ভিটামিন –এঃ অপুষ্টিজনিত অন্ধত্ব ও প্রতিরোধ

  • 0

ভিটামিন –এঃ অপুষ্টিজনিত অন্ধত্ব ও প্রতিরোধ

Category : Health Tips

ভিটামিন –এঃ অপুষ্টিজনিত অন্ধত্ব ও প্রতিরোধ

ডাঃ এস কে অপু

খাদ্যের বিভিন্ন উপাদানের অভাবের কারণেই শিশুরা অপুষ্টিতে ভুগে। তেমনি আমাদের দেশে ভিটামিন এ এর অভাবের কারণে শিশুরা মারাত্মক পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। এই পুষ্টিহীনতার প্রধান উপসর্গ ও রোগ হচ্ছে রাতকানা এবং অন্ধত্ব।

প্রায় পনের বছর পূর্বে শিশুদের অপুষ্টিজনিত অন্ধত্বের উপর িএক জরিপে দেখা যায়, অপুষ্টির কারণে প্রতিবছর ১ থেকে ৬ বছর বয়সী শিশুদের ৩.৭৬% রাতকানা রোগের শিকার। অর্থ্যাৎ প্রায় ১০ লাখ শিশু। গড়ে প্রতিদিন ১শ টি শিশু আক্রান্ত হচ্ছে রাতকানায়।

কিন্তু গতবছর অক্টোবর মাসে এক সার্ভে রিপোর্ট থেকে জানা যায়, বাংলাদেশ প্রতিবছর ১ থেকে ৬ বছর বয়সী প্রায় সাড়ে ৩ লাখ শিশু রাতকানায় আক্রান্ত হচ্ছে। এ সংখ্যা ৯ বছর পর্যন্ত মোট শিশুর প্রায় ১.৩%।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ১ থেকে ৬ বছর বয়সী মোট শিশুর ১% যদি রাতকানায় ভুগে তবে তা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় সমস্যা এবং আতংকজনক পুষ্টিহীনতা।

বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১০ লাখ শিশু অন্ধ। রাতকানায় ভুগে প্রতিবছর ধীরে ধীরে অন্ধত্ব বরণ করে নেয় প্রায় ৩০ হাজার শিশু। এই অন্ধত্ব কোন শিশুর জীবনে হঠাৎ করেই নেমে আসে না। এর একমাত্র কাণ শিশুর দেহে ভিটামিন এ এর অভাব (যা দেহে ক্রমাগত ঘাটতি থেকেই প্রথমে রাতকানা এবং পরে অন্ধত্বে রূপ নেয়)।

ভিটামিন এ এর কাজঃ কিন্তু এ ভিটামিন দেহে কী কাজ করে তা জানা প্রয়োজন এর প্রধান কাজই হলো চোখের দৃষ্টিশক্তি সুস্থ রাখা এছাড়া দেহের ভেতর ও বাহিরের আবরণী বা ঝিল্লিকে সুস্থ রাখে শ্বাসনালী ও খাদ্যনালির ঝিল্লির স্বাভাবিকতা থাকে এবং সহজ শিশুরা বিভিন্ন রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ শক্তি গড়ে তোলে। রক্তের স্বাভাবিক অবস্থা বজায় রাখতে, কিডনি এবং মুত্রাশয়ের স্বাভাবিক সুস্থতার জন্য, স্ত্রী পুরুষের সন্তান ধারনের ক্ষমতা বৃদ্ধিতে, খাদ্য দ্রব্য পরিপাক, হাড়, দাঁত এবং ত্বকের গঠনে অর্থ্যাৎ স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও পুষ্টি বজায় রাখতে ভিটামিন এ কাজ করে।

