মৃগীরোগঃ একটি স্নায়ু মনোরোগ

  • 0

মৃগীরোগঃ একটি স্নায়ু মনোরোগ

মৃগীরোগঃ একটি স্নায়ু মনোরোগ

 

মৃগীরোগ একটি স্নায়ু মনোরোগ। স্নায়ুতন্ত্র আক্রান্ত হয়ে এ রোগ সৃষ্টি হতে পারে। মাথার খুলির ভেতর এক ধরনের স্নায়ুতন্ত্র আছে যার উপরিভাগের নাম সেরিব্রাল কার্টেক্ এবং নিচের ভাগের নাম সেরিব্রেলাম। সেরিব্রাল কর্ট্রেক্সে কয়েকশ কোটি স্নায়ুতন্ত্র থাকে। স্নায়ুতন্ত্র এর প্রতিটি ইউনিটের নাম নিউরন। নিউরনের কাজ স্নায়ুতন্ত্র সক্রিয় রাখা ও বিভিন্ন সিগন্যাল তৈরি করা। একটি নিউরিন যদি অস্বাভাবিক কোনো সিগন্যাল তৈরি করে তাতে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় খিচুনি হতে দেখা যায়। এছাড়া অন্যভাবেও এর ব্যাখা দেয়া যায়। এছাড়া অন্যভাবেও এর ব্যাখা ব্যাখা দেয়া যায়্ মানুষের স্নায়ুতন্ত্র দুটি বড় অংশে বিভক্ত।  একটি হলো সেন্টাল নার্ভাস সিস্টেম। আর অন্যটি হলো পেরিফেরিকল নার্ভাস সিষ্টেম। মানুষের এই যে দুটি নার্ভাস সিষ্টেম এই সিষ্টেমের কাজের গোলমাল হলে সৃষ্টি হয় মৃগীরোগী বা এপিলেপসি।

একবার খিচুনি হওয়া মৃগীরোগের পর্যায়ে পড়ে না। মৃগীরোগের পর্যায়ে পড়ে না। মৃগীরোগ ডায়ানোসিস করতে হলে খিচুনি একাধিকবার হতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের অত্যাধিক জ্বর,  শরীরের মেটাবলিক সমস্যা অথবা মস্তিস্কে আঘাতজনিত কারণেও খিচুনি হতে পারে। সহসা এটিকে মৃগীরোগের পর্যায়ে ফেলা ঠিক হবে না। মৃগীরোগ খিচুনি একাধিকবার হতে হবে, খিচুনির মধ্যে ২৪ ঘন্টা ব্যবধান থাকতে হবে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রোগীকে অজ্ঞান হতে হবে।

মৃগীরোগের কারণ ৭০% নির্দিষ্টভাবে জানা নেই, আর প্রায় ৩০% রোগীর ক্ষেত্রে অন্য কারণগুলো হচ্ছে প্রধান অথবা কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের প্রদাহ, শিশুর জন্মের পূর্বে এবং পরে মস্তিস্কে আঘাত পাওয়া,  স্ট্রোক, মাথায় ইনজুরি, মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণ, ব্রেণ টিউমার, মস্তিষ্কের অস্বাভাবিক গড়ন, মস্তিস্কে পূর্বে অপারেশন, মস্তিষ্কে বিভিন্ন ক্ষয়জনিত রোগ ইত্যাদি।  এছাড়া বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক ও পরিপাকজনিত কারণ, ঘুমের সমস্যা, মানসিক চাপ, মাদকদ্রব্যের আসক্তি ইত্যাদি বিভিন্ন কারণ।

