বিনিদ্র রজনী, তন্দ্রাচ্ছন্ন দিবস

  • 0

বিনিদ্র রজনী, তন্দ্রাচ্ছন্ন দিবস

Category : Health Tips

বিনিদ্র রজনী, তন্দ্রাচ্ছন্ন দিবস

ডা. এ আর এম সাইফুদ্দিন একরাম

চারপাশে খেয়াল করলে দেখা যায় অনেকেই ঝিমুচ্ছেন। বাসে যেতে যেতে কিম্বা ক্লাসে বসে লেকচার শুনতে শুনতে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছেন। এতে তেমন অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ অনেকেই অতিরিক্ত কাজের চাপে যথেষ্ট ঘুমানোর ফুরসৎ পান না এবং অনেকে তা বুঝতেও পারেন না। কিন্তু যখন তখন ঘুম ঘুম ভাব কিম্বা নিদ্রাচ্ছন্নতা মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে। উদাহরণ স্বরূপ রাস্তাঘাটে ট্রাফিক সিগনালে লাল বাতির সামনে ঘুমিয়ে পড়লে কিম্বা দ্রুতগামী বাস কিম্বা ট্রাকের চালক ঘুমিয়ে পড়লে কি হতে পারে, তা সবাই জানেন। নিদ্রাহীনতার কারণে নানা রকম শারীরিক রোগব্যাধি হতে পারে। যেমন উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ,  ডায়াবেটিস, স্থুলকায়ত্ব।

আধুনিক কর্মব্যস্ত জীবনে আমাদের ঘুমের সময় কমে যাচ্ছে। দৈনন্দিন জীবনে স্বচ্ছলতা আনতে অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে গিয়ে পরিমাণে ঘুমের ঘাটতি পড়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে এ সমস্যা এখন তেমন প্রকট না হলেও উন্নত দেশসমূহ অনেকের চোখেই ঘুমের আকাল দেখা দিচ্ছে। বলা হয়, এ মুহুর্তে আমেরিকার জনগণ সবচেয়ে বেশি নিদ্রা সঙ্কটে ভুগছেন। ২০০১ সালের নিদ্রা সংক্রান্ত এক জরিপের ফলে দেখা যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ৫ জনে অন্তত ১ জন প্রতিদিন ঘুমানোর জন্য ৬ ঘন্টার চেয়ে কম সময় পান। ২০০১ সালের জরিপে এ অবস্থা ছিল প্রতি ১০ জনে একজন। অর্থ্যাৎ নিদ্রাবঞ্চিত মানুষের সংখ্যঅ বিগত দশকে দ্বিগুন হয়েছে।

কেন এই নিদ্রাহীনতা ?

নিদ্রাহীনতার কিম্বা নিদ্রাসঙ্কটের নানাবিধ কারণ রয়েছে। আজকের তীব্র প্রতিযোগীতামুখর জগতে কাজের তীব্র প্রতিযোগীতামুখর জগতে কাজের অত্যধিক চাপের পাশাপাশি রয়েছে দায়িত্ব পালনের পরিবর্তনশীল পালাক্রম, বিমান ভ্রমণেল আধিক্য কিম্বা কাজের সূচী ঠিক রাখার জন্য ঘুমের নিয়মিত সময়ের কাটছাট। প্রাত্যহিক জীবনে নিদ্রাসঙ্কটে ভোগা মানুষজনের পাশাপাশি প্রকৃত নিদ্রাহীন রোগীর সংখ্যাও কিন্তু বেড়ে চলেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে নিদ্রাকালে শ্বাস বন্ধ হওয়া,  অপ্রতিরোধ্য নিদ্রাবেগ, ঘুমের মধ্যে পদ চাঞ্চল্য।

কারণ যাই হোক না কেন , দিনে দিনে নিদ্র সঙ্কট কিম্বা নিদ্রাহীনতা যে বেড়ে চলছে, এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।

এদের অনেকেই দিনের বেলায় তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব কাটানোর জন্য অতিরিক্ত চা এবং কপি পান করে থাকেন।  এর ফলে রাতেরবেলা তাদের আরও কম ঘুম পাচ্ছে। কিন্তু আসলে তারা কাজের চাপে রাতে ঘুমানোর সময় পাচ্ছেন কম। দিনের বেলায় নিদ্রাচ্ছন্নতা কাটানোর জন্য অতিরিক্ত চা বা কপি পান করতে বাধ্য হচ্ছেন এবং এর ফলে আবার অনিদ্রার শিকার হচেছন।

