টোটাল আর্টারিয়াল করোনারি বাইপাস সার্জারি

  • 0

টোটাল আর্টারিয়াল করোনারি বাইপাস সার্জারি

টোটাল আর্টারিয়াল করোনারি বাইপাস সার্জারি

ডাঃ মোঃ কামরুল ইসলাম

বর্তমান সময়ে প্রাপ্ত বয়স্কদের ‍মৃত্যুর জন্য হার্ট এ্যাটাক বা মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্শনকে এক নম্বর কারণ বলে বিবেচনা করা হয়। এই হার্ট  এট্যার্কের কারণ হলো হার্টের নিজস্ব রক্তনালী করোনালী আর্টারির ব্লক। পরিসংখ্যান অনুযায়ী আমেরিকার প্রতি ২০ জনে ১ জন বা ৪.৮৫% লোকের করোনারি আর্টারি ডিজিজ আছে। আমাদের দেশে যদিও কোন সঠিক পরিসংখ্যান নেই তবুও অনুমান করা যায় এই হার বেশি বৈ কম নয়। করোনারি আর্টরির ডিজিজ বা ব্লকের সার্জিক্যাল ট্রিটমেন্ট বা বাইপাস সার্জারি একটি প্রতিষ্টিত চিকিৎসা পদ্ধতি। বাংলাদেশে এই বাইপাস সার্জারি বিগত এক দশকেরও বেশি সময় প্রচলনের ফলে প্রভূত সাফল্য লাভ করেছে এবং রোগীদের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, বাইপাস সার্জারি করে হার্টের নিজস্ব রক্ত সঞ্চালন বিকল্প পথে পুর্ণস্থাপন করা হয়। এ জন্য বিকল্প রক্তনালী বা কনডুইট হিসেবে পায়ের শিরা বা স্যাফেনাস ভেইন, বক্ষপিঞ্জরে ধমনী বা ইন্টার্নাল ম্যামারি আর্টরি, হাতের ধমনী বা রেডিয়াল অ্যার্টারি এবং পাকস্থলীর ধমনী বা ডান গাস্ট্রোএপিপয়িক আর্টারি রোগীর নিজ শরীর থেকে সংগ্রহ করা হয়। এই বিকল্প রক্তনালীগুলো দিয়ে হার্টের রক্তনালীর বা করনারী আর্টারি ব্লকের বাইপাস বা বিকল্প পথ তৈরি করা হয়।

বিগত কয়েক দশকে বক্ষ পিঞ্জরের ধমণী ইর্ন্টানাল ম্যামরি অ্যার্টারি এবং পায়ের শিরা স্যাফেনাস ভেইন ব্যবহার ছিল প্রচলিত। কিন্তু সমীক্ষায় দেখা গেছে এই বিকল্প রক্তনালীগুলোও কয়েক বছর পরে ব্লক হয়ে যায় এবং শিরা ব্লক হয়ে যাওয়ার হার ধমনীর চেয়ে উল্লেখযোগ্য ভাবে বেশি। এ যাবতকালের অনেক গবেষণায় জানা গেছে বাইপাস সার্জারির ১০ বছরের মধ্যে শিরা ব্যবহৃত গ্রাফটগুলোর কার্যকারিতা থাকে ৬০% কিন্তু ধমনী ব্যবহৃত গ্রাফটগুলোর কার্যকারিতা বহাল থাকে ৯০% এরও বেশি। বাইপাস সার্জারিতে যে সমস্ত ধমনী ব্যবহার করা হয় তার মধ্যে হাতের রেডিয়াল ধমনীর কার্যকারিতা থাকে ৮০% এবং বক্ষ পিঞ্জরের ইন্টার্নাল ম্যামারি ধমনীর কার্যকারিতা বহাল থাকে ৯০% এরও বেশি। অর্থ্যাৎ যে সমস্ত রোগীর ক্ষেত্রে শিরা দ্বারা বাইপাস সার্জারি করা হয় তাদের মধ্যে শতকরা ৪০ ভাগ রোগীরই ১০ বছরের মধ্যে করোনারি আর্টারির ব্লকের লক্ষণসমুহ যেমন পুণঃ হার্ট এ্যাটার্ক বা পুনঃ বুকে ব্যথা বা এনজাইনা নিয়ে ফিরে আসে, যার ফলে পুনৎ বাইপাস সার্জারি কিংবা এনজিওপ্লাস্টি বা স্টেটিং করাতে হয়।

টোটাল আর্টারিয়াল বাইপাস সার্জারিতে যে শুধু দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল ভাল হয় তা নয়, স্বল্পমেয়াদী সুবিধা যেমন অপারেশনকালে বা অপারেশনে পর হাসপাতালে মৃত্যুর হার বা অন্যান্য জটিলতার হারও শিরা ব্যবহৃত বাইপাস গস্ফাটিং এর চেয়ে কম। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, উক্ত মৃত্যুর হার টোটাল আর্টারিয়াল বাইপাস গ্রাফটিং  এ যেখানে ০.২% থেকে ০.৯% সেখানে শিরা ব্যবহৃত বাইপাস গষ্ফাটিং এ তা ২.৯%।

আমেরিকার বিখ্যাত হৃদরোগ হাসপাতাল মেয়ো ক্লিনিক এর প্রখ্যাত মেয়ো ক্লিনিক এ প্রখ্যাত হার্ট সার্জন ডা. সানড এর সহযোগী হিসাবে দীর্ঘ সময় কাজ করার সুযোগ আমার হয়েছে। সেখানে টোটাল আর্টারিয়াল বাইপাস সার্জারি করা ২০০০ রোগীর এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে ১০ বছর পরও বাইপাস গ্রাফট হিসেবে ব্যবহৃত ধমনীগুলোর কার্যকারিতা ৯০% এর বেশি বহাল রয়েছে। তার এবং পৃথিবীর অন্যান্য বরেণ্য কার্ডিয়াক সার্জনদের মতে রোগীর বয়সসীমা ৫০-৫৫ বছর বা তার নিচে হলে টোটাল আর্টারিয়াল বাইপাস গ্রাফট সার্জারির কার্যকারিতা দীর্ঘমেয়াদী হয়।

সুদীর্ঘ তিন বছর আমেরিকার মেয়ো ক্লিনিকে কাজ করার পর সম্প্রতি আমি এ্যাপোলে হসপিটালস ঢাকায় কনসালটেন্ট কার্ডিয়াক সার্জন হিসেবে যোগদান করে টোটাল আর্টারিয়াল বাইপাস গ্রাফটিং অপারেশন সাফল্যের সঙ্গে শুরু করেছি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, বাংলাদেশ করোনারি আর্টারি ব্লকযুক্ত রোগীরা এই যুগান্তকারী অপারেশনের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদী সুবিধা পাবেন, পাশাপাশি অসময়ে পুণঃ হার্ট এ্যাটাক বা পুনঃ বুকে ব্যথা বা  এনজাইনা নিয়ে বাইপাস সার্জারির ঝুকি থেকেও রেহাই পাবেন।

লেখকঃ কনসালটেন্ট, কার্ডিও থেরাসেক এ্যান্ড ভাস্কুলার সার্জারি, এ্যাপোলে হসপিটালস, ঢাকা।


Leave a Reply