শিশুকে কেন বুকের দুধ খাওয়াবেন

  • 0

শিশুকে কেন বুকের দুধ খাওয়াবেন

Category : Health Tips

শিশুকে কেন বুকের দুধ খাওয়াবেন

প্রফেসর এম আর কান/ ডাঃ এ এফ এম সেলিম

শিশুকে স্তন্যদান করার সময় মা যেমন এক আশ্চর্য ধরনের পরিতৃপ্তি লাভ করেন, শিশুর মাঝেও দেখা যায় তেমনি এক অনাবিল আনন্দ। ফলে তাদের মাঝে এক নিবিড় আত্মিক সম্পকর্ত তৈরি হয়, যা অন্য কোন উপায়েই গড়ে তোলা সম্ভব নয়। শিশুর পরবর্তী মানসিক গঠন ও বিকাশে এর প্রয়োজনীয়তা অত্যান্ত বেশি।

এতো গেলে মানসিক দিক। বুকের দৈহিক উপকারিতা যে কতো, তা বলে শেষ করা যায় না। এক কথায় শিশুর সুস্থ, স্বাভাবিক ও নীরোগ দৈহিক পরিপুষ্টি ও বৃদ্ধির জন্য কোনো খাদ্যই বুকের দুধের বিকল্প হতে পারে না।

বুকের দুধ

শিশুদের জন্য মায়ের বুকের দুধই হচ্ছে সবচেয়ে উত্তম, উপাদেয় ও উৎকৃষ্ট খাদ্য। এর কোন বিকল্প নেই, বা হতেও পারে না। জন্মের পর থেকে শুরু করে প্রথম কয়েক মাস শিশুর একমাত্র খাবার হচ্ছে মায়ের বুকের দুধ। তার বাড়ন্ত দেহে যতটুকু পুষ্টি, আমিষ, স্নেহ, শর্করা, এবং আরো অনান্য উপাদানের প্রয়োজন তা একমাত্র মায়ের দুধেই রয়েছে। গরুর বা অন্য কোন মূল্যবান কৌটার দুধে নয়। (তাই শিশুকে প্রথম থেকেই বুকের দুধে অভ্যাস্ত করে তুলতে হবে)। মনে রাখতে হবে, বোতলে দুধ খেতে শিশুর কোন কষ্ট হয় না। শুধুমাত্র জিহ্বা নাড়লেই নিপলের ছিদ্র দিয়ে মুখে চলে আসে। পক্ষান্তরে বুকের দুধ টেনে খেতে হয়, যা রীতিমত কষ্টসাধ্য ব্যাপার। তাই শিশু একবার বোতলের সহজলভ্য দুধে অভ্যস্ত হয়ে গেলে পরে আর মায়ের দুধ কষ্ট করে টেনে খেতে চায় না। এদিকে মায়ের দুধ নিঃসরণের জন্য যেসব হরমোনের প্রয়োজন, এদের মাঝে প্রোলাকটীন নামক হরমোন রয়েছে। শিশু যখন বুকের দুধ চুষে খেতে থাকে, তখন মায়ের মনে যে অনাবিল আনন্দের সৃষ্টি হয়, তা মস্তিস্কের গিয়ে প্রোলাকটিন নিঃসরনের কারণ হয়। তাই যদি শিশু বোতলের দুধে অভ্যস্ত হয়ে মায়ের বুক চোষা বন্ধ করে দেয়, তবে প্রোলাকটিন নিঃসরণও কমে যায়। ফলে বুকের দুধের পরিমাণও ধীরে ধীরে কমে যেতে শুরু করে। আর তখন চাইলেও আর তার শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারেন না।

এছাড়া অন্যান্য যেসব উদ্দিপক দুধ নির্গত হতে সাহায্য করে, তাদের মাঝে শিশুর কান্না উল্লেখ্য। মা যদি আন্তরিকভাবে শিশুকে স্তন্যদান করতে চান, তবে শিশুর কান্না তার মস্তিষ্কে উদ্দীপক হিসেবে কাজ করে। দুধ নির্গমনে সাহায্য করে। তাই মা শুধুমাত্র দায়সারাভাবে এবং অনিচ্ছা স্বত্তেও শিশুকে স্তন্যদান করতে চাইলেও বুকের দুধের পরিমাণ কমে যেতে পারে।

