ফুসফুসের অসুখ

  • 0

ফুসফুসের অসুখ

Category : Health Tips

ফুসফুসের অসুখ

নিজস্ব প্রতিবেদক

মানব দেহের এক অত্যাবশ্যকীয় অঙ্গ ফুসফুস। দেহ ও তার পারিপার্শ্বিক মাধ্যমের মধ্যে সবসময় গ্যাস বিনিময় ঘটে। মানবদেহে একাজ সম্পাদনের জন্য যেসব অঙ্গ রয়েছে তার মধ্যে ফুসফুস অন্যতম। ফুসফুসের এলভিওলাসগুলোর মধ্যেই চলে হাওয়া ও রক্তের ভেতর গ্যাস বিনিময়। শ্বাস প্রশ্বাসতন্ত্রের অন্যসব অঙ্গগুলো হচ্ছে হাওয়া বহনের পথ, আর এ অঙ্গের কাজ হচ্ছে নিঃশ্বাসের হাওয়া গ্রহণ ও প্রশ্বাসের হাওয়া ত্যাগ করা। দেহের বক্ষ গহবেরের ভেকতরে ফুসফুসের অবস্থান। বক্ষের ডান ও বাম দু দিকে দুটি ফুসফুস থাকে। দুই ফুসফুসের প্রত্যোকটি শংখবৎ আকৃতির হয়ে থাকে। আর ফুসফুসের ওপারে সরু অংশকে বলে শীর্ষস্থান আর নিচের চওড়া অংশকে বলে ভিত্তি। শীর্ষ স্থান গলার কাছে কন্ঠার হাড়ের ২-৩ সেন্টিমিটার ওপর পর্যন্ত যায় এবং ভিত্তি মধ্যচ্ছদার দিকে মুখ করে থাকে। এজন্যই তাকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। তিনটি সার্ফেস ও ধার দ্বারা ফুসফুস পৃথক করা থাকে। এ সার্ফেস ও ধারগুলো হচ্ছে পাজরমুখী সার্ফেস, মধ্যচ্ছদমুখী সার্ফেস মেডিয়াস্টিনাম ও কশেরুকাম্ভর দিকে মুখ করে থাকে। এজন্যই তাকে দু ভাগে ভাগ হয়। এ দুটো ভাগ ১) মেডিয়াস্টিনাম অংশ। ২) কশেরুকা অংশ। ভেতরমুখী সার্ফেসের মিডিয়াস্টিনাম অংশে থাকে। এক গভীরতর ফুসফুসের প্রবেশদ্বার। ফুসফুসের স্নায়ুগুলি ফুসফুসের ধমনী, দুটি ফুসফুস শিরা ও বহু ল্যাসিকাবাহী শিরা।  এগুলো সেখানে সংযোজন করার সাহায্যে একত্রে একটিতে গ্রন্থিত থাকে যাকে বলে ফুসফুসের মুল বা কর্নিয়া।

কোষের ভেতর অক্সিজেন বহন করে নিয়ে আসা এবং সেখান থেকে বিপাক প্রক্রিয়ার সৃষ্ট কার্বনিক অল্ম গ্যাস বহন করে নিয়ে যাওয়ার কাজগুলো সাধন করে রক্ত। যেহেতু অক্সিজেনের ক্রমাগতভাবে খরচ হয় ও কার্বনিক অল্মগ্যাস জমা হয় সেইহেতু রক্তে গ্যাসের ঘনত্ব সর্বাদা এক স্তরে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজন অক্সিজেনের অভাব ক্রমাগত পূরণ করা ও কার্বনিক অল্মগ্যাস সর্বদা বহিষ্কৃত করা। এ ধরনের প্রক্রিয়া ফুসফুসের মধ্যে ক্রমাগত সম্পন্ন হয়। একেই বলা হয় ফুসফুস শ্বাস প্রশ্বাসের ক্রিয়া। ফুসফুসের শ্বাস প্রশ্বাসের মানে হলো এই যে, ফুসফুসের এলভিওলাসগুলো থেকে রক্ত চলে যায় তার অক্সিজেন ও রক্ত থেকে এলভিওলাসগুলোর ভেতর নির্গথ হয় কার্বনিক অল্মগ্যাস। ফুসফুসের শ্বাসক্রিয়া পরিচারন তখনই সম্ভব হয় যখন বাইরের প্রকৃতি থেকে ক্রমাগত বিশুদ্ধ হাওয়া এসে পৌছে ফুসফুসে। ফুসফুসের এলভিওলাসগুলোর ভেতর ও সেখানকার আবদ্ধ হাওয়া বেরিয়ে যেতে পারে।

ফুসফুসের প্রধান প্রধান রোগগুলো হচ্ছে যক্ষা, নিউমোনিয়া,ফুসফুসের ফোড়া, ব্রঙ্কাইটিস, ব্রঙ্কিয়ে কটোসিস।

এক সময় যক্ষা রোগ খুবই ভয়াবহ ছিল। যার হয় তার নেই রক্ষ’ এমন একটি কথার প্রচলণ ছিল এই রোগ সর্ম্পকে। যক্ষা একটি ছোয়াচে রোগ। যেকোন বয়সের লোকের যক্ষা হতে পারে। তবে সাধারণত যেসব লোক দুর্বল ও অপুষ্টিতে ভোগে অথবা যক্ষা রোগীর সংস্পর্শে থাকে তারা যক্ষা রোগে আক্রান্ত হতে পারে।

