রহস্য ঘেরা হার্ট এ্যাটাক

  • 0

রহস্য ঘেরা হার্ট এ্যাটাক

Category : Health Tips

রহস্য ঘেরা হার্ট এ্যাটাক

ডা. এ আর, এম, সাইফুদ্দিন একরাম

হৃদপিন্ডের সুস্থতা সর্ম্পকে সচেতনতা এখন অনেক বেড়েছে। ভগ্নহৃদয় নিয়ে লাখা লাখ কবিতা, খান কিংবা উপন্যাস রচিত হয়েছে। কিন্তু হৃদরোগ বা হার্ট এ্যাটাক সম্পর্কে তেমন আনন্দদায়ক কিংবা হৃদয়গ্রাহী কিছু বলা যাবে না। ভালবাসা দিবস উপলক্ষে দোকানপাটে কত লাল, নীল কাগজ কিংবা কাপড় কাটা হৃৎপিন্ডের প্রতীক ঝুলতে দেখা যায়, কিন্তু ত্রিমাত্রিক এই বিষ্ময়কর অঙ্গটির প্রকৃত কার্যকালাপ কিংবা ভালমন্দ নিয়ে হয়তো অনেক সময় ভাবার সময় পাই না। আমরা হার্ট এ্যাটাকের রহস্য নিয়ে কয়েকটি বিষয়ে আলোচনা করব।

হৃদরোগ হরে সহজেই বোঝা যায়

শুনতে অবাক হলেও হৃদরোগ আক্রান্ত প্রতি দশজনের মধ্যে চার থেকে ছয়জন বুঝতে পারেন না যে তাদের হার্ট এ্যাটাক হয়েছে। তাদের বুকে ব্যথা হয়, দম আটকে আসে, শরীর ঘামে তারপরেও তারা সন্দেহ করেন না। অনেকেই জানেন বুকের বাম দিকে হার্ট এ্যাটার্কের ব্যথা হয় এবং তা বাম হাতে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু এমন আদর্শ প্রকৃতির হার্ট এ্যাটাক কমই দেখা যায়। অনেকেই হার্ট এ্যাটাকে ভুগছেন কিন্তু বলেন কিংবা মনে করেন তাদের বুক জ্বালা পোড়া হয়েছে কিংবা তারা অতিরিক্ত দুর্বলতায় ভুগছেন। মেয়েদের হার্ট এ্যাটার্কের প্রকৃতি আরও বিচিত্র। ঈশ্বরের পক্ষে যেমন মেয়েদের মন বোঝা ভার তেমন তাদের হৃদরোগও বৈচিত্রময়। হার্ট এ্যাটাক হলেও অনেক মহিলা বুকে ব্যাথার কথা বলেন না। বরং তারা পেটে ব্যথা, পিট ব্যথা, চোয়াল কিংবা ঘাড়ে ব্যথার অভিযোগ করেন। অতএব প্রশ্নটা যদি হৃৎপিন্ড সংক্রান্ত হয় তাহরে লক্ষণ উপসর্গ যত বিচিত্রই মনে হোক না কেন, হৃদরোগের সম্ভাবনার কথা ভুলে যাওয়া উচিত  নয়।

ট্রান্স ফ্যাট” মুক্ত খাবার হৃৎপিন্ডের জন্য নিরাপদ

বর্তমান সময়ের এক খলনায়ক “ট্রান্স ফ্যাট”। অনেক খাবারের বোতল কিংবা মোড়কের গায়ে লেখা দেখা যায়। এটা ট্রান্স ফ্যাট মুক্ত। বড় ব্ড় হোটেল রেস্তরাতে সাইন বোর্ড ঝুলানো থাকে আমরা রান্নার জন্য ট্রান্স ফ্যাট মুক্ত তেল ব্যবহার করি। ট্রান্স ফ্যাট আসলেই হৃদয় বান্দব নয়। কিন্তু ট্রান্স ফ্যাট মুক্ত খাবার খুজে পাওয়াও কঠিন। কাজেই যে কোন তেল, চর্বি জাত কিংবা যুক্ত খাবার সর্ম্পকে সচেতন থাকতে হবে। আর খাবার ট্রান্স ফ্যাট মুক্ত হলেই যে ভাল তা কিন্তু নয়। ওর ভেতরে সম্পৃক্ত চর্বি থাকতে পারে। সম্পৃক্ত চর্বি হৃৎপিন্ডের চিরশত্রু। কাজেই আপনি মোড়কজাত যে খাবার কিনেছেন তার গায়ে ট্রান্স ফ্যাট এবং তেল চর্বির পরিমাণ সর্ম্পকে পুরো বৃত্তান্ত পড়ে নেয়া ভাল।

