বয়ঃসন্ধিকাল – লাজুক বয়সের নাজুক স্বাস্থ্য

  • 0

বয়ঃসন্ধিকাল – লাজুক বয়সের নাজুক স্বাস্থ্য

বয়ঃসন্ধিকাল – লাজুক বয়সের নাজুক স্বাস্থ্য –

লাজুক লাজুক চেহারার কিশোরী বয়সে নিজের অজান্তেই স্বাস্থ্যের কিছু পবরবর্তন ঘটে। জানা অজানার দোলাচলে ভোগে কিশোরী মন। এই সময়ে শরীরবৃত্তিক কিছু ঘটনা সম্পর্কে জানা থাকলে অহেতুক ভীতিজনিত মানসিক সমস্যা তো দূরই হয়। কিশোরী স্বাস্থ্যের সঠিক পরিচর্যাও নিশ্চিত করা যায়। এই বিষয় নিয়েই বিস্তারিত প্রতিবেদন: 

ডা. মাসুদা বেগম

হেমাটোলজি বিশেষজ্ঞ

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

দুপুর বেলা করবীর মা ব্যস্ত রান্নাঘরে এমন সময় কলিংবেলে শব্দ। মহাবিরক্ত উনি, ভাবছেন তাড়াতাড়ি

Teenage

Teenage

রান্নাশেষে ইভিনিং শিফটে বাচ্চাকে নিয়ে স্কুলে যেতে হবে। দরজা খুলে অবাক বিষ্ময়ে দেখেন আয়া করবীকে নিয়ে হাজির। মেয়ের কান্না ভেজা মুখ দেখে উনি ঘাবড়ে গেলেন, তাড়াতাড়ি মেয়েকে ভেতরে এনে বসলেন। তারপর আয়ার মখ থেকে শুনলেন করবীর প্রথম বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়ার কথা। মা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন।

অথবা ধরুন দীপাবলির কথা, বাড়ির সবাই ঘুম থেকে উঠে পড়েছে দীপালি ‍উঠছে না দেখে মা রাগ করে তেড়ে এলেন স্কুলের বেলা হয়ে যাচ্ছে। এসেই দেখেন মেয়ে কাদছে কি ব্যাপার! দীপালী কাঁদো কাঁদো হয়ে বললো, তার পরনের কাপড়ে কোথা থেকে যেন রক্তের দাগ লেগেছে। মা হেসে ভাবেন তার কিশোরী মেয়ে বয়ঃপ্রাপ্ত হয়ে গেছেন। এ রকম বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে কমবেশী সব কিশোরী মেয়ের মায়েরাই পড়েন যখন কিশোরী মেয়ের মায়েরাই পড়েন যখন কিশোরী থেকে মেয়েরা বয়ঃপ্রাপ্ত হয়ে রজঃশীল হয়।

বয়ঃসন্ধিকাল শব্দটা এসেছে ল্যাটিন ভাষা তেকে। এটা এমন একটা সময় যখন মানব মানবী তাদের নিজেদের মতো করে একজনকে তৈরি করতে সক্ষম হয়। মেয়েদের বেলা পিউবারটি শুরু হয় ১২ বছর থেকে। প্রথম উপসর্গ হচ্ছে রজঃশীল। এটা গ্রিক শব্দ হচ্ছে মাসিক শুরুর প্রথম মাস। এ সময় মস্তিস্কের পিটুইটারি গ্রহ্নির রস নিঃসরণের ফলে শারীরিক পরিবর্তন হয়। হঠাৎ করে মেয়ে লম্বা হয়ে যায় এবং বুকের মাপ ভারী হতে থাকে। শিশু মেয়ের অবশ্য দুধের বোটা তিন বছর বয়স থেকে একটু একটু করে ভারী হতে থাকে। ছয় আট বছরের মধ্যে হাত পা গোলাকৃতি এবং তুলতুলে আকার ধারণ করে। ৭-১১ বছরের মধ্যে নিতম্ব চওড়া হয় এবং বুক পুরোপুরি বয়স্ক মেয়েদের মতো হয় ১২ বছরের পর তেকে। শরীরের বিশেষ বিশেষ জায়গায় চর্বি জমা হয়ে দেহের আকার পরিবর্তন করে দেয়।