কখন শিশুকে প্রথম স্তন্যদান করা উচিত

শিশুর জন্মের পর বেশ কয়েক  ঘন্টা পর্যন্ত কিছুই না খাওয়াবার একটা নিয়ম আমাদের দেশে অনেকের মাঝে প্রচলিত রয়েছে। অথচ এ ব্যবস্থাটা ভুল। শিশুর দেহে জমে থাকা খাবারের পরিমাণ খুবই কম। ফলে সে কয়েক ঘন্টা পর্যন্ত না খেয়ে থাকলেই তার রক্তে শর্করা বা গ্লুকোজের অভাব দেখা দেবে। শিশু অকালজাত হলে অর্থ্যাৎ নির্দিষ্ট সময়ের আগেই জন্ম নিরে অথবা খুব ছোট হলে তার দেহে জমে থাকা খাবারের পরিমাণ আরো কম থাকে। ফলে তার দহে আরে আগে শর্করার অভাব দেখা দিতে পারে। আর েএই শর্করার অভাব বা হাইপোগ্লাইসোমিয়ার ফলে শিশুর বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দিতে পারে, এমনকি মারাত্মক খিচুনির সৃষ্টি করতে পারে।

তাই জন্মের পর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শিশুকে স্তন্যদান করতে হবে। অনেকে জন্মের পর পরই স্তন্য দিতে বলে থাকেন। তবে এত তাড়াতাড়ি সম্ভব না হলে জন্মের ৩ / ৪ ঘন্টার ভিতর, অর্থ্যাৎ মা যখন প্রসবের ধকল কাটিয়ে উঠেন এবং শিশু বেশ ভালোভাবে চুষতে পারে, তখন তাকে অবশ্যই খেতে দিতে হবে। অনেক সময় প্রথম খাবার হিসেবে অনেকে গ্লুকোজের পানি দিতে বলেন।  প্রায় সাড়ে তিন আউন্স পরিমাণ ফুটানো কিন্তু ঠান্ডা পানিতে প্রায় এক সমান চা চামচ গ্লুকোজ গুলে নিলে পানিতে গ্লুকোজের পরিমাণ শতকরা ৫ ভাগ হয়। প্রথমবারের খাবার হিসেবে এ পানি এক দুই চা চামচ নবজাতককে দেয়া যায়। কিন্তু এর পরের খাবারে আর পানি নয়, অবশ্যই দুধ দিতে হবে।

       কোলস্ট্রাম কি ?

আমাদের দেশে অনেকের ধারণা রয়েছে, শিশুর জন্মের পর যে হলুদ বর্ণের এবং ঘন দুধ বেরিয়ে আসে তা নষ্ট। আসলে এ দুধের নামই কোলস্ট্রাম এর পরিমাণ অত্যন্ত কম, দৈনিক আধা থেকে দেড় আউন্সের মত। এ দুধের তুলনায় ভিন্ন। এতে অধিক পরিমাণ আমিষ থাকে। আর এ আমিষের অধিকাংশই হচ্ছে শত্রু  জীবাণু ধ্বংসকারী অতি ‍উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ইম্যুনোগ্লব্যুলীন। এর শিশুর দেহে প্রবেশে করে শিশুর খাদ্যনালী এবং তার দেহকে বিভিন্ন  রোগ জীবানুর হাত থেকে রক্ষা করে। এ ছাড়াও এতে লাইজোজাইম ও ল্যাকটোফেরীন রয়েছে। এরারও শিশুকে রোগ জীবাণূর আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে সহায়তা করে। এ দুধে ইলেকট্রোলাইটের পরিমাণও পরিপক্ব দুধের তুলনায় বেশি, কিন্তু স্নেহ ও শর্করার পরিমাণ কম। মনে রাখতে হবে, কোলস্ট্রাম বা প্রথম দুধ কোন ক্ষতিকর জিনিস নয় বা নষ্ট দুধও নয়। এটা এমন এক ধরনের বিশেষ ‍দুধ, যার মাধ্যমে মা তার ছোট্র শিশুর দেহে জন্মের পরপরই প্রবেশ করিয়ে দিতে পারেন বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, যেন সে বিভিন্ন পারিপার্শ্বিকতার হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারে। আর ছোট্র শিশুর জন্য এ ক্ষমতা অত্যান্ত জরুরী, কারন এ বয়সে তার রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা থাকে না।

মায়ের দুধ শ্রেষ্ট কেন ?

