শিশুর কোষ্ঠকাঠিন্য -baby constipation

  • 0

শিশুর কোষ্ঠকাঠিন্য -baby constipation

শিশুর কোষ্ঠকাঠিন্য – baby constipation

ডা. কাজী মাহবুবা আক্তার

ধরা যাক কোনো শিশু সপ্তাহে মাত্র দুবার পায়খানা করে। তবে এতে করে তার কোন প্রকার শারীরিক কোন অসুবিধা যেমন- পেট ব্যাথা, পেট শক্ত হয়ে থাকা, পরিমাণমতো খেতে না পারা ইত্যাদি হচ্ছে না এবং তার পায়খানাও তেমন কঠিন নয় বরং স্বাভাবিক। তাহলে বোঝা যাবে সে কোষ্ঠকাঠিন্যে ভুগছে না বরং এটাই তার ক্ষেত্রে স্বাভাবিক ও নিয়মিত পায়খানা হওয়া। আবার কোন শিশুর যদি প্রতিদিন পায়খানা করার অভ্যাস থাকে এবং একদিন পায়খানা বাদ পড়লেই উপরোক্ত শারিরিক অসুবিধাগুলো দেখা দেয়, তাহলে তখন সে কোষ্ঠকাঠিণ্যে ভুগছে বলে বুঝতে হবে। অতএব দেখা যাচ্ছে, নিয়মিত পায়খানা হওয়া একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম। আর কারো ক্ষেত্রে এই নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটলে এবং উপরোল্লিখিত শারিরীক অসুবিধাগুলো ঘটল তখন তাকে কোষ্ঠকাঠ্যিন্যের রোগী বলা যাবে।

বেশীর ভাগ শিশুর ক্ষেত্রেই দেখা যায় তার কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণ খাদ্যজনিত সমস্যা। আমাদের খাদ্যতন্ত্র এমনভাবে গঠিত যে, এটি অধিক খাদ্য এবং অধিক পরিমাণে তন্ত্রযুক্ত খাদ্য যেমন- শস্যদানা, শিম, ফলমূল, শাকসবজি ইত্যাদি খেলে ভালোভাবে কাজ করতে পার। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেক শিশু সঠিক পরিমাণে এ সকল খাবার খাচ্ছে না বা খেতে পছন্দ করে না।

কোষ্ঠকাঠিন্যের আরেকটি কারণ হিসেবে দেখা যায়, শিশুর পায়খানা করার স্থান পরিবর্তন, যেমন কোন শিশুকে যখন প্রথম প্রথম পটি ছেড়ে টয়লেট নিয়ে পায়খানা অভ্যাস করানো হয় তখনো শিশুর কোষ্টকাঠিন্য দেখা যায়। এতে পুরানো অভ্যাসের ব্যতিক্রমের জন্য শিশু টয়লেটে যেতে চায় না আর যেহেতু শিশু পায়খানা করার জন্য মানসিকভাবে ঠিক প্রস্তত থাকে না তাই তার অস্ত্রও ঠিকমতো কাজ করে না এবং পায়খানা অন্ত্রে জমা থাকে।

কোষ্ঠ্কাঠিন্যের কারণ যাই হোক না কেন, খুব সহজেই এটি প্রতিরোধ করা ও কাঠিয়ে ওঠা সম্ভব।

ছোট শিশুর ক্ষেত্রে

পিচ্ছিলকারক পদার্থ দিয়ে চেষ্টা করা যেতে পারে

দুটি শিশুর পায়খানার রাস্তা দিয়ে ‘গ্লিসারিন সাপোজিটরি’ দেয়া যেতে পারে, যা যোকোন ফার্মিসিতেই সহজলভ্য। এটি দুভাবে কোষ্টকাঠিন্য দুর করে। প্রথমত, এটি বৃহদন্ত্রের রেক্টামকে উত্তেজিত করে পায়খানা হওয়ার জন্য এবং দ্বিতীয়ত, এটি পায়খানার রাস্তাকে পিচ্ছিল করে। তবে মনে রাখতে হবে যে, এ পদ্ধতিটি নিয়মিত অবলম্বণ করা যাবে না, তাহলে শিশু এ পদ্ধতিতেই অভ্যস্ত ও নির্ভরশীল হয়ে পড়েবে এবং সে আর স্বাভাবিক নিয়মে পায়খানা করতে পারবে না।

হেক্টাল থার্মোমিটার ব্যবহার করা যেতে পারে:

পরে যদি ডাক্তারি পরীক্ষায় দেখা যায় যে, শিশু সত্যিই কোষ্টকাঠিন্যে ভুগছে তাহলে একটি রেক্টাল থার্মোমিটার কিনে তাতে ভালে করে পেট্রেলিয়াম জেলি লাগিয়ে শিশুর পায়খানার রাস্তা দিয়ে দেড় ইঞ্চি মতো ঢুকিয়ে কিছুক্ষণ রেখে দিয়ে তারপর বের করে আনতে হবে। এ পদ্ধতিতেও অনেক সময় কাজ হয়।

একটু বড় শিশুদের ক্ষেত্রে

সাময়িকভাবে জোলাপ ব্যবহার করা যেতে পারে

শিশুর বয়স যদি ১০ বছর বা তার অধিক হয় এবং সে কোষ্টকাঠ্যিন্যে ভোগে সেসব ক্ষেত্রে সাময়িক সুস্থতার জন্য জোলাপ যেমন- ’মিল্ক অফ ম্যাগনেসিয়া’ অথবা খনিজ তেল ইত্যাদি ব্যবহার করে দেখা যেতে পারে। তবে এগুলো চিকিৎসকের পরামর্শমতো ব্যবহার করা উচিত।