দৈনিক প্র্রয়োজনঃ বয়স, লিঙ্গ এবং অবস্থাবেদে ভিটামিন এ এর মাত্রা নির্ভর করে। ছোট্র শিশুদের ক্ষেত্রে দৈনিক ‘ভিটামিন এ’ প্রয়োজন ১৪০০ – ২০০০ আইইউ। বড় শিশুদের প্রায় ২৫০০ আইইউ। বড়দের ক্ষেত্রে প্রায় ৪০০০ আইইউ। কিন্তু গর্ভবর্তী মায়েদের ও স্তন্যদানকারী মায়েদের ভিটামিন এ প্রয়োজন প্রতিদিন যথাক্রমে ৫০০০ আইইউ এবং ৬০০০ আইইউ।

ভিটামিন এ এর উৎসঃ প্রধান উৎসই হচেছ  খাদ্য। যেমন, সবুজ শাকসবজি, পালংশাক, কচুশাক, ডাটাশক, সজনেশাক, লালশাক, কলমীশাক, লাউশাক, পুইশাক, মিষ্টিকুমড়া, মিষ্টি লাউ, হলুদ ফলমুল পাকা আম, পাকা পেঁপে, গাজর, কাঠাল, দুধ, ডিমের কুসুম, ছোট মাছ, কলিজা, তৈলাক্ত মাছ ইত্যাদি। এছাড়া মায়ের দুধেও প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ আছে।

ভিটামিন এ এর অভাবের কারণঃ  বাংলাদেশেতো পুষ্টির অভাব নেই। চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পুষ্টি শাকসবজিতে। শিশুর জন্য প্রচুর পরিমাণে বুকের দুধ ও শালদুধে। তাপরেও শিশুরা পুষ্টিহীণতার শিকার।

শিশুদের দেহে ভিটামিন এ এর অভাবের কারণগুলোঃ

১। মায়েদের খাদ্যে শাকসবজির অভাবে এবং শিশুদেরকে বুকের ‍দুধ না খাওয়ানো।

২। দেহের চাহিদা অনুযায়ী শাকসবজি, ফলমূল কম খাওয়ানো।

৩। দেহে চাহিদার তুলনায় তেলজাতীয় খাদ্য কম থাকার ভিটামিন এ ঠিকমতো শোষিত না হওয়া।

৪। নিউমোনিয়া, হাম, ডায়রিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের খাদ্যদ্রব্য ঠিকমত। হজম না হওয়ায় গ্রহনকৃত খাদ্য থেকে ভিটামিন এ না পাওয়া এবং যকৃতে সঞ্চিত ভিটামিন এ দেহের প্রয়োজনে ক্রমে ক্রমে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া।

৫।  ত্রুটিযুক্ত রন্ধন প্রণালীর কারণে অর্থ্যাৎ শাকসবজি কেটে ধোয়ার ফলে পানির সাথে প্রচুর ভিটামিন এ চলে গেলে।

৬। রান্না করা শাকসবজিতে তেল ব্যবহার না করাতে ভিটামিন এ দেহে ঠিকমত হজম না হওয়াতে।

৭। মায়েদের পুষ্টি বিষয়ক অজ্ঞতা, ভ্রাণ্ত ধারণা ও কুসংস্কার।

৮। অজ্ঞাতবশত অধিকাংশ মা শালদুধ ফেলে দিলে পরবর্তীতে ঠিকমত শিশুকে বুকের দুধ না দেয়া এবং

৯। দরিদ্রতা

অভাবজনিত রোগঃ ভিটামিন এ এর অভাবেই শিশুরা প্রথম রাতকানায় ভোগে। রাতে দেখে না। আলোতে ভীত চোখের অস্বচ্ছতা অংশে প্রদাহ, ক্ষত বা দাগ অর্থ্যাৎ বিটটস স্পষ্ট দেখা যায়। চোখের স্বচ্ছ অংশে ঘা এবং দাগ হয়ে শিশু অন্ধ হয়ে যায়। এছাড়া রুক্ষ শুষ্ক ত্বক এবং ফুসফুসের রোগ বাড়ে। শিশু বৃদ্ধি পায় না। চোখের ‍দৃষ্টিশক্তি ঠিক রাখতে চোখের রেটিনা ও কর্নিয়ার স্বাস্থ্য রক্ষায় এপিথেলিয়াল টিস্যুর গঠনে ভিটামিন এ এর কাজ গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতিরোধঃ  ‘ভিটামিন এ’ অভাবজনিত অপুষ্টি ও অন্ধত্ব প্রতিরোধের উপায় হচ্ছে মায়েরা গর্ভকালীন এবং স্তন্য দানকালে নিত্যদিনের খাদ্য তালিকায় প্রচুর পরিমাণে গাঢ় শাক সবজি, রঙ্গিন ফলমুল থাকেলে ‘ভিটামিন এ’ অভাব পূরণ হবে। শিশু জন্মের পরপরই শিশুকে মায়ের বুকের শালধুধ দিতে হবে এবং কমপক্ষে দু বছর বয়স পর্যন্ত মায়ের বুকের দুধ দিতে হবে।

