নিপা এনকেফালাইটিস ( নিপা ভাইরাস) বা মস্তিষ্ক প্রদাহ

  • 0

নিপা এনকেফালাইটিস ( নিপা ভাইরাস) বা মস্তিষ্ক প্রদাহ

নিপা এনকেফালাইটিস ( নিপা ভাইরাস) বা মস্তিষ্ক প্রদাহ

আমাদের দেশের উত্তর অঞ্চলের রংপুর, কুড়িগ্রাম, নীলফামারি ও লালমণিরহাট জেলায় শুরু হয়েছে এনকেফালাইটিস রোগ সংক্রমনের তান্ডবলীলা। যতো দিন যাচ্ছে ততোই বেড়ে চলেছে এই রোগের মৃতের সংখ্যা। এনকেফালাইটিস রোগ ও তার ভাইরাসের নামকরণ এবং পরিচিত।

১৯৯৮ খ্রিষ্টাব্দে প্যারামিক্সোভিরিডি পরিবারের অর্ন্তগত একটি ভাইরাস সর্বপ্রথম মালয়েশিয়ার নেজেরি সেমবিলান রাজ্যের নিপা শহরে এনকেফালাইটিস রোগের সংক্রমণ ঘটিয়েছিলো বলে সেই শহরের নাম অনুসারে এই রোগের ভাইরাসের নামকরণ করা হয় নিপা ভাইরাস। এই ভাইরাস হলো এমন একশ্রেণীর ভাইরাস, যারা পুরোপুরিভাবে মেরুদন্ডী প্রাণীদের আক্রমণ করে থাকে।

এই ভাইরাস মেরুদন্ডী প্রাণীদের আক্রমণ করলেও অন্যান্য পাখিদেরও আক্রমণ করে থাকে এবং তাদের রক্তের লাল কণাগুলোকে জমাট বাধিয়ে দেয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলে হিম অ্যাপলুটিনেশন। নিপা কিংবা আরবো ভাইরাস বেশ কয়েক প্রকারের হয়ে থাকে।

এনকেফালাইটিস রোগের ভাইরাস মানবদেহে কিভাবে কাজ করে ?

এই ভাইরাস প্রাথমিকভাবে মানবদেহের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা এন্টিবডিকে আক্রমণ করে এবং তার রোগ প্রতিরোধ করার ক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়। এরপর রক্তনালীর ভিতরের স্তরে প্রদাহ সৃষ্টি করে এবং রক্ত জমাট বাধায়। এরপরে এই ভাইরাস রক্তের মাধ্যমে পরিবাহিত হয়ে সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড বা মেরুমজ্জারস এবং মস্তিস্কে পৌছায়। এক পর্যায়ে এই ভাইরাসটি রোগীর হৃৎপিন্ড, ফুসফুস ও কিডনি বা বৃক্কে ছড়িয়ে পড়ে এবং রোগীর বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গকে অসাড় বা অকার্যকর করে ফেলে।

এনকেফালাইটিস রোগ নির্ণয় করার ল্যাবরেটরি পরীক্ষা

এই রোগ সুনির্দিষ্টভাবে নির্ণয় করার জন্য ক) রক্তের সিরাম পরীক্ষা। খ) সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড বা মেরুমজ্জার ভিতরে থাকা রস পরীক্ষা। গ) দেহকোষের ভাইরাস কালচার পরীক্ষা। ঘ) ইমিউনোফ্লুরোসেন্স এ্যাসে (এ্যালাইজা) পরীক্ষা। ঙ) পিসিআর এর মাধ্যমে ভাইরাসের আরএনএ বাড়া। চ) এনজাইম লিঙ্কড ইমিউনোসরবেন্ট এ্যাসে (এ্যালাইজা) নামক মলিকিউলার টেস্টে নিপা ভাইরাসের কারণে সৃষ্টি হওয়া বিশেষ এন্টিবডি আইজিএম এবং আইজিজ নির্ণয় করা হয়। ছ) টিসিই নির্ণয় করা হয় ইত্যাদি।

