রোগের সঙ্গে লড়াই

  • 0

রোগের সঙ্গে লড়াই

রোগের সঙ্গে লড়াই

অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরির কলম থেকে

পৃথিবীর উন্মেষের সেই উষালগ্ন থেকে ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়াই করে চলেছে, এন্টিবায়োটিক অস্ত্র নিয়ে। আক্রান্ত মাইক্রোব প্রতিহত করে, এদিকে শত্রুরা পালাক্রমে তৈরি করে নতুন এন্টিবায়োটিক। মাইক্রোবদের প্রভুত্ব বিস্তারের এ সংগ্রাম চলছে কোটি কোটি বছর ধরে। ১৯২৮ সালে যখন হঠাৎ করেই এন্টিবায়োটিক পেনিসিলিন আবিষ্কার করলেন আলেকজান্ডার ফ্লেমিং, তিনি এগিয়ে দিলেন সংগ্রামকে। কালচার ডিশে ল্যাবরেটরিতে তিনি ব্যাকটেরিয়ার বসতি গড়ে তুলেছিলেন, জানালা দিয়ে দমকা হাওয়ায় একটি ছত্রাক এসে পড়লো সে ডিশে, দমিয়ে দিলো জীবাণুদের। সেই ছত্রাক থেকে তৈরি পেনিসিলিন এমন এ জোর যে, ব্যাকটেরিয়ার দেয়াল ফুটো করে গলিয়ে দিতে পারে সে পেনিসিলিন।

রোগের সঙ্গে লড়াই

রোগের সঙ্গে লড়াই

ফ্লেমিংয়ের এ আবিষ্কার ১৯৪০ সালে লুফে নিলেন হাওয়ার্ড ফ্লোরে, আর্স্ট চেন এবং নরম্যান হিটলি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তির সেরা অস্ত্র ও ওষুধ। অসংখ্য যুদ্ধাহত মানুষকে জীবাণু সংক্রমন থেকে বাচিয়েছিলো এই পেনিসিলিন। কিন্তু জীবানুর উদ্ভব হয় এরা বাড়েও দ্রুত ঘন্টাখানেকের মধ্যে হাজির হয় নতুন বংশতি এরা এন্টিবায়োটিককে প্রতিহত করার শক্তি অর্জণ করে। এদেরকে ভেঙে ফেলার জন্য চাই উপযোগী রাসায়নিক এনজাইম নিস্ক্রিয় করে দেয়া। অনেক ব্যাকটেরিয়াতে থাকে ব্যাকটেরিয়াকত থাকে এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট জিন। এরা আবার পেরিয়ে যায় অন্য ব্যাকটেরিয়াতেও।

এন্টিবায়োটিক যুগের শুরু থেকে, নতুন ওষুধকে রেজিষ্ট্যান্টের মোকাবিলা করতে হয়েছে। প্রথম ্ে নিয়ে তেমন দুশ্চিন্তা ছিলো না। পেনিসিলিন এবং টিবি রোগের অব্যর্থ ওষুধ স্ট্রেপটোমাইসিন ছাড়াও ছিলো অনেক এন্টিবায়োটিক প্রকৃতিতে এমনকি তৈরি হচ্ছিলো ল্যাবরেটরিতেও। কিন্তু এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স এখন ক্রমে বড় সমস্যা এখন হিমালয়সম সমস্যা।

সুপার বাগ এখন অরোধ্য

পরস্পর মিলিত হওয়ার জন্য এবং এন্টিবায়োটিক জিন বিনিময়ের জন্য হাসপাতাল হলো আদর্শ স্থান। এসব জিনে সজ্জিত হয়ে, এককালে যারা ছিলো নিরীহ জীবানু, এরা হয়ে উঠে দুর্ধর্ষ ঘাতক, হাসপাতালের ওয়ার্ডে এরা ঘুরে ফিরে, খোজে মানুষকে। ইন্টেনসিভ কেয়ার ইউনিটে আছে যেসব রোগী, জীবানু সংক্রমণ এদের জন্য বড় হুমকি। সেপসিস, রক্তদুষণ হয়ে উঠে মারাত্মক শতকরা ৩৫ ভাগ রোগীর ক্ষেত্রে এর তেমন নিরাময় কৌশলও নেই।