Health of Teen Age

Health of Teen Age

মেনারকি শুরু হয় সাধারণত ১০-১৬ বছরের মধ্যে। অব্শ্য এর তারতম্য হয়ে থাকে সামাজিক, পারিবারিক, পারিপার্শ্বিক, খাদ্য গ্রহণ এবং আবহাওয়া ও জাতিগত অবস্থানের জন্য। মাসিক সমাজের উ্চ্চবিত্ত শ্রেণীর মেয়েদের একটু আগে হয় নিম্নব্ত্তি শ্রেণীর মেয়েদের চেয়ে। পিউবার্টি এবং অ্যাডোলেসেন্স এই সময়টার মধ্যে মেয়েদের মানসিক পরিবর্তন বেশ লক্ষ্যণীয়। হঠাৎ করে কিশোরী মেয়ে ভাবতে থাকে সে বড় হচ্ছে, এখন তার স্বাধীন মতামত দেয়ার সময় হয়েছে। কারো শাসন মানতে রাজী নয় এখন সে। নিজের প্রতি অত্যধিক আকর্ষণ বোধ করে আয়নায় খুটিয়ে খুটিয়ে দেখে সে নিজেকে আবিষ্কার করে। স্বভাবটা একটু উচ্ছৃঙ্খল ধরনের সব সময় একটু ডিয়ারিং টাইপের হয়্ মায়ের চেয়ে বান্ধবীর প্রতি নির্ভরতা বেশি হয় এবং যৌন আর্কষণ বোধ করতে থাকে। কখনো কখনো দেখা যায়, মেয়েরা এ সময় সমকামী হয়ে পড়ে, তার প্রথম লক্ষণ হচ্ছে তার থেকে বয়স্ক কোন মহিলার প্রতি অত্যধিক আকর্ষণ অনুভব করা অথবা অকারণে আবেগ প্রবণ হয়ে পড়া। অবশ্য এই অবস্থাটা দ্রুত পরিবর্তিত হয়ে যায়।

Puberty – সময় অনেক মেয়েরই মুখে ব্রণ হয়ে থাকে অথবা একটু লজ্জাজনক পরিস্থিতিতে পড়লে চোখ মুখ লাল হয়ে যায়। এগুলো নিয়ে ঘাবড়ানোর কোনো কারণ নেই, আন্ড্রেজেন নামক হরমোনের জন্য এসব হয়ে থাকে।