অধিকাংশ বয়স্ক মানুষের প্রতিরাতে সাত থেকে আট ঘন্টা ঘুমের প্রয়োজন। অবশ্য ব্যক্তিভেদে কারে কারো কম কিংবা বেশি ঘুমের প্রয়োজন হতে পারে। ঘুমের পরিমাণ কম হলে কিম্বা ঘুমের মান ভাল না অনেক খারাপ পরিণতি হতে পারে। যথেষ্ট পরিমাণে ভাল ঘুম না হওয়ার সঙ্গে নান রকম শারীরিক ও মানসিক রোগব্যাধি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যেমন উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, মস্তিস্কের পক্ষাঘাত, ডায়বেটিস, অতিরিক্ত মেদ ভূড়ি, স্মৃতি  দুর্বলতা, স্মৃতিভ্রংশতা। দিনের বেলায় যাদের চোখ ঘুমে ঢুলঢুল থাকে তাদের সাধারণত কোন না কোন ধরনের নিদ্রাসংক্রান্ত জটিলতা রয়েছে। নিদ্রার সমস্যা থাকলে কোন ব্যাক্তি সহজে ঘুম আসতে পারে না। কিম্বা ঘুমিয়ে থাকতে পারেন না কিম্বা ঘুমের মধ্যে অস্বাভাবিক আচরণ করতে পারেন। যেমন- ঘুমের মধ্যে হেটে বেড়ানো। অনেকে নিদ্রার সমস্যার জন্য দিনের বেলায় অপ্রতিরোধ্য ঘুমে আক্রান্ত হতে পারেন।

যেকোন রোগীর ঘুমের সমস্যা থাকলে প্রথমত দুটি প্রশ্ন জাগে তাদের কি ঘুমের পরিমাণ কম নাকি ঘুমের মান ভাল নয়? যাদের আংশিক কিম্বা মাঝে মাঝে কিম্বা দীর্ঘ মেয়াদী ঘুমের ঘাটতি রয়েছে, তারা যদি যথেষ্ট পরিমাণে ঘুমিয়ে নেন তাহলেই দিনের বেলাই নিদ্রাচ্ছন্ন ভাব কেটে যায়।

যাদের ঘুমের পরিমাণে কোন ঘাটতি নেই তাদের সাধারণত ঘুমের মান ভাল নয়। ঘুমের মান ভাল না হওয়ার কিছু লক্ষণ বা উপসর্গ রয়েছে। যেমন-

  • সব সময়ই ঘুম আসতে ত্রিশ মিনিটের বেশি সময় লাগে।
  • ঘুমের ভেতরে মাঝে মাঝে জেগে ওঠা এবং আবার ঘুমাতে দেরী হওয়া।
  • দিনের বেলা ঘন ঘন ঘুমের ঝুল আসা এবং সেখানে সেখানে ঘুমিয়ে পড়।
  • নাক ডাকা, শ্বাসকষ্ট হওয়া, হঠ্যাৎ হঠ্যাৎ দম বন্ধ হয়ে আসা ইত্যাদি সমস্যা থাকলেও ঘুমের মান ভাল হয় না। এই সমস্যাগুলো সাধারণত রোগীর পাশে যিনি ঘুমান তিনি ভাল বলতে পারেন।
  • ঘুমের মধ্যে হাত কিম্বা পায়ে ঝিনঝিন করা, কাটা কাটা অনুভূতি হওয়া।
  • ঘুমের সময় হাত কিম্বা পা কেপে ওঠা কিম্বা খিচুনি হওয়া।
  • ঘুম থেকে জাগার পরে মাথা ব্যথা হওয়া।
  • ঘুম আসার সময় স্বপ্ন কিংবা স্বপ্নাচ্ছন্ন হওয়া।
  • ঘুমের মধ্যে অস্বাভাবিক আচরণ করা। যেমন- ঘুমের মধ্যে হেটে বেড়ানো।
  • হাসলে, কাদলে কিম্বা রেগে গেলে হঠ্যাৎ করে পেশী অবশ হয়ে যাওয়া।
  • ঘুম থেকে জাগার পর হাত পা নড়াচড়া করতে না পারা।

ঘুম সংক্রান্ত জটিল ব্যাধির সংখ্যা নগণ্য। অনেকের অতিনিদ্রা হতে দেখা যায়। অতিনিদ্রায় আক্রান্ত ব্যক্তি কয়েক দিন যাবত ক্রমাগত ঘুমান এবং তারপর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসেন।  অতিন্দ্রিার সময় আক্রান্ত ব্যাক্তি প্রতিদিন ১৬ তেকে ১৮ ঘন্টা ঘুমাতে পারেন।