       মায়ের দুধ শিশুর জন্য তৈরি। গরু বা কৌটার দুধ শিশুর জন্য তৈরি হয়ন। তাই মায়ের দুধের বেশ কিছু বিশেষত্ব রয়েছে যা অন্য কোন দুধে থাকতে পারে না, সে কৃত্রিম উপায়ে যতই মায়ের দুধের মত করা হোক না কেন। নীচে মায়ের দুধের বিশেষত্বসমূহ সংক্ষেপে দেয়া হলোঃ

১) মায়ের দুধ সহজেই পাওয়া যায়, এ দুধ শিশুকে দেয়ার জন্য বানানো, ফুটানো বা অন্য কোন ঝামেলার দরকার হয় না। এ দুধের তাপমাত্রা সবসময়ই শিশুর খাওয়া উপযোগী। তা ছাড়া এ দুধ সর্বদাই টাটকা এবং নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

২) বুকের দুধ পেতে হলে বাড়তি কোন খরচের দরকার হয় না। শিশু গর্ভে আসার পর, মাকে এমনিতে কিছু বাড়তি খাবার দিতে হয়। স্তন্যদানকালে শুধু সে বাড়তি খাবারের পরিমাণটা আরেকটু বাড়িয়ে দিলেই চলে। এ বাড়তি খাবার বলতে যেমন বাদাম, ডিম, দুধ, মাছ, মাংস, মাখন, রুটি হতে পারে, তেমনি ভাত, ডাল, শাকসবজিও হতে পারে। মোটের উপর মা দুধের মাধ্যমে নিজের শরীর থেকে যে শক্তি হারাচ্ছেন, অতিরিক্ত খাবারের মাধ্যমে তা তার দেহে ফিরে এলেই হলো।

সুতারাং দেখা যায়, বোতলের ‍দুধ এবং সেই সাথে বোতল, চামচ, ব্রাশ নিপল ইত্যাদি কেনার যে বিরাট খরচ, বুকের দুধ দিলে তার দরকার হয় না।

৩) বুকের দুধ খেলে শিশুরা বেশ কিছু রোগে আনুপাতিক হারে অনেক কম ভুগে থাকে। আর সেসব রোগের মাঝে নিচেরগুলোর নাম করা যেতে পারেঃ ক) পেটের পীড়া ও পেটের অসুখ,  তথা পাতলা পায়খানা। কারণ মায়ের দুধে যে ইম্যনোগ্লব্যুলীন ও অন্যান্য জীবাণুনাশক উপাদান রয়েছে তারা এসব রোগের জীবানুর হাত থেকে শিশুকে রক্ষা করে।

খ) নবজাতকের টিট্যানি মায়ের দুধ খেলে কম হয়।

গ) কম আমিষজনিত রোগ। কারণ মায়ের দুধের আশিষই হচ্ছে শিশুর জন্য একমাত্র দুরকারী আমিষ।

ঘ) শিশুর বিভিন্ন ধরনের চর্মরোগ বুকের দুধ খেলে কম হয়।

ঙ) গরুর দুধের প্রতি এলার্জি বুকের দুধ খেলে কখনোই জন্ম নিতে পারে না।

৪) মায়ের দুধে রয়েছে নিম্নলিখিত কতকগুলো অত্যাবশ্যকীয় উপাদান যা অন্য কোন দুধে নেই।

ক) এন্টিবডি বা রোগ প্রতিরোধক আমিষ।

খ) বিশেষ এক ধরনের জীবানুনাশক কোষ।

গ) পাচক রস যা হজমে সাহায্য করে।

ঘ) কমপ্লিমেন্টস নামক দেহ রক্ষী এক অত্যাবশ্যকীয় উপাদান।

ঙ) ইন্টারফেরোন নামক জীবাণু বিধ্বংসী এক আমিষ উৎপাদনকারী বিশেষ ধরনের কোষ।

চ) টরীন নাম এক অ্যামাইনো এসিড, যা শিশুর মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য দরকারী।