মাসিকের কি কি উপসর্গ হতে পারে

প্রথম মাসিকের শুরুতে তলপেট, নিতম্বে কাল করে নেয়া ব্যাথা হবে মাসিক শুরুর দুদিন আগে থেকে। থাকবে শুরু থেকে দুইদিন। অনেকের প্রচন্ড মাথাব্যাথা হয় আবার কারো কারো বমিও হয় । মাসিক শুরুর আগে আবার অনেকেই ভোগেন বিষণ্নতায় বা দুর্বলতায় অথবা খিটখিটে মেজাজের হয়ে যায়। তবে এই উপসর্গগুলো সবই সাময়িক। প্রতি মাসিকের মধ্যে রক্তপাত হয় ৫-৬০ মিলি লিটার। গড়ে ৩৫-৪৫ মিলি লিটার। এক মাসিক থেকে আরেক মাসিকের মধ্যবর্তী সময় হচ্ছে ২৮ দিন কিন্তু তিন পাঁচ সপ্তাহের প্রতি সাইকেলকে স্বাভাবিক ধার হয়। প্রথম মাসিকের সময় অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় কম হয়। আবার কখনো কখনো অনিয়মিত হয়ে থাকে। যেমন একবার হলো তারপর এক বছর অথবা দুই বছর হলো না। এটা স্বাভাবিক ব্যাপার, নিয়মিত হতে প্রায় দুই বছর সময় লাগে। আমাদের দেশে অনেক মাই মেয়েকে এ সময় সমস্ত কাজকর্ম থেকে অব্যাহতি দেন এমনকি স্কুলেও পাঠান না। এটা ঠিক নয়, বাচ্চাকে স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে দেন। স্কুলে পাঠান স্বাভাবিক নিয়মে জীবনযাপন করবে। অনেকে ভাবেন এটা অশুচিকর একটা ব্যাপার, শরীর থেকে দুষিত পদার্থ বেরিয়ে যাচ্ছে। মাসিকের রক্ত শরীরে প্রবাহিত রক্তেরই একটা অংশ সঙ্গে থাকছে শ্লেষ্মা। েএর বিশেষ গন্ধটা হচ্ছে জীবানুর বংশ বৃদ্ধির জন্য। বিধাতার সৃষ্টি সুন্দরী এক মানবীর ‍শুধুই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া ভিন্ন অন্য কিছু নয়।

বয়ঃসন্ধিকালের কিছু সমস্য

তাড়াতাড়ি মাসিক হওয়া : ১০ বছরের পূর্বে মাসিক হওয়ার সঙ্গে সেকেন্ডারি সেস্কুয়াল বৈশিষ্ট্য যেমন Breast Develop হওয়া ইত্যাদি। এগুলোকে বলি Precious puberty. ৯০ ভাগ ক্ষেত্রেই এর কোনো কারণ খুজেঁ পাওয়া যায় না। এমনও দেখা যায়, দুই তিন বছরের মধ্যে মাসিক হয়ে গেছে।

এক্ষেত্রে হাইপোথ্যালামাসে ক্ষত এজন্য দায়ী কিছু কিছু ওষুধ এবং ডিম্বাশয়ের টিউমার ও  প্রিকশিয়াস পিউবার্টির জন্য দায়ী। প্রিকশিয়াস পিউবার্টির পাঁচ বছরের শিশুও জন্মদানে সক্ষম হয়।

দেরীতে মাসিক হওয়া :

অনেক মেয়েরই ১৬ বছরের আগে মাসিক হয় না এবং শরীরের অন্যান্য অঙ্গ প্রতঙ্গ যা মাতৃত্বের জন্য দরকার তা তৈরি হয় না। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেখা গেছে,তারা স্বাভাবিকভাবেই বাচ্চা তৈরিতে সক্ষম এবং প্রতিমাসে মাসিক হচ্ছে।

মোটা হওয়ার প্রবণতা :

বয়:সন্ধিকালে হঠাৎ করেই দেখা যায়, মেয়ে বা ছেলে মোটা হয়ে শরীর তুলতুলে হয়ে গেছে। চামড়া ফেটে ফেটে যাচ্ছে নিতম্বে। বহুর ওপরের দিকে, বুকের মাংসপেশীতে শরীরে প্রথমে দিকে এগুলো গোলাপি হয়ে থাকে পরে সাদা হয়ে যায়। মোটা সাধারণত অতিরিক্ত শর্করা জাতীয় খাবারের জন্য। ২০ বছর হলে আস্তে আস্তে ক্ষুধা কমে যায় তখন মোটা হওয়ার প্রবণতাও কমে আসে। অনেকের ক্ষেত্রে কঠোর খাদ্য নিয়ন্ত্রনের প্রয়োজন হয়। মাসিক শুরু হলে মা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন এই ভেবে যে, এবার তার মেয়ে পরিপূর্ণ হলো।

বয়ঃসন্ধিকালের কিশোরীদের স্বাস্থ্য পরিচর্যায় বাবা মায়ের করণীয় বিষয়ে প্রতিবেদন।


Leave a Reply