এনকেফালাইটিস রোগ আক্রমণের আদি ইতিহাস

১৯৯৮ খ্রিষ্টাব্দে সর্বপ্রথম মানবদেহে  এই রোগ সৃষ্টিকারী নিপা ভাইরাস শনাক্ত করা হয় মালেশিয়ায়। এরপরে ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দে সিঙ্গাপুরে। দুই বছরে এই দুই দেশে আক্রান্তদের মধ্যে মোট ২৭৬ জন রোগী মারা যায়। ঢাকায় অবস্থিত আর্ন্তজাতিক উদারময় গবেষণা কেন্দ্র (আইইডিসিআর) সূত্রমতে ২০০১ খ্রিষ্টাব্দে আমাদের দেশের মেহেরপুর জেলায় সর্বপ্রথম নিপা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। এরপরে ২০০৩ খ্রিষ্টাব্দে নওগার, ২০০৪ ও ২০০৮ খ্রিষ্টাব্দে রাজবাড়ীতে, ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দে ফরিদপুরে, ২০০৫  খ্রিষ্টাব্দে টাঙ্গাইলে, ২০০৭ খ্রিষ্টাব্দে ঠাকুরগাওয়ে, ২০০৭ খ্রিষ্টাব্দে কুষ্টিয়ার,  ২০০৮ খ্রিষ্টাব্দে মানিকগঞ্জে এবং ২০১০ খ্রিষ্টাব্দে ফরিদপুরে নিপাহ, ভাইরাসের প্রার্দুভাব হয়। উল্লেখ্য, ২০০৩ খ্রিষ্টাব্দে নওগা জেলায় শুকরের মাধ্যমে এই রোগের প্রার্দুভাব হয়েছিলো।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে ১৯৯৮ থেকে ২০০৮ খ্রিষ্টাব্দে পর্যন্ত নিপা ভাইরাসের উৎসস্থল খোদ মালেশিয়ার মাত্র ১ বার,  সিঙ্গাপুরে মাত্র ১ বার, ভারতে মাত্র ২ বার এই নিপা ভাইরাসের কারণে এনকেফালাইটিস রোগের প্রাদুর্ভাব হয়। কিন্তু এই একই সময়ের মধ্যে আমাদের দেশে এই নিপা ভাইরাসের কারণে এনকেফালাইটিস রোগের সংক্রমণ হয়েছে মোট ৯ বার। উল্লেখ্য, ২০০১ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারী মাসে দ্বিতীয় বার যখন ভারতের শিলিগুড়িতে ৬৬ জন  এই রোগে আক্রান্ত হলো, আক্রান্তদের ৭৪% মারা যায়। মৃতদের মধ্যে অধিকাংশই ছিলো হাসপাতালের স্টাফ ও রোগীর সংস্পর্শে আসা আত্মীয় স্বজনরা।

এনকেফালাইটিস রোগ আক্রমণের বর্তমান ইতিহাস

এই বছরের ১ থেকে ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এনকেফালাইটিস রোগে আক্রান্ত হয়েছে ৫২ জন, মারা গেছে ৩০ জন।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, এনকেফালাইটিস রোগ গত শতাব্দিতে অবিভকত্ ভারতের কোনো কোনে জায়গায় কখনো কখনো মহামারী আকারে দেখা দিতো, যা বর্তমানে আর নেই। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে এই এনকেফালাইটিস রোগটি সারা পৃথিবীর সব জায়গায় মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছিলো। তবে এই রোগ আগেকার দিনে মহামারী আকার ছাড়াও মাঝেমধ্যে বিক্ষিপ্তভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দেখা দিতো। ডিসেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত এই রোগ ছড়ানোর উপযুক্ত সময়।

