মৃগীরোগে কুসংস্কার

  • 0

মৃগীরোগে কুসংস্কার

মৃগীরোগে কুসংস্কার

ডাঃ গৌতম কুমার দাস

মৃগীরোগ বা এপিলেন্সি আমাদের দেশে অতিপরিচিত একটি সাধারণ স্নায়ুরোগ। কুসংস্কারবশত এ রোগটি সম্পর্কে অনেক ভ্রান্ত ধারণা বা বিশ্বাস আামাদের সমাজে প্রচলিত আছে। আমি এ বিষযে পরে আলোকপাত করছি। বলছিলাম মৃগীরোগ একটি স্নায়ুরোগ, যখন মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক তরঙ্গে সমস্যা দেখা দেয় তখনই এ রোগ দেখা দেয়। আবার যখন মস্তিস্কের বৈদ্যুতিক তরঙ্গ ঠিক বা স্বাভাবিক হয়ে যায় তখন কয়েক মিনিটের মধ্যেই খিঁচুনি বন্ধ হয়ে যায়। প্রতি হাজারে ছয়জন মানুষের এ রোগ হয়।  ‍মৃগীরোগীর খিঁচুনি মানুষের জীবনে দুই বয়সে হয়ে থাকে ১৫ বছর বয়সের আগে এবং ৬৫ বছর বয়সের পরে। মৃগীরোগী খিঁচুনী ওঠার কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়মনীতি নেই। অনেকের প্রতি ঘন্টায় যেমন উঠতে পারে তেমনি দীর্ঘ দিন পর এমনকি তিন চার বছর পরও উঠতে পারে। এটি কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়। এই রোগের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে রয়েছে খিচুনি ও অজ্ঞান হয়ে যাওয়া। খিচুনিকালে অবস্থায় ছন্দময়ভাবে হাত পা খিচাতে থাকে। রোগী জ্ঞান হারায় ও মাটিতে পড়ে যায়। সবগুলো মাংসপেশি টান টান হয়ে যায় তখন কান্নার মতো একটা চিৎকার বের হয় এবং রোগী নীল বর্ণ হতে পারে। রোগী জিহ্বা কাপড় দিয়ে রাখতে পারে। মুখ দিয়ে ফেনা বের হয় এবং দাঁতে দাঁত লেগে যায়। কোনো কোনে ক্ষেত্রে প্রসাব পায়খানা হয়ে যায়। চোখ ও মুখের চেহারা বিকৃত হওয়া হাত এব পা অবশ হয়ে যায়। রোগী মূর্ছিত অবস্থায় থাকে ও ধীরে ধীরে তা গভীর ঘুমে রূপ নেয়।  রোগী জেগে ওঠার পরে কিছু সময়ের জন্য সঠিকভাবে চিন্তা করতে পারে না এবং কী কী ঘটেছে সে ব্যাপারে কিছুই মনে করতে পারে না। মাঝে মাঝে মাথাব্যাথা থাকে। মৃগীরোগের ক্ষেত্রে যেহেতু ফীট বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার একটা সম্পর্ক রয়েছে, তাই এসব রোগীর এমন কাজে নিযুক্ত হওয়া উচিত হয় যা তার জীবনের প্রতি ঝুঁকিপূর্ণ। অনেক মৃগীরোগী পানিতে ডুবে প্রাণ হারিয়েছে বা আগুনে পুড়ে আহত হয়েছে, এমন অনেক ঘটনাই আমাদের দেশে দেখা যায়। তাই এসব রোগীদেরকে সাঁতারকাটা, গাড়ি চালানো, সাইকেল চালানো, গাছে উঠা, আগুনের পাশে কাজ, যন্ত্রপাতি চালানো প্রভৃতি থেকে বিরত থাকতে হবে।

আমাদের দেশে মৃগীরোগ সর্ম্পকে প্রচলিত কিছু কুসংস্কারঃ

মৃগীরোগ হচ্ছে একটি দীর্ঘমেয়াদী রোগ। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা হাঁপানি রোগগুলো যেমন দীর্ঘমেয়াদি রোগ, এটিও ঠিক তেমনি। তবে মৃগীরোগী সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসার মাধ্যেম ভালো হয়ে যায়। প্রয়োজন শুধু ধৈর্যসহকারে নিয়মিত ওষুধ খাওয়া। পুরোপুরি সুস্ত হয়ে উঠতে তিন থেকে পাঁচ বছর লাগতে পারে। তাই ধৈর্য না হারিয়ে নিয়মিত ওষুধ খেয়ে যাওয়াই হচ্ছে বুদ্ধিমানের কাজ। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, আমাদের দেশে এ রোগটি সম্পর্কে প্রচুর কুসংস্কার রয়েছে। এ জন্য রোগীদের জীবন আরো দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। এ রোগটিকে অনেকে কোনো অপশক্তির প্রভাব, ভূতে ধরা, জিনের আছর বা অভিশাপ বলে মনে করেন। কেউ বলেন রোগটি বংশগত,তাই বিয়ে করা উচিত নয়। কিন্তু এটি ভ্রান্ত ধারণা। মৃগীরোগ বংশগত নয়। মৃগীরোগ হলে বিয়ে, চাকরি বাকরি বা স্বাভাবিক জীবনযাপনে কোনো বাধা নেই। কেউ বলেন মৃগীরোগের কোনো চিকিৎসা নেই। এসব কুসংস্কার ও ভূল বিশ্বাসের কারণে অনেকে চিকিৎসকের কাছে না গিয়ে কবিরাজ, ওঝা, ফকির ও দরবেশের কাচে যায়। প্রায়েই এ রোগের চিকিৎসা হিসেবে রোগীকে লাঠি দিয়ে প্রহার করা ও অকথ্য ভাষায় গালাগাল করতে দেখা যায়। অনেক সময় রোগীর নাকে জুতা, স্যান্ডেল ইত্যাদি চেপে ধরে এবং মৃত পশুর হাড্ডি দিয়ে ছ্যাকা দেয়। কুসংস্কারবশত এমন অপচিকিৎসায় রোগী শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রচন্ড ক্ষতিগ্রস্থ হয় এবং চিকিৎসা নিতে দেরী হয়, ফলে রোগীর অবস্থা আরো জটিলতায় দিকে চলে যায়। কখনো কখনো এ জন্য রোগী বিভিন্ন মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়। তাই এসব কুসংস্কার ঝেড়ে ফেলে স্বাভাবিক ও  সত্য জিনিসটি আমাদের উপলব্ধি করতে হবে এবং রোগটি ধরা পড়ার  সাথে সাথে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ওষুধ খেয়ে সুস্থ্য জীবনের দিকে এগুতো হবে।

লেখকঃ জেনারেল প্রাকটিশনার, কানাইপুর, ফরিদপুর। ফোনঃ ০১৭১৪-৮৯৪৯৮২


Leave a Reply