মরবেন না, কারণ মৃত্যু নেই

  • 0

মরবেন না, কারণ মৃত্যু নেই

Category : Health Tips

মরবেন না, কারণ মৃত্যু নেই

রবার্ট ল্যাঞ্জা

এমডি, বায়োসেন্ট্রিজম

অ্যাডভান্সড সেল টেকনোলজির প্রধন সায়েন্টিফিক অফিসার

একদিন আমরা জেনে এসেছি, আমরা স্রেফ সেলের সমষ্টি এবং শরীরটা মারা গেলে আমরাও মারা যাব। কাহিনী শেষ। কিন্তু নতুন সব বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নিরীক্ষার লম্বা একটা তালিকা থেকে জানা যাচ্ছে মৃত্যু সম্পর্কে আমাদের সিদ্ধান্ত ভূল ধারনার ওপর প্রতিষ্টিত, জানা যাচ্ছে আমরা যেমনটি চিন্তা করি মৃত্যু মানেই সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তির সর্বশেষ ঘটনা, তা সত্যি নয়।

এখানে পাচটা কারণ উপস্থাপন করা হলো, যে কারণে আপনি মরবেন না।

প্রথম কারণঃ আপনি মোটেও কোনো বস্তু নন, আপনি বিশেষ একটা অস্তিত্ব। বায়োসেন্ট্রিজম অনুসারে চেতনা বা সজ্ঞনতা ছাড়া কিছুই অস্তিত্ব পেতে পারে না। মনে রাখবেন ব্রেনকে ঘিরে থাকা হাড়ের ভেতর আপনার দৃষ্টি চলে না। বিস্তৃতি ( স্পেস) আর সময় বস্তু নয়, বরং আমাদের মন সবকিছু বুনে এক করার জন্য এগুলোকে যন্ত্রপাতি (টুলস) হিসেবে ব্যবহার করে।

‘ এই ব্যাপারটি আগামী দিনগুলোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ যে, বলেছেন ইউজিন উইগনার, ১৯৬৩ সালে ফিজিক্সে নোবেল প্রাইজ জেতা বিজ্ঞানী, ‘ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আমাদের ধ্যান ধারণা যে পথ ধরেই গড়ে উঠুক না কেন,  বাইরের  জগৎ সর্ম্পকে জ্ঞান আহরণ এবং পরীক্ষা নিরীক্ষা এই উপসংহারে গিয়ে ঠেকবে যে, চেতনা বা সজ্ঞানতা যা ধারণ করে সেটাই চূড়ান্ত বাস্তবতা।

অনিশ্চয়তা থিওরি বা নীতি নিয়ম বিবেচনা করুন, কোয়ান্টাম মেকানিক্সের সবচেয়ে নামকরা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবয়বগুলোর একটা। এক্সপেরিমেন্ট নিশ্চিত করেছে  বাস্তবতার কাঠামো ভেতরই ওটা তৈরি, তবে বোধগম্য হয় শুধু বায়োসেন্ট্রিক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে, অর্থ্যাৎ  বিষয়বস্তুর উচ্চতা, দৈর্ঘ্য, গভীরতা, অবস্থান ও দুরুত্ব অনুসারে। মহাশূন্যের কোথাও যদি চারদিকে লাফিয়ে বেড়ানো কণাসহ একটা পৃথিবী থাকে, তাহলে  এগুলো সর্ম্পকে যা কিছু জানার সবই আমাদের জানতে পারা উচিত। কিন্তু তা আমরা পারি না। আপনি কী মাপজোক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, একটা কণার কাছে কেন সেটা  একটা বিষয় হবে ? ডাবল স্লিট  এক্সপেরিমেন্ট বিবেচনা করুন: ধরুণ, অণুর চেয়ে ছোট একটা কণা (স্যাবঅ্যাটমিক পার্টিকেল) বা ওই পরিমাণ একটু আলো কোনো বাধার গায়ে তৈরি ফাটলের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে, ওটার ওই যাওয়ার ওপর কেউ যদি ‘নজর রাখে’ তাহলে ওটা একটা কণাসুলভ আচরণ করবে এবং এই নির্দিষ্ট ফাটলের পেছনের সর্বশেষ বাধায় পৌছে নিরেটদর্শন আঘাত করবে, যে বাধা মাপ নেবে ওই সংঘর্ষের। একটা বুলেটের মতো, যুক্তি মেনে ওটা হয় প্রথম কিংবা দ্বিতীয় ফাটলের ভেতর দিয়ে ছুটবে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা যদি কণার গমণপথ বা গতিপথের ওপর নজর না রাখেন, তাহলে সেটা তরঙ্গের আচরণ প্রদর্শন করে, সেটা ওই কণাকে একই সময়ে দুটো গর্তের ভেতর ঢোকার সুযোগ করে দেয়।