এনকেফালাইটিস রোগের অন্যান্য কারণ

নিপা কিংবা আরবো ভাইরাসে আক্রান্ত বাদুড় অথবা অন্য কোনো পাখির খাওয়া বা মুখ লাগানো খেজুর, খেজুর রস, তাল, তাল রস, আখ, আখের রস, ফলমুল, যেমন- সুপারি, কলা, পেপে,  পেয়ারা, বরই, আম, জাম, জামরুল, সফেদা, আতা নোনা, কাঠাল, কামরাঙ্গা, আপেল,  আনারস ইত্যাদি ভালভাবে না ধুয়ে কিংবা ভালোভাবে জ্বালিয়ে না খাওয়া। এই রোগে আক্রান্ত ব্যাক্তির হাচি, কাশি,  থুথু, জামাকাপড়, বিছানাপত্র, তৈজসপত্র, কাপ, থালা, বাটি ইত্যাদির সংস্পর্শে আসা। এছাড়া বেশি ঠান্ডা লাগানো, আফিম, ভাং, মদ ইত্যাদি পান করা।

এনকেফালাইটিস রোগের লক্ষণ

নিপা ভাইরাস কিংবা আরবো ভাইরাস কোনো কারণে কারো দেহে প্রবেশ করলে এনকেফালাইটিস রোগের শুরুতেই রোগীর হঠ্যাৎ করে কাঁপুনি বা খিঁচুনিসহ প্রবল জ্বর শুরু হয়, কাশি হয়, শ্বাসকষ্ট হয়, ভীষণভাবে মাথা ধরে, মাথা ব্যথা করে, মাথা ঘোরে, পেট ব্যথা করে, চোখ মুখ লাল হয়ে ওঠে, ঘাড়ের রক্ত চলাচলকারী ধমনী ও মাথার দু পাশের ক্যারেটিড ধমনী উচ্চ রক্তচাপের ফলে দপদপ করে। রোগীর মানসিক শক্তি কমে যায়। কখনো কখনো বুদ্ধি  লোপ পায়। এবং স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক কাজ কর্মেও বিপর্যয় ঘটতে পারে। রোগীর জ্বর বেড়ে গিয়ে ১০২ থেকে ১০৪/৫ ডিগ্রি হয়। রোগী ভূল বলতে শুরু করে। রোগী মাথা চালে। স্থির হয়ে শুয়ে থাকতে পারে না। রোগী সারা গায়ে বাতের ব্যথার মতো হাড়ভাঙ্গা ব্যথা অনুভব করে। রোগী বমি ও অসাড়ে প্রস্রাব পায়খানা করতে শুরু করে। এক পর্যায়ে রোগীর আচ্ছন্নভাব চলে আসে। রোগীর হাত পা মুখ ও পায়ের মাংসপেশি আড়ষ্ট হয়ে আসে।

বয়সীদের চেয়ে বাচ্চারাই এই রোগে বেশি আক্রান্ত হয়। বিশেষ করে তাদের দাত উঠার সময় কিংবা কোনো কঠিন রোগে ভোগার সময়। এ সময়ে বাচ্চারা খিটমিটে মেজাজের হয়ে যায়, চিৎকার করে কাদে, মাথা সোজা কিংবা খাড়া করে রাখতে পারে না, মাথার উপরে বারংবার হাত দেয়, মাথা চালে, ঘুম থেকে হঠ্যাৎ করে চমকে ওঠে, চোখ মুখ লাল হয়ে যায়, অসাড়ে প্রস্রাব পায়খানা করে, শ্বাসকষ্ট হয় ইত্যাদি।

