পেশাগত কারণে বক্ষব্যাধি

  • 0

পেশাগত কারণে বক্ষব্যাধি

পেশাগত কারণে বক্ষব্যাধি

 

মানুষ জীবিকা নির্বাহের জন্য নানা ধরনের পেশায় নিয়োজিত থাকে। কেউবা উন্নত, ভাল এবং স্বাস্থ্যকর পরিবেশে কাজ করেন, কেউবা অনুন্নত ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কাজ করেন। যারা অস্বাস্থ্যকর এবং অনুন্নত পরিবেশে কাজ করেন তাদের নানা রকম শারীরিক সমস্যার সৃষ্টি হয়ে থাকে। বিবিধ পশ্য এবং পেশার পারিপার্শ্বিক পরিবেশের ফলে সৃষ্ট শারীরিক সমস্যার মধ্যে বক্ষব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে এমন রোগীর সংখ্যা তুলনামুলক বেশী।

সাধারণত শ্রমিক শ্রেণির লোকেরা যে সকল মিল কল কারখানাতে কাজ করেন, সে সকল ফ্যাক্টরি বা মিল কারখানার মধ্যে অধিকাংশই অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে। এতে করে এসব কারখানার অভ্যান্তরীন পরিবেশ অর্থ্যাৎ শ্রমিকদের কাজ করার পরিবেশ থাকে খুবেই নিম্নমানের। ফলে শ্রমিকরা বুকের ব্যাধিসহ বিভিন্ন প্রকারের ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছেন।

মিল কল কারখানা ছাড়াও আরো বিভিন্ন পেশা রয়েছে যার কারণে মানুষ বুকের নানাবিধ রোগ বালাইতে আক্রান্ত হয়ে থাকে। ভিন্ন ভিন্ন পেশার কারণে সৃষ্ট বক্ষব্যাধি সমূহ:-

১। অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠা মিল কারখানার অভ্যন্তরে স্যাতসেতে, বদ্ধ ও নোংরা পরিবেশে যক্ষার জীবানু বেড়ে ওঠার অনুকুল পরিবেশ। তাই এসব পরিবেশে যারা কাজ করেন তাদের যক্ষার জীবানু দ্বারা আক্রানত হবার ঝুকি থাকে বেশি।

২। সিলিকা দিয়ে যে সকল ব্যক্তি কাজ করেন তাদের সিলিকোসিস নামক বক্ষব্যাধিতে আক্রান্ত হতে দেখা যায়।  এক্ষেত্রে সিলিকোসিস এর সাথে কারও কারও যক্ষাও হয়ে থাকে।

৩। নানা ধরনের রাসায়ানিক পদার্থ ক্রমিয়াম ক্যাডমিয়াম, এসবেটস ইত্যাদির সংস্পর্শে দীর্ঘদিন যারা কাজ করেন তাদের ক্ষেত্রে ফুসফুসে ক্যান্সার হবার প্রবণতা থাকে বেশি।

৪। এমন অনেক কর্মস্থল আছে সেসব জায়গায় প্রচুর ধুলিকণা, গ্যাস, ফিউম এবং ঝাঝালো পদার্থ বিদ্যমান থাকে। এ সকল বস্তু মানুষের শ্বাসের সাথে নাকে ঢুকে ফুসফুসের মারাত্মক ক্ষতি করে।

৫। ফ্যাক্টরি বা মিল কল কারখানার অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে দীর্ঘদিন জমে থাকা ধুলিকণা সেখানে কর্মরত ব্যক্তিদের ফুসফুসে জমা  হতে হতে ফাইব্রোসিস তৈরি করে।

৬। পাটের সুক্ষ আশ শ্বাসকষ্ট সৃষ্টির একটি প্রধান উপাদান। তাই পাটের আশ ফুসফুসে জমতে জমতে শ্বাস কষ্টের উদ্ভব ঘটায়।

৭। তুলার তন্তুও ফুসফুসে প্রবেশ করে বক্ষের রোগ সৃষ্টিতে সহায়তা করে।

৮। নিউমোকানিওসিস নামক এক ধরনের বুকের অসুখ রয়েছে। যে সকল লোক কয়লার খনিতে কাজ করেন তাদের দেহে এ ব্যাধির উপক্রম দেখা দেয়।

৯। সার, সিমেন্ট এবং রং এর ফ্যাক্টরিতে যারা কাজ করেন তাদের ও বুকের বিবিধ অসুখ বিসুখে আক্রান্ত হবার প্রবণতা থাকে।

১০। পাখি বিক্রির কাজ যারা করেন, দীর্ঘদিন পাখির সংস্পর্শে থাকতে থাকেতে তাদের বার্ড ফেনসিয়ার্স লাঙ্গ নামক বক্ষব্যাধি হবার ঝুকি থাকে।

১১। ভেজা ধান থেকে যে বুকের অসুখ হয়ে থাকে তার কারণে মানুষের শরীরে কাশি ও শ্বাসকষ্টের উপক্রম হয়। আর যারা শস্য কাটার কাজ করেন তাদের ক্ষেত্রে এই ধরনের বুকের অসুখে আক্রান্ত হবার আশঙ্খা থাকে বেশি।

১২। এছাড়াও বিভিন্ন মিল কল কারখানায় এমন অনেক রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহৃত হয়, যার কারণে সেখানে কর্মরত ব্যক্তিদের হাপানির সৃষ্টি হতে পারে।

তাই, যেসব পেশার কারণে বক্ষব্যাধি হবার ঝুকি থাকে সে সকল পেশার  লোকদের এ ব্যাপারে সর্তক থাকতে হবে। পেশাগত কোন কারণে বক্ষ ব্যাধির উপসর্গ সমূহ পরিলক্ষিত হলে দ্রুত বক্ষব্যাধি চিকিৎসকের শরনাপন্ন হতে হবে।

মিল কল কারখানা প্রতিষ্ঠার সময় কর্তৃপক্ষের শ্রমিক কর্মীদের স্বাস্থ্যের প্রতি লক্ষ্য রাখতে  হবে। কারখানার অভ্যন্তরীন পরিবেশ যাতে নোংরা ও অপরিচ্ছন্ন না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। কারখানার কোন কর্মী অসুস্থ হলে তার চিকিৎসার ব্যাপারে মিল কর্তপক্ষকে সচেতন হতে হবে। কোন কর্মী যদি এমন কোন ব্যাধিতে আক্রান্ত হয় যে তার দীর্ঘসময় বিশ্রামের প্রয়োজন, সেক্ষেত্রে ফ্যাক্টরির কর্তৃপক্ষকে ওই কর্মীর পর্যাপ্ত ছুটি মঞ্জুর করতে হবে। যেসব বিষয় এড়িয়ে চললে কর্মীদের বুকের রোগ বালাইতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্খা কম থাকে সে সকল বিষয় কর্তৃপক্ষ কর্তৃক শ্রমিকদের মধ্যে প্রচার করতে হবে। যেমন- ধুমপান হচ্ছে বক্ষ ব্যাধি সৃষ্টির একটি অন্যতম উপাদান। মাত্রাতিরিক্ত ধুমপানের ফলে ফুসফুসের ক্যান্সার ও ব্রঙ্কাইটিস হওয়ার আশঙ্খা থাকে। ধুমপানের কুফল সম্পর্কে শ্রমিকদের অবগত করতে হবে।

ডা.  একেএম মোস্তফা হোসেন

পরিচালক, জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, মহাখালী, ঢাকা।


Leave a Reply