বাড়ন্ত শিশুদেরকে ভিটামিন এ সমৃদ্ধ খাদ্যদ্রব্য দিতে হবে মায়ের বুকের দুধের পাশাপাশি।

ডায়রিয়া, হাম বা নিউমোনিয়া হলে স্বাভাবিক খাদ্যের সাথে অতিরিক্ত পরিমাণ ভিটামিন এ সমৃদ্ধ খাবার দিতে হবে। প্রয়োজনে ভিটামিন এ ক্যাপসুল দেয়া যায়।

ভিটামিন এ ক্যাপসুলঃ প্রতিটি ক্যাপসুলের শক্তি হচ্ছে ২ লাখ ইউনিট। প্রতি ফোটায় থাকে ২৫ হাজার আইইউ। ভিটামিন এ এর অভাব রোধ করার জন্য একবছর বয়সের নীচে শিশুকে একটি ক্যাপসুলের মুখ কেটে ডি পিটি এর ১‘ম, ২য় ও ৩য় ডোজ এবং হামের টিকা দেয়ার সময়। মোট চারবার দু ফোটা (৫০ হাজার আইইউ) করে খাইয়ে দিতে হবে।

একবছর থেকে ৬ বছর বয়সী শিশুকে ৬ মাস পর পর একটি করে ভিটামিন এ ক্যাপসুল দিতে হবে।

চিকিৎসাঃ কিন্তু ‘ভিটামিন এ’ এর অভাবজনিত অন্ধত্বের প্রথম উপসর্গ রাতকানা দেখা দেয়া মাত্রই সেই শিশুকে ভিটামিন এ ক্যাপসুলের মাধ্যমে চিকিৎসা করাতে হবে। না হলে শিশুদের উজ্জ্বল  দৃষ্টিশক্তি নিয়ে বেচে থাকার সম্ভাবনা কম। এ অবস্থায় শিশুকে ২ লাখ ইউনিটের ভিটামিন এ ক্যাপসুল ১ম ও ২য় দিন একটি করে খাওয়াতে হবে। এক থেকে ২ সপ্তাহের আরেকটি ক্যাপসুল খাওয়াতে হবে।

‘ভিটামিন এ’  শুধু রাতকানা ও অন্ধত্বজনিত সমস্যাই দূর করে না, ডায়রিয়া, হাম ও নিউমোনিয়া দূর করতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। এছাড়া সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা যায় দেহে আদর্শ মাত্রায় ভিটামিন এ শিশু মৃত্যুর হার ২৩ থেকে ৪৫ ভাগ হ্রাস করে।

আমাদের দেশে এই ভিটামিনের অভাবজনিত সমস্যায় প্রধান ভুক্তভোগী অংশ ১-৬ বছরের শিশুরা। যার বেশিরভাগ নিরক্ষর ও দরিদ্র পরিবারের।

আগামী ২০০০ সালের মধ্যে ভিটামিন এ অভাবজনিত সমস্যা নির্মূল এবং শিশু মৃত্যুর হার হ্রাস করার লক্ষ্যে দেশে প্রায় পৌনে দু কোটি শিশুকে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ‘ভিটামিন এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো হচ্ছে।


Leave a Reply