এনকেফালাইটিসের ভয়াবহতা

এই রোগে আক্রান্ত রোগীকে তাড়াতাড়ি সুচিকিৎসা দিতে না পারলে ৭৫% রোগীই মারা যায়।

এনকেফালাইটিস রোগে ব্যবহৃত হোমিওপ্যাথিক ওষুধ

হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা বিজ্ঞা একটি লাক্ষণিক চিকিৎসা বিজ্ঞান। এই চিকিৎসা বিজ্ঞানে কোনো রোগই কোনো সুর্নিদিষ্ট ওষুধ নেই। যে কোনো রোগের লক্ষণের সাথে হোমিওপ্যাথিক যে কোনো ওষুধের লক্ষণের মিল হলেই সেই ওষুধকে সেই রোগে প্রয়োগ করলে রোগ পুরোপুরিভাবে নিরাময় হয়। তবে, এই রোগে আমরা লক্ষণ অনুসারে সাধারণত অরাম স্যালফ,  আর্নিকা মন্টেনা, আর্সেনিক এ্যালাম,  ইউক্যালিপটাস ইচিনেসিয়া, এগারকিাস মাস্ক,  একোনাইট ন্যাপ,  এডোনিস ভার্নেলিস, এপিস মেল, ওপয়িম, ক্যাল্কেরিয়া আর্স, ক্যাল্কেরিয়া কার্ব,  ক্যাল্কেরিয়া ফস, ক্রাটিগাস, কুপ্রাম মেট, গ্লোনাইন, জিঙ্কাম, টিউবারকুলিনাম, ট্যারেন্টুলা, নাক্স মস্কেটা, নেট্রাম সালফ, নেট্রাম মিউর, পডোফাইলাম, পাইরোজেন, প্যাসিফ্লোর, ব্যাপ্টিসিয়া,  বেলেডোনা, ব্রায়োনিয়া, ভিস্কাম, এ্যালাম, ভিরেট্রাম এ্যাল্বাম, ভিরেট্রাম ভিরিডি, মার্কসল, মেডোরিনাম, রাওয়ালফোলিয়া, লরোসিরোসিস, সিকিউটা, সালফার, সাইলিসিয়া, সিনা, সিপিয়া, সোলেনাম নাইগ্রা, স্ট্রমোনিয়াম, হাইপেকিাম,  হাইড্রোফোবিনাম,  হায়োসায়েমাস, হায়োসিন হাইড্রোব্রোমাইড এবং হেলিবোরাস নাইজার ইত্যাদি ওষুধ ব্যবহার করতে পারি।

এনকেফালাইটিস রোগের আনুষাঙ্গিক নিয়ম

রোগীর মাথা ন্যাড়া করাসহ মাথায় বেশি করে ঠান্ডা পানি কিংবা বরফ দিতে হবে এবং কপালে ঠান্ডা পানি কিংবা বরফ পানির পট্রি দিতে হবে। কিন্তু হাত পা ঠান্ডা পানি কিংবা বরফ পানির পট্রি দিতে হবে। কিন্তু হাত পা ঠান্ডা অনুভব করলে সরিষার তেল, অলিভ অয়েল, কর্পূর, কিংবা গ্লিসারিন মাখিয়ে তার উপরে গরম সেক দিতে হবে। রোগীর ঘরে কোনোরকমের শব্দ করা যাবে না কিংবা রোগীর ঘরে কোনোরকমের উজ্ঝল আলো জ্বালানো যাবে না।

এনকেফালাইটিস রোগে সর্তকর্তা

যেসব কারণে এই রোগ হয় কিংবা ছড়ায় সেসব কারণে এড়িয়ে চলতে হবে। সেই সাথে রোগাক্রান্ত রোগীর নিঃশ্বাস প্রশ্বাস,  কফ,  থুথু,  হাচি, কাশি ইত্যাদি থেকে সাবধান হতে হবে।

এনকেফালাইটিস আক্রান্ত রোগীর পথ্যাপথ্য

রোগীর পানির পিপাসা থাকলে ঠান্ডা পানি পান করাবে। সাগু, বার্লি,  দুধ,  পাতলা চালের ভাত, দেশি বাচ্চা মুরগি ও কবুতরের সুপ তৈরি করে খাওয়াবেন। উচ্চ রক্তচাপ না থাকলে দেশি হাস মুরগীর ডিম এবং খাটি দুধ খাওয়াবেন। ফলের রস খাওয়াবেন কিন্তু কোনো কোম্পানির তৈরি জুস খাওয়াবেন না।

 

প্রিন্সিপাল ডাঃ  মহিউদ্দিন খান

পরিচালক মুক্তি আধুনিক হোমিও মিশন  এ্যান্ড রিসার্চ

ইনস্টিটিউশন


Leave a Reply