কী ঘটবে সেটা আমাদের পর্যবেক্ষনের কারণে বদলে যায় কেন ? কারণ বাস্তবতা একটা পদ্ধতি, আর সেটার সজ্ঞানতা প্রয়োজন।

ডাবল স্লিট এক্সপেরিমেন্ট কোয়ান্টাম শক্তি আর সাফল্যের একটা উদাহারণ, তবে যেসব এক্সপেরিমেন্ট বাকিবল আর কেএইচসিও ৩ ক্রিস্টাল ব্যবহার করা  হয়েছে তাতে দেখা গেছে পর্যবেক্ষণ নির্ভর আচরণ অনেক সাধারণ পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত, যেমন মানুষের ছাল সংশ্লিষ্ট জগৎ। গবেষকরা সম্প্রতি দেখিয়েছেন  একজোড়া আয়নকে প্রভাবিত করে পরষ্পরের সঙ্গে প্যাচানো যায় এগুলোর শারীরিক বৈশিষ্ট্য যাতে এক থাকে, এমনকি মাঝখানে অনেক দুরুত্ব রেখে বিচ্ছিন্ন করার পরও, যেন ওগুলোর মাঝখানে বিস্তৃতি বা সময় নেই। কেন ? কারন বিস্তৃতি আর সময় কঠিন, ঠান্ডা কোনো বস্তু নয়। এগুলো শুধু আমাদের বুঝতে সুবিধা করে দেয়ার সরঞ্জাম মাত্র।

একটা সময়বিহীন, বিস্তৃতিবিহীণ দুনিয়াতে মৃত্যুর অস্তিত্ব থাকতে পারে না। পুরনো বন্ধু মারা যাওয়ার পর আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছিলেন: ‘ বেসো  এখন এই আশ্চর্য দুনিয়া তেকে আমার অল্প কিছু আগে বিদায় নিল। এটা কিছুই আগে বিদায় নিল। এটা কিছুই বোঝায় না। আমাদের মতো মানুষরা জানি যে অতীত বর্তমান আর ভবিষ্যতের মধ্যে আছে শুধু গোয়ারের মতো চেপে থাকা একটা মায়া। সত্য হলো, আপনার মন বিস্তৃতি আর সময়কে ছাড়িয়ে যায় অভিজ্ঞতা,  যুক্তি, বিশ্বাস ইত্যাদি সবকিছুকে পেছনে ফেলে।

দ্বিতীয় কারণঃ শক্তির বিনাশ নেই, বিজ্ঞানের এটি একটি মৌলিক স্বতঃসিদ্ধ বিষয়, প্রমাণের অপেক্ষা রাখে না। থার্মোডাইনামিক্সের প্রথম আইনই বলছে যে, শক্তি ( এনার্জি) না তৈরি করা যায়, না ধ্বংস করা যায়। ওটার শুধু রূপ বদল ঘটে। যদিও শরীর নিজেই নিজেকে ধ্বংস  করে, কিন্তু ‘আমি’ অনুভূতি স্রেফ ২০ ওয়াট এনার্জি নিয়ে আপনার মাথার ভেতর একটা মেঘ। এবং যেহেতু এনার্জি বা বলের ধ্বংস নেই, আপনার মৃত্যুর সঙ্গে সেটা চলে যাচ্ছে না। বছর কয়েক আগে একদল বিজ্ঞানী দেখিয়েছেন অতীত পর্যালোচনার মাধ্যমে ওই সময় যা ঘটে গেছে তা তারা বদলে দিতে পারেন। কণাগুলোকে সিদ্ধান্ত নিতে’ হয়েছিল একটা অ্যাপরেইটাসে থাকা সংযোগস্থল পার হওয়ার সময় কী আচরণ করবে ওগুলো। পরের বার, পরীক্ষক দ্বিতীয় সুইচটা অন বা অফ করতে পারেন।

