বিরক্তিকর চর্মরোগ একজিমা

  • 0

বিরক্তিকর চর্মরোগ একজিমা

Category : Health Tips

বিরক্তিকর চর্মরোগ একজিমা

চর্মরোগের ইতিহাসে একটা নতুন অসুখের ঝাপটা না বইলেও পৃথিবীর সর্বত্রই চর্মরোগ একটি বড় সমস্যা। ঘুরে ফিরে সেই পুরনো অসুখগুলোই নতুন রূপে দেখা দেয়। একজিমা এর মধ্যে  মারাত্মক  ধরনের চর্মরোগ।

দুশ্চিন্তা, উৎকন্ঠা ও হীনমন্যতা একজিমার একটা বড় কারণ। লাইকেন সিমপ্লেক্স জাতীয়  একজিমা এসব কারণেই বেশি হয়। চা, কফি, সিগারেট, চকোলেট বেশি খেলে, অতিরিক্ত পরিশ্রম করলে এবং ঘুমের ব্যাঘাত ঘটলেও বিভিন্ন ধরনের একজিমা হতে পারে।

এরই মধ্যে একটি নামুলার একজিমা ছোট ছোট চাকতির মতো ভিতরে দানা দানা অংশ থাকে। প্রচন্ড চুলকায়, রসও পড়ে। এটা হলে টেনশন কমিয়ে মন শান্ত রাখার সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ মত ওষুধ লাগানো প্রয়োজন।

একজিমাই কেবল নয়, টেনশন থেকে নিউরোটিক এক্সকোরিয়েশন হতে পারে। এটা হলে রোগী নিজেই নিজের ত্বকে নখ দিয়ে আঁচড়ে ক্ষতের সৃষ্টি করে, কখনও সজ্ঞানে কখনও অচেতনে। অজান্তে মাথার চুল ছেড়া রোগের নাম ট্রাইকোটিলোম্যানিয়াক। অ্যাংজাইটি ডার্মাটাইটিস অ্যাটিফ্যাক্ট রোগী উত্তেজিত হয়ে অবচেতনভাবেই ছুরি বা ধারালো কিছু দিয়ে নিজের শরীরে ক্ষত সৃষ্টি করে।

কেউ কেউ সংবেদনশীল বা স্পর্শকাতর ত্বককে একজিমা বা ডার্মাটাইটিসের জন্য দায়ী করেন। ত্বক বিশেষজ্ঞরা এ রকম ত্বক আছে বলে মনে করেন না। আসলে যে ত্বকে সহজেই চুলকানি, লালচে ভাব,  জ্বালা ইত্যাদি হয় সাধারণতঃ সেসব ত্বককে অনেকে অবশ্য ‘সংবেদনশীল ত্বক’ বলে চালিয়ে দিতে চান। তবে অনেক সময়ই সংবেদনশীল ত্বকের সমস্যা বলতে অনেকে যা ভাবেন, দেখা যায় আসলে সেগুলো একজিমা বা ওই ধরনের ত্বক সমস্যা।

আবার অনেক মহিলা, যারা নিয়মিত পারফিউম ব্যবহার করেন, তাদের ত্বকে অবশ্য কিছু কিছু সমস্যা রয়েই গেছে, এ ধরনের সমস্যায় ত্বককে অনেকে সংবেদনশীল ত্বক বলে চালিয়ে দিতে প্রয়াস পান। কিন্তু আদপে স্পর্শকাতর বা সংবেদনশীল ত্বক বলে কোন নির্দিষ্ট ধরনের ত্বক নেই, অন্তত চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা তা স্বীকার করেন না।

একজিমা (কাউর) এক ধরনের চর্মরোগ। বড্ড বিরক্তিকর। হর হামেশাই এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। হয়ত চর্মারোগীদের ৫০ ভাগেরও বেশি কাউরে আক্রান্ত হয়ে থাকে। কাউর মূলতঃ চর্মজনিত প্রদাহ। যে কোনও বয়সের যে কারোই এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ভয় আছে। ছোট ছোট লাল ফুস্কুড়ির মত এ ব্যাধি আদপে চর্ম প্রদাহ, সংক্রমণ, ঘটায় চামড়ার তন্তুতে। পেকে গলে থ্যাতলা হয়ে গেছে ফুস্কুড়ি থেকে পানি বেরোয় একে পর এক সংক্রমিত হয়। প্রকারভেদে এর ক্ষত আলাদা আলাদ চুলকায়, জ্বলে, যন্ত্রণা হয় জ্বর আসে। এমনি হরেক রকমের উপসর্গ দেখা দেয় এ রোগ আক্রান্ত হলে।