ছ) বিফিড ফ্যাক্টর, যা শিশুর খাদ্যনালীর ভিতর ল্যাক্টোব্যাসিলাস বিফিডাস নামক এক জীবাণু উৎপাদনে সহায়তা করে। আর এর ফলে খাদ্যনালীর রসের অম্লতা বেড়ে যায় যা অন্য কোন রোগের জীবাণুকে ধ্বংস করে এবং বংশ বিস্তারের বাধা প্রদান করে।

৫) হাম, মাম্পস, পলিওমালাইটিস ইত্যাদি রোগের রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা প্রথম কয়েক মাসের জন্য, অর্থ্যাৎ টাকা ইঞ্জেকশনা শুরু আগে পর্যন্ত মায়ের দুধের মাধ্যমেই শিশুর দেহে প্রবেশ করে।

৬) শিশুকে স্তন্যাদান করার সময় মা এক আশ্চর্য ধরনের পরিতৃপ্তি লাভ  করেন, শিশুর মাঝেও দেখা যায় তেমনি এক অনাবিল আনন্দ। ফলে তাদের মাঝে এক নিবিড় আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয়, যা অন্য কোন উপায়েই গড়ে তোলা সম্ভব নয়।

৭) নিয়মিত বুকের দুধ খেলে শিশুর সাধারণতঃ কোষ্ট কাঠিন্য হয় না। গরুর দুধ বা কৌটার দুধে রয়েছে ক্যাসেইন নামক এক আমিষ, যা সহজে হজম হতে চায় না। এ ছাড়া গরুর দুধের স্নেহও গজম করা শিশুর পক্ষে কঠিন। পক্ষান্তরে বুকের দুধের স্নেহ ও আমিষ সহজেই হজম হয়।

৮) গরুর দুধে সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ইত্যাদির পরিমাণ অত্যান্ত বেশি। আপাতঃ দৃষ্টিতে এটাকে ভালো মনে  হলেও শিশুর কচি দেহের জন্য এর বেশি পরিমাণ ক্ষতির কারণ হয়ে দাড়ায়। তা ছাড়া মজার ব্যাপার হলো, গরুর দুধের ক্যালসিয়াম, ও ফসফরাস মিলে, তা একটা যৌগ পর্দাথ তৈরি করে যা দেহে শোষিত হয় না। ফলে গরুর দুধে ক্যালসিয়াম পরিমাণে বেশি থাকলেও তা শোষিত না হওয়ার কারণে শিশুর রক্তে ক্যালসিয়ামের স্বল্পতা দেখা দিতে পারে। পক্ষান্তরে বুকের দুধের ক্যালসিয়াম পুরোটাই শোষিত হয় এবং ক্যালসিয়াম স্বল্পতা দেখা দেয় না।

৯) বুকের ‍দুধের রাসায়নিক অন্যান্য পদার্থসমূহের অনুপাত শিশুদের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত, গরুর দুধে এর পরিমাণ বেশি অথবা কম।

১০) বুকের দুধে ভিটামিন এ সি এবং ডি এর পরিমাণ গরু বা কৌটার দুধের চেয়ে বেশি। আর এ সমস্ত ভিটামিন শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য অত্যান্ত দরকারী।

১১) বুকের ‍দুধ খাওয়াবার সময় দ্বিতীয়বার গর্ভধারনের সম্ভাবনা কম থাকে। তা ছাড়া সম্ভবতঃ স্তনের ক্যান্সারও কম হয়। ইদানিং বলা হচ্ছে, বুকের দুধ খেলে পরবর্তী জীবনে হৃদরোগ হবার সম্ভাবনা কমে যায়।

সুতারাং দেখা যায়, ছোট্র শিশুর একমাত্র খাবার হচ্ছে মায়ের বুকের দুধ। জন্মের পর থেকেই তা খাওয়াতে শুরু করতে হবে। আর বয়স বাড়ার সাথে সাথে বুকের দুধের সঙ্গে অন্য খাবার যুক্ত করে তার চাহিদা মেটাতে হবে।

 


Leave a Reply