মৃগীরোগ কিছুটা বংশগত। সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, ক্রোমোজম নম্বর ৬ এবং ২৩ নম্বরে পরিবর্তনের কারণে মৃগীরোগ হয়ে থাকে। এছাড়া পরিপাকজনিত কারণ যেমন- অ্যামাইনো এসিড, প্রোটিন ও মেটাবলিজমের কারণে মৃগীরোগ হয়ে থাকে। মৃগীরোগাক্রান্ত মাতা পিতা থেকে সন্তানের মধ্যে মৃগীরোগ হয়ে থাকে। তবে তা নির্ভর করে পিতা বা মাতার মধ্যে কত অল্প বয়সে তা সৃষ্টি হয়েছে। তার ওপর মহিলাদের মৃগীরোগ হওয়ার হার পুরুষের চেয়ে কম। মাসিক চক্র চলাকালীন হরমোনের কিছু পরিবর্তনের কারণে মৃগীরোগ হতে পারে। মাসিক চক্র চলাকালীন মহিলাদের মধ্যে যে মৃগীরোগ দেখা দেয় তাকে বলে ক্যাটামিনিয়াল এপিলেপসি।  এতে আক্রান্ত হয়ে খিচুনি বারবার হয় যা মাত্রায় অধিক হয়। মাসিক চক্র ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরণ হরমোন স্নায়ুতন্ত্র ওপর বিশেষ প্রভাব ফেলে।  ইস্ট্রোজেন হরমোনটি উদ্দীপক ও প্রজোস্টেরন হরমোনটি নিরোধক। মাসিক চক্রের প্রথম দিকে যখন শরীরের ইস্ট্রোজেনের মাত্রা বেশি হয় তখন ক্যাটামিনিয়াল এপিলেপসি হতে পারে। সেক্ষেত্রে মৃগীরোগের ওষুধ ছাড়া প্রজেস্টেরণ হরমোন ওষুধ আকারে দেয়া হয়। যাতে করে ইস্ট্রোজেন ও প্রজেস্টেরণ মাত্রা সমান থাকে। মৃগীরোগ জনিত কারণে মহিলাদের মধ্যে সন্তান সম্ভাবনার হার কমিয়ে দেয়, মাসিক চক্র অনিয়মিত করে প্রচন্ডভাবে যৌন ইচ্ছা কমিয়ে দেয়। এর কারন হলো মহিলাদের যৌন জীবন যাপনে হাইপোথ্যালামাস ও লিম্বিক সিস্টেমের বিশেষ কাজ রয়েছে। মৃগীরোগ এই জায়গাগুলোর কাজকে কমিয়ে দেয়। আবার মৃগীরোগে আক্রান্ত মহিলাদের মধ্যে যারা জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি সেবন করে সে ক্ষেত্রে মৃগীরোগের ওষুধ জন্মনিয়ন্ত্রণের ওষুধের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। গর্ভধারণের ক্ষেত্রে  এই রোগের মাত্রা ৩০% বেশি হতে পারে। অনেক সময় মৃগীরোগের খিচুনি পেটের সন্তানের ক ক্ষতি করতে পারে। মৃগীরোগের চিত্রটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য ভয়াবহ। ১০ শতাংশের জনসাধারণের মধ্যে তাদের জীবদ্দশায় মৃগীরোগ জনিত খিচুনির সম্ভাবনা আছে। যার মধ্যে কিনা শতকরা ৩ ভাগ লোক পরবর্তীতে মৃগীরোগে আক্রান্ত হতে পারে। শিশু ও বৃদ্ধ বয়সে মৃগীরোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। মৃগীরোগে শিশু বয়সে আক্রান্ত হলে হঠ্যাৎ করে শিশু মাথা ঘুরে পড়ে যায়। এতে তার জ্ঞান হারিয়ে যেতে পারে। তারপর শুরু হয়  খিচুনি। এই খিচুনির স্তর দু তিন মিনিট পর্যন্ত চলে। এরপর রোগীর ঘুমে তলিয়ে যায়। আক্রান্ত ব্যক্তি মাটিতে পড়ে যাওয়ার সাথে সাথে দাতের ফাকে তার জিহ্বা আটকে যেতে পারে। ফলে জোর করে জিহ্বা চেপে কয়েক সেকেন্ড এরকম অচেতন অবস্থায় থাকতে পারে। তবে ১৫ মিনিটের বেশি অজ্ঞান অবস্থায় থাকে না। অনেক শিশুর ১০৩-১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত জ্বর হতে পারে। ১০ শতাংশ শিশুর এই জ্বরজনিত খিচুনি হতে দেখা যায়। সুখের কথা হলো, এটিকে এপিলেপসি রোগ বলা হয় না। তবে জ্বর ছাড়া যদি বারবার বিরতি দিয়ে খিচুনি হতে থাকে তখন সেটি এপিলেপসি। আরেকটি কথা হলো, যেসব শিশু ছোটবেলায় জ্বরজনিত খিচুনিতে ভোগে তাদের প্রায় ৩ শতাংশ শিশু বড় হয়ে এপিলেপসি রোগে আক্রান্ত হতে পারে। আর তখন এ রোগের বিশেষ চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। মৃগীরোগের খিচুনি হঠ্যাৎ করে হয় আবার হঠ্যাৎ করে বন্ধ হয়ে যায়। খিচুনির কিছু পূর্বে রোগী এটা বুঝতে পারে। এপিলেপসির উপসর্গগুলো হলো-