এ ছাড়া নিদ্রা সংক্রান্ত কিছু রোগের নাম উল্লেখ না করলেই নয়। যেমন নিদ্রাহীনতা, নিদ্রাকালীন শ্বাস আবদ্ধতা, নিদ্রাকালীন পদচাঞ্চল্য, নিদ্রাকালীন অস্বাভাবিক আচরণ, অপ্রতিরোধ্য নিদ্রাবেগ।

নিদ্রাহীনতা একটি অতি পরিচিত সমস্যা। এর ফলে আক্রান্ত ব্যক্তির ঘুম আসে না কিম্বা ঘুমিয়ে থাকতে পারে না। অতিরিক্ত চা কপি পান, উদ্বেগ দুশ্চিন্তা ছাড়া নানাবিধ শারীরিক রোগের কারণেও নিদ্রাহীনতা হতে পারে। এ ছাড়া নিদ্রা জনিত জটিলতার জন্যেও নিদ্রাহীণতা দেখা যায়। এজন্য নিদ্রাহীনতার সমস্যাকে অবহেলা না করে একজন উপযুক্ত চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত।

নিদ্রাকালীন শ্বাস আবদ্ধতা ঃ এর ফলে রোগীর অতিরিক্ত নাক ডাকে, শ্বাস কষ্ট হয় এবং এক পর্যায়ে কিছু সময়ের জন্য রোগীর দম বন্ধ হয়ে যায়। ফলে রোগী ঘুম থেকে জেগে যায় এবং উঠে বসে, অনেকে আতঙ্কিত বোধও করেন। ঘুমানোর পর এই রকম ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে পারে। ঘুমের মধ্যে মাঝে মাঝে শ্বাস বন্ধ থাকলে মস্তিস্কের এবং শরীরের অন্যান্য অঙ্গে অক্সিজেন প্রবাহ বিঘ্নিত হয়। ফলে এ ধরনের রোগীরা সারাদনি অবসন্ন বোধ কনে এবং নিদ্রালু থাকেন। নিদ্রাকালীন শ্বাস আবদ্ধতার পরিণতি গুরুতর হতে পারে। এর ফলে রোগীর উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, কিম্বা মস্তিষ্কের পক্ষাঘাত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

নিদ্রাকালীন পদচাঞ্চল্যঃ এর ফলে আক্রান্ত ব্যাক্তি ঘুমানোর সময় পা নড়াচড়া করার একটি অদম্য ইচ্ছা অনুভব্ করেন। অনেক সময় পায়ে জ্বালাপোড়া, ঝিনঝিন করা কিম্বা ব্যথার অনুভূতি হয়। এর ফলে ঘুমের বিঘ্ন ঘটে থাকে।

নিদ্রাকালীন অস্বাভাবিক আচরণঃ অনেকেই ঘুমের ভেতর অস্বাভাবিক আচরণ করেন। কেউ ঘুমের ঘোরে হেটে বেড়ান, কথা বলেন, মাথা নাড়েন কিম্বা আতঙ্কে ঘুম থেকে জেগে ওঠে চিৎকার, হৈ ছে করেন। দ্রুত অক্ষিঘূর্ণন নিদ্রার কোন কোন পর্যায়ে ঘুমন্ত ব্যক্তি লাথি কিম্বা ঘুষি মারতে পারেন এবং এগুলো ঘুমন্ত ব্যক্তির অজ্ঞাতসারে অনিচ্ছাকৃতভাবে ঘটে থাকে।

অপ্রতিরোধ্য নিদ্রাবেগঃ এর ফলে আক্রান্ত ব্যক্তি জেগে থাকা অবস্থায় হঠ্যাৎ প্রচন্ড ঘুমের বেগ অনুভব করেন েএবং যে কোন স্থানে ঘুমে ঢলে পড়েন। অনেকে হাত পা সাময়িকভাবে অবশ হয়ে যায় এবং ঘুম থেকে জেগে ওঠার পরও অনেকক্ষণ নড়াচড়া করতে পারেন না।

অতএব বলতে হয়ে প্রাত্যহিক জীবনে পানাহারের মতো পরিমিত স্বস্তিদায়ক ঘুম অতি প্রয়োজনীয়। নির্ঘম রাত কাটানো একটি অভিশাপ। ঘুমের যে কোন ধরনের সমস্যাকে খাটো করেও দেখার অবকাশ নেই। কারণ, এর ফলে অনেক গুরুতর জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। এ ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হওয়ার পূর্বেই চিকিৎসকের পরার্শ গ্রহণ করা উচিত।

অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান

মেডিসিন বিভাগ

রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ, রাজশাহী


Leave a Reply