যক্ষার  লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে ক্রমাগতভাবে ওজন কমা ও দুর্বলতা বেড়ে যাওয়া, ঠনঠনে কাশি হওয়া,বিকেলে অল্প অল্প জ্বর হওয়া, বুকে ও পিঠের ওপর দিকে ব্যথা হওয়া। রোগ প্রাথমিক অবস্থায় ধরা না পড়লে ক্রমেই জটিল আকার ধারণ করে। আর রোগ কঠিন হয়ে পড়লে কাশির সাথে রক্ত ওঠে থাকে, শরীরের চামড়া ফ্যাকাশে ও মোমের মত হয়ে যায়, গলার স্বর ভেঙ্গে যায়।

আমাদের দেশে যক্ষা রোগ একসময় খুবই ভয়াবহ ছিল। চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে  এ রোগ নিয়ন্ত্রণে এসেছে। যক্ষারোগের চিকিৎসার ব্যবস্থা দেশের প্রায় প্রতিটি হাসপাতালেই রয়েছে। এছাড়া যক্ষা রোগ প্রতিরোধের জন্য নাটাব গঠিত হয়েছে। এ রোগের ভয়াবহতা স্মপর্কে জনসাধারণকে সচেতন করে তোলারও ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এছাড়া যক্ষা নিয়ন্ত্রণের জন্য টিকা দেয়ার বিষয়টি বেশ গুরুত্ব লাভ করেছে। দেশে এখনও প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক  লোক যক্ষায় আক্রান্ত হলেও এ রোগ এখন নিয়ন্ত্রনের মধ্যে।

নিউমোনিয়া ফুসফুসের  একটা তীব্র সংক্রমণ। সাধারণত ঠান্ডা লাগা, মাঝে মাঝে হাম হওয়া, কাশি, ইনফ্লুয়েঞ্জা, হাঁপানির মত অন্য রোগ থেকে নিউমোনিয়া হয়ে থাকে। এই রোগ বয়স্কদের তুলনায় শিশুদের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। এই রোগের লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে দ্রুত হালকা শ্বাস, কখনো কখনো সাঁই সাঁই করে শ্বাস নেয়া। প্রতিবার শ্বাস নেয়ার সময় নাকের ফুটো বড় হয়ে যেতে পারে। নাকের ফুটো বড় হয়ে যেতে পারে। কফের রং হলদে অথবা সবুজাভ হয়ে থাকে এবং রক্তের ছিটে দেয়া শ্লেশ্মা থাকে। কাশি দেয়ার সময় গভীর শ্বাস নিলে বুকের ব্যতা বেড়ে যায়, জ্বর বেশি হয়, রোগীকে অসুস্থ দেখায়। যদি দেখা যায় কোন শিশু প্রতি মিনিটে ৫০ বারের বেশি শ্বাস নিচ্ছে তবে নিউমোনিয়া হয়েছে বলে ধরে নেয়া যেতে পারে। আমাদের দেশে সাধারণত শীতের দিনেই এ রোগের প্রকোপ বেশি দেখা যায়। ফুসফুসের ব্রঙ্কিগুলোর পথ আটকে গেলে ফুসফুসের ফোড়া হয়ে থাকে। ব্রঙ্কাইটিস সংক্রমণ হয়ে ফোড়া হয়। পুঁজটা ফুসফুসের মধ্যে চলে গিয়ে কফ হয়ে কাশির সাথে বেরিয়ে যায়। সংক্রমণটা ফুসফুসে ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে এটি খুবই বিপজ্জনক অবস্থা। এই রোগের লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে কাশির সাথে ঘন হলদে দুগন্ধযুক্ত কফ, বেশি জ্বর হওয়া, সেই সাথে দিনে একবার করে ঘাম হয়ে জ্বর কমে যাওয়া, নাড়ি দ্রুত চলা। আক্রান্ত রোগীকে খুব অসুস্থ দেখায়।

তবে আমাদের দেশে রোগীর সংখ্যা খুব বেশি নয়। অতিরিক্ত ধুমপান ও শ্বাস প্রশ্বাসের সাথে বেশি ধোয়া ও ধুলো ফুসফুসে প্রবেশ করার ফলে ফুসফুসের নরম জালিকাগুলোর ক্ষতি হয়। আর এ থেকেই ব্রঙ্কাইটিস হয়। ব্রঙ্কাইটিসের লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে বিশেষ করে সকালবেলার কাশির সাথে প্রচুর পরিমানে সাদা কফ বের হওয়া। যারা বেশি ধুমপান করে, যারা ভিড়ের জায়গায় বা কলকারখানায় থাকে তারা সাধারণত এ রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে। ব্রঙ্কাই বা যেসব নল দিয়ে ফুসফুসে বাতাস প্রবেশ করে তাদের সংক্রমণকে ব্রঙ্কাইটিস বলা হয়। এ রোগে আক্রান্তদের শব্দ করে কাশি হয়। সাথে প্রায়ই শ্লেষ্মা বা কফ থাকে। ব্রঙ্কাইটিস সাধারণত ভাইরাস থেকে হয়ে যায়।  এ রোগের লক্ষণ হচ্ছে কাশির সাথে অন্তত ৩ মাস ধরে শ্লেস্মা হয়ে থাকে। প্রতিবছরই একই রোগীর এ রোগ হতে পারে। এ রোগীর কখনও কখনও কাশি বাড়ে, আবার জ্বরও হতে পারে। এ ধরনের কাশি থাকলে, অথচ যক্ষা বা হাপানির মত অন্য পুরনো ব্রঙ্কাইটিস থাকতে পারে। বয়স্কা নিয়মিত ধূমপায়ীদের মধ্যে এ রোগ থেকে এমফিসিমা নামে ফুসফুসের একটা কঠিন ও দুরারোগ্য রোগ হতে পারে। এমফিসিমা হলে রোগীর শ্বাস নিতে খুব কষ্ট হয়। রোগীর বুক পিপের মত বড় হয়ে যায়।


Leave a Reply