চুলকানিই রোগটির প্রথম বিরক্তিকর আক্রমণ। চুলকানি থেকে ক্ষত, খোস পাচড়ায় ভরে যায় এক সময়। পেকেগলে রস বেরোয়। নুতুন চাড়া আক্রান্ত হয়। শুষ্ক ত্বকের বেলায় বিশেষ করে অতি সংবেদনশীল চামড়া কতিপয় বিশেষ কারণে (ঠান্ডা, স্যাঁতস্যাঁতে আবহাওয়া, গ্রীষ্ম ইত্যাদি) কাষ্ঠ চুলকানি এক পর্যায়ে খোসপাচড়ায় ভরে যায়। খারাপ দাত, গলার ক্ষত,  কোষ্ঠকাঠিন্য, ডিসপেপসিয়া ইত্যাদি কারণে অনেকের শরীরে এক পর্যায়ে একজিমা বাসা বাধেঁ। শিশুদের বেলায় দাঁতের অসুখ, অখাদ্য কুখাদ্য খাওয়া, মাতৃদুগ্ধে দোষ কিংবা প্রস্রাব শুকোনো কাপড় চোপড় পরা থেকে, মেয়েদের ক্ষেত্রে অনিয়মিত ও কষ্টকর ঋতুস্রাব থেকে সাধারণতঃ একজিমা হয়ে থাকে।

একজিমা বা কাউর আসলে পাচ রকমের সংক্রামক (কনটাক্ট), অ্যাটোপিক, সেরোবিক ডিসকোয়েড ও ভেরিকোজ। প্রত্যেক রকমেরে চেনার জন্য স্বতন্ত্র উপসর্গ আছে। কনটাক্ট একজিমা কিংবা সংক্রমিত চর্মারোগ (কনটাক্ট ডার্মাটাইটিস), আদপে চুলকানজনিত। কোন বিশেষ বস্তু থেকে ব্যক্তির সংবেদনশীলতার ওপর নির্ভর করে এর সংক্রমণ প্রক্রিয়া বা অ্যালার্জিক রিঅ্যাকশন।

অ্যাটোকি একজিমা মূলতঃ বিরক্তিকর, জনসমক্ষে লজ্জায় পড়তে হয় আক্রান্ত ব্যক্তিকে।  এটাকে শিশুতোষ কাউর (ইনফ্যান্টাইল একজিমা) বলে থাকেন কেউ কেউ। সাধারণতঃ এ ধরনের একজিমা শিশু ও বাচ্চাদের মুখমন্ডলে হয়। তবে মাথা,  ঘা, কোমড়, কনুই, বগল, গোড়ালিসহ শরীরের যে কোন স্থানে এ রোগ হয়। এ ধরনের একজিমা হয়,  আবার আপনি মিলিয়ে যায়। আবার হয় আবার মিলায়। বড় হওয়ার সাথে সাথে আপনিই মিলিয়ে যায় অ্যাটোপিক একজিমা তবে খুব অল্পসংখ্যক ব্যক্তির ক্ষেত্রে এ রোগ আজীবন বইতে দেখা যায়।

সেরোবিক একজিমা সাধারণতঃ সেবাসিওস গ্রহ্নির বৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে। সেবাসিওস গ্রন্থি থেকে ত্বকের তেল নিঃসরণ ঘটে। এ ধরনের একজিমা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মাথায় হয়। এ একজিমা শুকিয়ে জমাট বেধে গেলে অবশ্য েএটা থেকে সোবিয়াসিস হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। কানের পেছনে কিংবা আশপাশে, নাকের ভাজের কোণায়, বগলে, স্তনের ভাজে (তলার দিকে), নাভি কিংবা কুচকির আশেপাশে সেরেবিক একজিমা হয়ে থাকে। স্থানভেদে এর নামকরণও করা হয়েছে আলাদা।

বাদ বাকি কাউরগুলা অবশ্য চুলকায় না। তবে ফুস্কুড়ির মত গোটা ওঠে, বিশ্রি দেখায়।

ডিসকোয়েড একজিমা মূলতঃ মুদ্রাকৃতির। সাধারণতঃ দুই থেকে চার ইঞ্চির মত বেড়ে নেয়। হাত পার তালু, উপরিভাগ কিংবা কনুইর আশেপাশে হয় ডিসকোয়েড একজিমা। মাঝেমধ্যে নিতম্বেও হয়তো দেখা যায়। ডিসকোয়েড একজিমা সাধারণ যুবক ও মাঝ বয়সীদের মধ্যেই বেশি দেখা যায়।

ভেরিকোজ একজিমা মূলতঃ স্থায়ীভাবে স্ফীতশিরা বা ভেরিকোজ ভেইন এর কারণে হয়ে থাকে। শিরারর অসুখ থেকেই এ একজিমা হয়। এ ধরনের একজিমা সাধারণত সারে না। সারা জীবন ধরে এটার ক্ষত বয়ে বেড়াতে হয়।

একজিমার রং মূলত কালচে, বাদামী এবং আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে ক্ষত সৃস্টি করে। সাধারণতঃ সহজে সারতে চায় না। ক্ষতের চারদিকে ঘটে একজিমার আধিক্য। একজিমার মধে সবচে কঠিন হচ্ছে ভেরিকোজ আলসারস।