হৃদরোগ নাকি দুশ্চিন্তা উদ্বেগ

হৃদরোগের অনেক লক্ষণ উপসর্গ দুশ্চিন্তা উদ্বেগের ছদ্মবেশে আসে। আপনি কাজ করছেন; হঠ্যাৎ হৃদঘাত বেড়ে গেল। আপনার হয়তো মনে হতে পারে এটা উদ্বেগ কিংবা দুশ্চিন্তর কারণে হচ্ছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে অনেক সময় এটা হৃদরোগের জন্যও হতে পারে। অনেকের মাঝে মধ্যে ছন্দ ব্যাহত হতে দেখা যায়। কারও কারও এটা গুরুতর এবং ওষুধ সেবনের প্রয়োজন হতে পারে।

আজকের  প্রতিযোগীতামুলক ব্যস্ত জগতে উদ্বেগ এবং দুশ্চিন্তা আমাদের প্রাত্যহিক সঙ্গী। এসব মেনে নিয়েই আমাদের বসবাস। কিন্তু তারপরেও কথা রয়ে যায়। আপনার হৃৎপিন্ডের গতি যদি সময় বেশি কিংবা ছন্দহীন থাকে। তাকে হালকাভাবে নেয়া যাবে না। এটা যদি উদ্বেগ কিংবা দুশ্চিন্তার জল্যভ হয়ে থাকে, শেষ পর্যন্ত তা কিন্তু হৃৎপিন্ডের জন্য দারুণ ক্ষতিকারক। অতএব উদ্বেগ লাঘব করতে হবে; দুশ্চিন্তানাশক ব্যবস্থা দিতে হবে। কারণ হৃদঘাত দীর্ঘদিন পরে থাকলে অবশ্যই তা হৎপিন্ডের কার্যকক্ষতা কমিয়ে দেবে। উদ্বেগ কমানো জন্য যোগ ব্যায়াম, ধ্যান কিংবা শিথিলায়ন কৌশল অবলম্বন করতে হবে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে হবে এবং নিয়মিত শরীর চর্চা করতে হবে।

বয়স বেশি না হলে হৃৎপিন্ড নিয়ে দুশ্চিন্তা নেই

কিন্তু অনেকের কুড়ি বছর বয়সের হার্ট এ্যাটাক হচ্ছে। বয়স বাড়রে, হৃৎরোগের সম্ভাবনা বেড়ে যায়, এটা অবশ্যই সত্য। কিন্তু অনেকের কৈশোরেও হৃৎরোগ হয়। আজকাল ২০ থেকে ৪০ বছর বয়সে হৃৎরোগ হওয়া সংখ্যা বেড়ে চলছে। হৃৎপিন্ডের জন্য উপকারী স্বাস্থ্যকর অভ্যাসগুলো শৈশব থেকেই গড়ে তোলা উচিত। অন্যথা কু অভ্যাস সমূহ বয়সকালেও রয়ে যায়। শিশুদের হৃৎপিন্ড সুস্থ রাখার জন্য স্বাস্থ্যকর খাবারের পাশাপাশি তাদের খেলাধুলা করতে উৎসাহ দিতে হবে; টেলিভিশন কিংবা কম্পিউটারের সামনে যত কম সময় থাকে ততই মঙ্গল। কিন্তু আমাদের শিশুরা কি তা করছে ?

স্বাস্থ্য ভাল থাকলে ভয় নেই

কিন্তু বংশগতির প্রভার অস্বীকার করা কঠিন। পিতা মাতার হৃৎরোগ ছিল বিধায় আপনারও হৃৎরোগ হবে, এটা সব সময় সত্য নয়। তবে সম্ভাবনার কথা স্বীকার করতে হবে। আপনার স্বাস্থ্য সুঠাম এবং ওজন সঠিক মাত্রায় আছে, তার মানে এটা নয় আপনার হৃদরোগ হবে না। বংশগতি, হৃদরোগের পারিবারিক ইতিহাস, ডায়াবেটিস, রক্তে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল কিংবা উচ্চরক্তচাপ নীরবে আপনার হৃৎপিন্ডকে ঘায়েল করতে  পারে। এছাড়া বয়সের কথা মনে রাখতে হবে। পুরুষ হওয়াটা হৃৎপিন্ডের স্বাস্থ্যের জন্য ভাল নয়। অবশ্য রজঃ নিবৃত্তির পর মেয়েদেরও পুরুষদের মতোই হৃৎরোগের ঝুকি বেড়ে যায়।

মোদ্দাকথা হচ্ছে বিনা মেঘে বজ্রপাত হওয়াটা যেমন সত্য: কোন ঝুকি উপাদান না থাকা স্বত্তেও হার্ট এ্যাটাক হয়। অতএব সচেতন থাকুন, সন্দেহ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নিরীক্ষা করাতে হবে।

লেখকঃ অধ্যাপক (চলতি দায়িত্ব) ও বিভাগী প্রধান

মেডিসিন বিভাগ

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ, রাজশাহী।


Leave a Reply