প্রতিদিনের খাবারের নামগুলো লিপিবদ্ধ করে রাখতে হবে

শিশুর কোষ্টকাঠিন্যের কারণ যদি খাদ্যজনিত হয় তাহলে তার দৈনিক খাদ্য তালিকা থেকে তা শনাক্ত করা সহজ হবে। যদি দেখা যায়, দৈনিক যাই খাক তার সাথে একগ্লাস দুধ সে অবশ্যই খায় তাহলে হয়তো এই দুধই তার কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণ হতে পারে। সেক্ষেত্রে দেখা যাবে , তার খাদ্য তালিকা থেকে এই দুধ বাদ দিলে আবার শিশু স্বাভাবিক নিয়মে পায়খানা করছে। আরো যেসব খাবার শিশুর কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণ হতে পারে তার মধ্যে আপেলের সস, কলা, সাদা ভাত ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

  • শিশুকে অধিক তন্তুযুক্ত খাবার যেমন, ফল, শাকসবজি, আটার রুটি ইত্যাদি বেশি করে খাওয়াতে হবে। সাধারণত খরগোশ যে ধরনের সবজি খায় সেগুলোকে নাশতা হিসেবে শিশুর সামনে পরিবেশন করা যেতে পারে।

শিশুকে ভারী খাবার পরিবেশনের মর্ধবর্তী সময়ে যদি শিশু ক্ষুদার্ত হয়ে পড়ে তাহলে তখন তাকে বিভিন্ন কাঁচা সবজি যেমন, গাজর, মুলা, শাকপাতা ইত্যাদি খেতে দিলে তা কোষ্টকাটিন্য দুর করে আর এ ধরনের খাধ্য যেহেতু কচকচ করে তাই শিশু এগুলো খেতে একধরনের আনন্দ অনুভব করে।

* যেসব সবজি খেতে শিশু বিরক্তবোধ করে, েবা খেতে চায় না সেগুলোর চেহারা পাল্টে শিশুর সামনে উপস্থিত করতে হবে।

যেমনঃ কোনো শিশু যদি ফুলকপি খেতে না চায় তাকে বুঝানো যেতে পারে যে এটি একটি ছোট গাছ। এতএব সেটি খেলে একেবারে সম্পূর্ণ একটা গাছ খাওয়া হয়ে যাবে এবং ব্যাপারটি অনেক মজার হবে, শিশু যদি এতো না পটে তাহলে সবজিটিকে ভিন্ন আকৃতিতে কেটে ময়দা বা ডিমের মধ্যে ডুবিয়ে ভেজে দেয়া যেতে পারে, তাহলে শিশুটি বুঝবে না সে কি খাচ্ছে, তাই আর আপত্তিও করবে না। এভাবে বিভিন্ন ছলনার আশ্রয় নিয়ে শিশুকে প্রয়োজনীয় সবীজ খাওয়াতে হবে।

* যেহেতু শিশুরা সবজির চেয়ে ফল বেশী পছন্দ করে অতএব শিশুদের বেশি করে কোষ্টকাঠিন্যে উপকারী ফলগুরো খাওয়াতে হবে: আপেল, পিচফল, নাশপাতি ইত্যাদি ফল কোষ্টকাঠিন্যে যথেষ্ট উপকারী। তাই শিশুকে এই জাতীয় ফল বেশি বেশী খাওয়াত হবে যেন সে কোষ্টকাঠিন্যে না ভোগে। আবার ‘আপেল সস’ ’কলা’ ইত্যাদি উল্টো কোষ্টকাঠিন্য বাড়ায়, তাই শিশু কোষ্টকাঠিন্য ভুগলে তাকে এসব খাওয়া থেকে বিরত রাখতে হবে।

* শিশুকে প্রচর পরিমানে তরল খাবার খাওয়াতে হবে।

* শিশুকে খুব অল্প বয়সে জোর করে পায়খানায় যাওয়ার অভ্যাস করানোর চেষ্টা না করাই ভালো। এসব ক্ষেত্রে ধের্য ধরে শিশুর পায়খানায় যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করার জন্য অপেক্ষা করা ভালো। কেননা অনেকক্ষেত্রেই শিশুকে আদেশের সুরে কথা বললে সে তা মানতে চায় না, সে তার নিজের প্রাধন্য দেখানোর জন্য বরং উল্টো কাজটিই করে।

কখন ডাক্তারের শরণাপন্ন হবেন?

শিশুর কোষ্টকাঠিণ্য অনেক সময়ই গুরুতর রোগের লক্ষণ হিসেবে দেখা দিতে পারে। তাই যে শিশু বুকের দুধ খায়, তার একনাগাড়ে দুই তিনদিন পায়খানা না হলে তাকে অবশ্যই ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে। আর একটু বড় শিশুদের ক্ষেত্রে এখানে উল্লিখিত লক্ষণগুলো প্রকাশ পেলে তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া অবশ্য কর্তব্য। লক্ষণগুলো হচ্ছেঃ

* যদি শিশুর প্রচন্ড পেটের ব্যথার সঙ্গে পেট ফুলতে থাকে এবং শিশু ঠিকমতো খেতে না পারে (আন্ত্রিক অবরোধ বা অন্ত্রের অন্য কোনো সমস্যার কারণেও এ রকম ঘটতে পারে)

* যদি পায়খানার সাথে রক্ত আসে

* যদি কোনো আবেগজনিত কারণে (টয়লেট ট্রেইনিঙের সময়) শিশু পায়খানা আটকে রাখে।

* যদি হঠাৎ করে শিশু অল্প একটু পায়খানা করে। কেননা অনেকদিন পায়খানা জমতে জমতে শিশুরপায়ুপথের স্ঢিংটার অনেক সময় অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়লে এমনটি হতে পারে।


Leave a Reply