       নেচার কিউর ট্রিটমেন্ট

একজিমা সে  যে কোনও প্রকারেই হোক না কেন, সবগুলোই সৃষ্টির প্রধান কারণ মুলত অভ্যান্তরীণ অপরিচ্ছন্নতা বা দেহের অভ্যন্তরে বিষাক্ত বস্তুর সঞ্চয়, যা রক্তের স্বাভাবিক সঞ্চালণকে ব্যাহত করে। এই বিঘ্নই শেষতক ত্বক ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে। মোট কথা রক্ত দুষণই হচ্ছে একজিমা হওয়ার মূল কারন। সুতারায় এ ব্যাধি থেকে উপশম পেতে হলে পুরোপুরি নিরামেয় পেতে হলে আক্রান্ত ব্যক্তিকে অবশ্য রক্তশোধন প্রক্রিয়ার জন্য চিকিৎসার প্রয়োজন পড়বে। মলম, লোশন কিংবা তেল অথবা ত্বকের উপরিভাগের ক্ষত হয়ত সারিয়ে ফেলতে পারে। কিন্তু রক্তে গলদ থাকলে তা নতুন করে আবির্ভুত হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যায়। রক্তে আন্তঃদুষণই হচ্ছে একজিমার প্রধান কারণ। তা ছাড়া অ্যালার্জিক শরীরে অবশ্য কসমেটিক্স, বিউটি এইডস, পারফিউম, লিপস্টিক, নেইল পালিশ, চোখের কাজল, ‍চুল রং করানোর বস্তুর ব্যবহার থেকে একজিমা হতে পারে। বেশ কিছু পোশাক, বিশেষ করে সিনথেটিক বা এই জাতীয় ছাতা, হ্যান্ডব্যাগ, ইমিটেশন জুয়েলারি থেকে এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। প্লাস্টিকের হার, দুল, চুলের ক্লিপ ও চিরুনি থেকে ত্বক আক্রান্ত হতে পারে। অ্যালার্জিক দেহী লোকদের এ কারণেই এসব ব্যবহারে সতর্ক থাকা দরকার।

নিম্নে একজিমা সারানোর জন্য কতিপয় চিকিৎসা (নেচার কিউর ট্রিটমেন্ট) পত্র সর্ম্পকে ধারণা দেয়া হচ্ছেঃ

       খাবার দাবারঃ আক্রান্তদের বেশি করে ২/৩ দিন পানি খেতে হবে। কচি ডাবের পানি দিনে ২/৪ বার খাওয়া ভাল।  যে কোন সবজির রস কিংবা যে কোন ফলের রস খেতে হবে , পানিতে মিশিয়ে। এতে অনেক সময় সঞ্চিত অভ্যন্তরীণ রক্ত বিশুদ্ধ হয়ে যেতে পারে। অতঃপর টাটকা সালাদত, ভাপ দেয়া সবজি কিংবা ফলের রস খাওয়াটা রপ্ত করে নিতে হবে। দুই থেকে তিন সপ্তাহ এসব ‘অনুপান’ ব্যবহার করতে হবে। এগুলো ব্যবহারকালে তৈলাক্ত খাবার ও লবণ সম্পূর্ণভাবে বর্জন করা দরকার। নরম খাবারের সঙ্গে অবশ্য উপযুক্ত খাবার দাবার অবশ্য চালিয়ে যেতে হবে। তবে চাপাতি খাওয়াটাই বেশি ভাল এ সময়ে।

মুক্তবায়ু সেবন

ত্বক শুকানোর সময় মুক্তবায়ু সেবন রোগীর পক্ষে উপকারী। যতটা সম্ভব উদাম শরীরে হাওয়া লাগানো ভাল। সকাল বিকেলের ফুরফুরে হাওয়া গায়ে মাখা উপযোগী। বাতাস নির্মল থাকলে হাটাচলা করতে পারে আক্রান্ত ব্যক্তিকে।

       সূর্যস্নান

চামড়ার সঙ্গে সূর্য রশ্মির বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। আর এ কারণেই দিনে কম করে হলেও আক্রান্তদের জন্য ৩০ তেকে ৪০ মিনিটের সূর্যস্নান অতীব জরুরী। কচি ডাব থেকে মালাই তুলে আক্রান্তদের গায়ে মাখা ভাল।

দরকার মানসিক বল

এসব প্রকৃতিগত চিকিৎসার পাশাপাশি রোগীকে অবশ্য হাসিখুশি থাকতে হবে। মনে জোর আনতে হবে। রোগী বলে মনে জোর কমানো কখনোই উচিত নয়। রোগীর সার্বক্ষনিক পরিচর্যাকারীদেরও তাদের খুশি রাখার মত পরিবেশ তৈরি করতে হবে। রোগ ব্যাধির কারণে তাদের ঘেন্না করা খুবই খারাপ। প্রাত্যহিক পূজা অর্চনা, যোগানসহ স্ব স্ব ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে হিন্দু মুসলমান পালন করলে মন প্রফুল্ল থাকে। আর তাতে রোগ বালাই খুব সহজে ‍দূর হয়।


Leave a Reply