ফলাফলে দেখা যাবে, পর্যবেক্ষক ওই পর্যায়ের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সেটাই ঠিক করে দিয়েছিল অতীতে কণাটা সংযোগ স্থলে কী আচরণ করেছিল।

চিন্তা করুন ২০ ওয়াট  এর্নাজি একটা প্রজেক্টরকে শক্তি জোগাচ্ছে। একটা পরীক্ষায় আপনি সুইচ অন করুন বা অফ করুন,  প্রজেকশনের জন্য দায়ী ওই সেই একই ব্যাটরি। ডাবল স্লিট এক্সপেরিমেন্ট যেমন, আপনার পতন শারীরিক বাস্তবতা। মৃত্যুর সঙ্গে এই এনার্জি পরিবেশের মধ্যে মিলিয়ে যায় না, পুরনো যান্ত্রিক যুগে দুনিয়ার সবাই যেমনটি ধারণা দিত। আপনাকে ছাড়া ওটার নিজস্ব কোনো বাস্তবতা নেই। আইনস্টাইনের শ্রদ্ধেয় সহকর্মি জন উইলার কী বলেছেন স্মরণ করুনঃ কোনো ঘটনা বাস্তাবিক কোনো ঘটনা নয় যতক্ষণ না সেটা পর্যবেক্ষিত একটা ঘটনা।’ প্রতিটি মানুষ নিজস্ব বাস্তবতার একটা জগৎ তৈরি করে নেয় আমরা বিস্তৃতি আর সময়কে কচ্ছপের ছালের মতো সঙ্গে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি। কাজেই অবিমিশ্র এমন কোনো সেলফ এগজিস্টিং ম্যাট্রিক্স নেই যেখানে এনার্জি স্রেফ মিলিয়ে যাবে।

এতদিন আমরা জেনে এসেছে, আমরা স্রেফ সেলের সমষ্টি এবং শরীরটা মারা গেলে আমরাও মারা যাব। কাহিনী শেষ। কিন্তু নতুন সব বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নিরীক্ষার লম্বা একটা তালিকা থেকে জানা যাচ্ছে মৃত্যু সম্পর্কে আমাদের সিদ্ধান্ত ভূল ধারণার ওপর প্রতিষ্টিত, জানা যাচ্ছে আমরা যেমনটি চিন্তা করি মৃত্যু মানেই সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তির সর্বশেষ ঘটনা, তা সত্যি নয়

তৃতীয় কারণঃ যদিও গল্প কাহিনীতে পড়ার সময় সন্তারাল বিশ্বের ধারণা সাধারণত আমরা বাতিল করে দিই, কিন্তু এটার পক্ষে বৈজ্ঞানিক সত্যের পরিমাণ মোটেও নগন্য নয়। কোয়ান্টাম ফিজিক্সের সুপরিচিত একটা সিধান্ত হলো পর্যবেক্ষণ আগে থেকে পুরোপুরি আন্দাজ করা সম্ভব নয়। পরিবর্তে, সম্ভাব্য অনেকগুলো পর্যবেক্ষণ রয়েছে, প্রতিটি আলাদা সম্ভাব্যতা নিয়ে। একটি মূলধারার বক্তব্য হলো, এটা থোক ‘বহুবিশ্ব’ ধারণা জন্মায়, যাতে ব্যাখা করা হয় এসব সম্ভাব্য পর্যবেক্ষণ একটা করে আলাদা বিশ্বের সঙ্গে খাপ খায় (বহুবিশ্ব)। বলা হচ্ছে এ রকম অসংখ্য বিশ্ব রয়েছে (আমাদের বিশ্বসহ), যেগুলো একসঙ্গে তৈরি করেছে প্রাকৃতিক নিয়ম কানুন, অর্থ্যাৎ বাস্তবতা। যা কিছু ঘটার সম্ভাবনা আছে তার সবই কোনো না কোনো বিশ্বে ঘটছে। এ রকম একটা কাঠামোর ( বা চিত্রনাট্য) ভেতর সত্যিকার অর্থে মৃত্যুর অস্তিত্ব থাকে না। সম্ভাব্য সবগুলো বিশ্ব একই সময়ে অস্তিত্ব ধারণ করে আছে, ওগুলোর যেকোন একটায় যাই হোক ঘটুক না কেন। ওপরে বলা এক্সপেরিমেন্টের সুইচের মতো, আপনিই সেই এজেন্ট যিনি ওগুলোর অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যাবেন।