রোগীরা অনেক সময় এন্টিবায়োটিকের পুরো কোর্স খান না, উপসর্গ উপশম হলেই এরা ওষুধ খাওয়া ছেড়ে দেন। অথচ যক্ষার মতো রোগের জন্য ৬ মাস থেকে এক বছর একনাগাড়ে এন্টিবোয়োটিক খেতে হয়, তা না হলে রোগ ভালো হয় না। এন্টিবায়োটিকের অতিব্যবহার বা কম ব্যবহার, বেশি ডোজ বা কম ডোজ দুটোই মারাত্মক। এতে রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়ার বেঁচেবর্তে থাকার সম্ভাবনা বাড়ে। অর্থ্যাৎ পরের বার এ জীবানু সংক্রমনে এন্টিবায়েটিকটি  দিলেও আর কাজ হবে না। অনেক অনুজীব বিজ্ঞানীরা ধারণা সেদিন আর দূরে নেই যখন একটি অতি অনুজীব বা সুপার বাগ আবির্ভূত হবে জানা সব এন্টিবায়োটিক দিয়েও এর বিনাশ ঘটবে না।  ভ্যানকোমাইসিনের মতো শক্তিশালী এন্টিবায়োটিক দিয়েও এনটারোকককাস জীবানুকে ধ্বংস করা যাচ্ছে না। এটি শঙ্কার কারণ। পাচকনালীর একটি নিরীহ জীবানু হলো এন্টারোকককাস । লন্ডণে সেন্ট থমাস হাসপাতালে (যেখানে এককালে আমি কাজ করেছি) একটি গবেষণায় দেখা গেছে, এন্টারোকককাস থেকে ‘ভ্যানকোমাইসিন রেজিস্ট্যান্স’ স্থানান্তর করা যায়, কম সংহারী জীবানু স্ট্যাকাইলোকককাস ওরিয়াসে। তখন হয় রক্তদুষ্টি ও খাদ্য বিষক্রিয়া। এটি হলো সচরাচর হাসপাতাল সংক্রমন। সেন্ট থমাস হাসপাতালে এ জীবাণুকে হিমাগারে রাখা হয়েছে বটে, কিন্তু কালক্রমে প্রাকৃতিকভাবেই এ ধরনের ঘটনা ঘটা অসম্ভব নয়।

চাই আরো জোরালো প্রতিরোধ

এন্টিবায়োটিক রেজিট্যান্স ঠেকাতে ওষুধশিল্প প্রতিষ্ঠান পিছিয়ে নেই। তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন এন্টিবায়োটিক। ব্যবহৃত হচ্ছে ডিএনএ প্রযুক্তি ও মলিকুলার বায়োলজি কৌশল। আর একটি অস্ত্র হলো টীকা দেয়া।

প্রাকৃতিক রোগ প্রতিরোধ শক্তি কমছে

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা বসন্ত নির্মূল অভিযানে ‘টিকার’ উপযোগীতা নিয়ে গর্বিত। তবে অনেক রোগের বিরুদ্ধে টীকা নেই। যেমন এইডস। এছাড়া টীকাদান কর্মসুচি একটি বড়া আয়োজন এজন্য চাই অর্থ ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা। জীবানুগুলো আরও একটি সুবিধা ভোগ করছেঃ অনেক লোক ক্রমে হারাচ্ছে প্রকৃতিদত্ত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। খুব তরুণ ও বৃদ্ধ দুদলই রোগপ্রতিরোধে দুর্বল। যাদের ক্যান্সার, এইডস, অর্গান ট্রান্সপ্লান্ট হয়েছে এদের প্রতিরোধ তো এমনিতেই দূর্বল।

রোগ প্রতিরোধ ব্যাহত হলে সংক্রমনের দরজা খুলে যায়। এইচ আইভি যা এইডস ঘটায়, এর জন্য পৃথিবী জুড়ে এতো টিবি রোগী বাড়ছে। ১৯৯০ সালের সঙ্গে তুলনা বিচারে ২০০৫ সালে পৃথিবী জুড়ে যক্ষারোগ বেড়ে যাবে ৬০ শতাংশ। এই বৃদ্ধির এক চতুর্থাংশের পেছনে আছে এইচআইভি সংক্রমন। একে ঠেকাতে হলে চাই সম্মিলিত প্রতিরোধ। কেবল জীবাণু কেন? অন্য অনেক কারণে ঘটছে নানা রোগ। আমাদের দেশে এখন আর্সেনিক দুষণ একটি সমস্যা। ডেঙ্গু, কালাজ্বর, ম্যালেরিয়া বড় সমস্যা হয়ে আসতে পারে ভবিষ্যতে। পরিবেশ দুষণ, বায়ুদুষণ অপুষ্টি, এসব সম্য সমাধানে চাই গ্লোবাল সহযোগীতা একক প্রচেষ্টায় এ বড় সমস্যার সমাধান হবে না। কেবল ডাক্তার নয়, চিকিৎসাকর্মী, জনগন, সরকারি ও বেসরকারী সংস্থা সবাই মিলে অংশীদার হতে হবে এ লড়াইয়ে।


Leave a Reply