিময়ে যেমনভাবেই হোক নিকটস্থ হাসপাতাল, স্বাস্থ্য কেন্দ্র বা ক্লিনিকে নিতেই হবে।

একজন ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগীকে রোগ হতে মুক্তি পাওয়ার পর অর্থ্যাৎ সুস্থ হওয়ার পর কমপক্ষে সাত দিন ঐ আক্রান্ত রোগীকে বেশি পরিমাণে পানি ও সুসাধু (ভিটামিনযুক্ত) খাওয়ার দিতে হবে। এতে ডায়রিয়া রোগমুক্ত রোগী তার হারানো পুষ্টি  যেমন ফিরিয়ে তেমনি ভবিষ্যতে আর যখনও ডায়রিয়া বা উদারময় জাতীয় রোগে আক্রান্ত হবে না।

আমাদের দেশে যেসব কারণ অতি সহজে ডায়রিয়া রোগ দেখা দেয় তার উল্লেখযোগ্য অপরিচ্ছন্ন পরিবশে বিশুদ্ধ খাওয়ার পানির অভাব, ক্রিমি, অপুষ্টি, টিনজাত দুধের এ্যালার্জি জীবাণূ,  পচা বাসি খাওয়া ও ভাইরাস দ্বারা সংক্রামন।

উদারময় বা ডায়রিয়া রোগ হতে সহজে মুক্তি পাওয়া জিনিস সব সময় ঢেকে রাখা দ্বিতীয়ত হোটেল রেস্তোরা পঁচা বাশি খাওয়ার বন্ধ করতে হবে।

তৃতীয়তঃ খাওয়ার রান্না ও পরিবেশনের আগে ভাল করে হাত ধুয়ে নিতে হবে। বাচ্চাদের বেলায় হাত মুখ পরিষ্কার করে ধুয়ে দিতে হবে চতুর্থত যেখানে সেখানে মলমুত্র ত্যাগ বন্ধ করতে হবে গ্রামে গঞ্জে সর্বত্র স্যানিটেশন পায়খানা চালু ও ব্যবহার পদ্ধতি বাধ্যতামূলক করতে হবে। ও পঞ্চমতঃ চাপাকলের কলের পানি ব্যবহার করতে হবে। কলের পানি খাওয়া বাসনপত্রে ধোয়া ও রান্না বান্নার কাজে ব্যবহার করতে হবে। যেখানে কলের পানি নেই সেখানে পানি অবশ্য অবশ্যই ফুটিয়ে পান করতে হবে। মনে রাখতে হবে পায়খানা ব্যবহারের পর হাত সাবান দিয়ে ভাল করে হাত ধুয়ে নিতে হবে। সাবান ব্যবহারে অসমর্থদের অন্তত পক্ষে ছাই দিয়ে হাত ভাল কের সব সময় পরিষ্কার করতে হবে।

ডায়রিয়া বা  উদারময় রোগ চিকিৎসার চেয়ে রোগ প্রতিরোধেই আসল বিষয়। এই রোগ হতে পরিত্রাণ পেতে হলে খুব প্রয়োজন গ্রামেগঞ্জে সকল মায়েদের গণ সচেতনাতার আশু ব্যবস্থা করা যাতে মায়েরা বিশেষত শিশুদের বয়স ভেদে খাদ্য নির্বাচন স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে খাদ্য তৈরি সরবারহ ও একটি নবজাত শিশুকে তার মায়ের দুধ খাওয়ানোর ব্যাপারে বাধ্য বাধকতা করা।


Leave a Reply