চতুর্থ কারণঃ আপনি আপনার সন্তান, বন্ধু বান্ধব এবং আপনার জীবদ্দশায় যারা আপনাকে স্পর্শ করেছে তাদের মাধ্যমে বেচে থাকবেন, শুধু তাদের একটা অংশ হয়ে নয়, বরং যেসব ইতিহাসের মধ্যে দিয়ে আপনার পতন ঘটেছে এবং যেসব কাজ আপনি করেছেন, সবকিছুর মধ্যে। ‘কোয়ান্টাম ফিজিক্স অনুসারে’ ফিজিসিস্ট স্টিফেন হকিং এবং লিয়নার্দ স্লোডিনাও বলেছেন, ‘অতীত, ভবিষ্যতের মতোই, অনিশ্চিত এবং শুধু বহুবিধ সম্ভাবনার ভেতরই তার অস্তিত্ব খুজে পাওয়া যাবে।

বায়োফিজিক্যাল সিস্টেমের মধ্যে এত বেশি অনিশ্চয়তা যে, সেটা কারো কল্পনাতেও আসেনি। বাস্তবতা পুরোপুরি নির্ণয় বা নিরূপণ করা যায় না যতক্ষণ না আমরা সিত্য সত্যি তদন্ত করি (শ্রডিঙ্গার  এর ক্যাট এক্সপেরিমেন্ট এ যেমনটি  দেখানো হয়েছে)। জীবদ্দশায় ইতিহাসের সব দিক আপনি বিচার বিশ্লেষণ করেছেন। কত শত মানুষের সঙ্গে আপনার ভাববিন্নিময় হয়েছে। আপনি যখন চলে যাবেন, আপনার উপস্থিতির ধারাবাহিকা বজায় থাকবে একটা ভৈীতিক পুতুলনাচ পরিচালকের মতো সেসব বিশ্বে, যেগুলোকে আপনি চেনেন।

পঞ্চম কারণঃ  এখন যে আপনি সৌভাগ্যভশত অনন্ত কালের মাথায় জীবিত অবস্থা করছেন, এটা কোনো দুর্ঘটনা নয়। যদিও ব্যাপারটা সহস্য কোটিতে একটা সুযোগ হিসেবে গণ্য হওয়ার যোগ্য, তবু এটা সম্ভবত স্রেফ বোবা ভাগ্য নয়। কারণ যাই হোক, একবার যেহেতু সীমাবিহীণ অতীত থেকে এখানে এসেছেন এবং এই বাস্তবতা থেকে আবার বেরিয়ে যাবেন, আপনি, একজন পর্যবেক্ষক, চিরকাল আরো বেশি ‘এখন’ থেকে ঝরে পড়বেন। আপনার চেতনা বা সজ্ঞানতা সব সময় বহাল থাকবে ভারসম্য রক্ষা করবে অনন্ত অতীত আর অনির্দিষ্ট ভবিষ্যতের মাঝখানে সময়ের কিনারা ধরে এক বাস্তবতা থেকে আরেক বাস্তবতার ভেতর ভ্রমণ করবেন, নতুন নুতন রোমাঞ্চকর অভিযানে অংশ নেবেন, পরিচিত হবে নতুন নতুন বন্ধুদের (পুরনো বন্ধুদের সান্নিধ্যও উপভোগ করবেন) সঙ্গে।


Leave a Reply