১. চার হাত পায়ে খিচুনি হয়, ঘাড় বাকা হয়, চোখ উল্টে যায়, জিহ্বা কেটে যেতে পারে, মুখ দিয়ে ফেনা ও রক্ত বের হয়।

২. রোগী কাপড়ে প্রস্রাব পায়খানা করতে পারে।

৩. অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ার ফলে শরীরে আঘাতের চিহ্ন থাকতে পারে।

৪. অনেকের ঘুমের মধ্যে উপসর্গ বা খিচুনি দেখা দিতে পারে। একে বলে স্লিপিং এপিলেপসি। ঘুমের মধ্যে খিচুনি দেখা দিলে বিছানা বা বালিশে রক্ত বা ফেনা লেগে থাকতে পারে।

৫. যেসব শিশুর বিছানায় প্রস্রাব করার অভ্যাস বা রোগ নেই, সেসব শিশু হঠ্যাৎ করে বিছানায় প্রস্রাব করে ফেলে সেটিও এপিলেপসির উপসর্গ হতে পারে।

৬. কোনো কোনো রোগী অজ্ঞান না হয়ে সামান্য সময়ের জন্য আনমনা হয়ে যায় সেটিও উপসর্গ হতে পারে। মৃগীরোগ থেকে মানবিক বৈকল্য দেখা দিতে পারে। মৃগীরোগ থেকে যেসব মানবিক রোগ হতে পারে তা হলো- বিভিন্ন ধরনের নিউরোসিস বা মৃদু মানসিক রোগ যেমন- অবসেশন, ফোবিয়া, মৃদু মাত্রার বিষণ্নতা, অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার ইত্যাদি। বিভিন্ন ধরনের সাইকোসিস বিষণ্নতা, ম্যানিয়া, সিজোফ্রেনিয়া।

মৃগীরোগজনিত ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন। যেসব রোগী ১০ মিনিটের বেশি সময় অজ্ঞান অবস্থায় থাকে, সেসব রোগীকে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নেয়া প্রয়োজন। আবার কিছু ক্ষেত্রে মৃগীরোগীকে নিকটবর্তী স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেয়া প্রয়োজন হতে পারে। কারণ সেক্ষেত্রে রোগীকে অক্সিজেন দিতে হতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিশুর হজম ও বিপাকক্রিয়া ঠিকমতো না হলে শিশু এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে। জ্বর হলে শিশুকে জ্বরের ওষুধ দিতে হবে। এপিলেপসি রোগী অজ্ঞান হলে সবাই চেষ্টা করে চামচ দিয়ে দাত ফাকা করার জন্য। এটি ভুল, এমনকি   কোনো সময়ই করা উচিত নয়। অনেকে রোগীর মুখে পানির ঝাপটা মারেন এটিও ঠিক নয়। অনেকে আবার রোগীকে জুতার গন্ধ শুকায় এগুলোও ভুল ধারনা। এ সবের কোনো প্রয়োজন নেই। রোগী এ রোগে আক্রান্ত হলে তাকে ডানপাশে কাত করে শুইয়ে দিবেন আর ১০ মিনিটের বেশি খিচুনি ও অজ্ঞান হলে রোগীকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবেন।

এ রোগী বিভিন্ন ধরনরে মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়। তাই মানসিক রোগের ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করারও অত্যান্ত প্রয়োজন। মানসিক রোগের ডাক্তার বা বিশেষজ্ঞের এপিলেপসি বা মৃগীরোগের চিকিৎসা করে থাকেন। মৃগীরোগকে অনেক মনে করেন হিষ্টিরিয়া জিনে ধরা আলগা দোষ ভরা করা, বাতাস লাগা, পরিতে ধরা।  এগুলো এক প্রকার কুসংস্কার। এতে রোগ আরো জটিল আকার ধারণ করে থাকে।

 

অধ্যাপক ডা. এইচ মোহাম্মদ ফিরোজ

মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ

মনোজগত সেন্টার, ধানমন্ডি, ঢাকা।


Leave a Reply