শিশুর চোখের অটুট আলো চাই

  • 0

শিশুর চোখের অটুট আলো চাই

Category : Health Tips

শিশুর চোখের অটুট আলো চাই

সাদিয়া আফরোজা নাজমি

আজকের শিশু, আগামীর স্বপ্ন। শিশু মানেই আনন্দ,  শক্তি আর ভবিষ্যত। শিশুদের জন্য তাই দরকার ভালো ভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ। চাই পুষ্টি নিরাপত্তার শিক্ষা।

কিন্তু এদেশ দরিদ্র। এত সহজ নয় শিশুদের প্রয়োজনগুলো মেটানো। অনটনে ম্রিয়মান মানুষ খেতেই পায় না ভালোভাবে। শিশুর পুষ্টি জোগাবে কি ?

এ পরিণতি খুব ভয়াবহ। দারিদ্যের কারণে শিশুরা অপষ্টির শিকার হচ্ছে। নানা রোগ বালাই তাদের চেপে ধরছে। রাতকানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এমনকি পুরোপুরি অন্ধ হয়ে যাচ্ছে অনেকে। সহজে হাম ডায়রিয়া, শ্বাস কষ্টে ভুগছে।

এসব রোগের সহজ আক্রমণ থেকে শিশুকে রক্ষা করা জরুরী। এ দায়িত্ব সকলের। ব্যক্তির, সরকারের এজন্য সরকার এগিয়ে এসছে বিশেষ কর্মসূচী নিয়ে। শিশু অপুষ্টির একটা বড় কারণ ভিটামিন এর অভাব। এই অভাব দূর করার লক্ষ্যে এখণ সারাদেশে চলছে ভিটামিন এ সপ্তাহ। শুরু হয়েছে গত ৭ জুন থেকে চলবে ১৫ জুন তারিখ পর্যন্ত।

এ সপ্তাহের মূল কর্মসূচি একটাই। দেশের সকল শিশুকে ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানো। ইপি আই কর্মসূচির আওতায় এদেশের সব ওয়ার্ডে রয়েছে টিকাদান কেন্দ্র। ভিটামিন এ কর্মসূচিতে এই কেন্দ্রগুলো ব্যবহার করে শিশুদের ক্যাপসুল খাওয়ানো হচ্ছে।

অপুষ্টির কারণে অনেক শিশু চোখের আলো হারিয়ে ফেলে। হয়ে যায় পুরোপুরি অন্ধ। কেউ বা রাতকানা। দেশে ছ বছরের কম বয়সী তিরিশ হাজার শিশু প্রতিবছর অন্ধ  হয়ে যায়। এর মানে প্রতি ঘন্টায় দৃষ্টি শক্তি হারায় তিন জনেরও বেশি।

এতো গেলো অন্ধ হয়ে যাওয়া শিশুর সংখ্যা। অন্ধ হওয়ার পথে রয়েছে আরো নয় লাখ। এরা সকলে অপুষ্টির শিকার। অন্ধত্বের কিছু কিছু লক্ষণ এখনই দেখা দিচেছ এদের চোখে। কি ভয়ানক দুভার্গ্য অপেক্ষা করছে এদের জন্য। এই সুন্দর পৃথিবীকে দেখার আলো নিবে যাবে তাদের চোখ থেকে।

পুরোপুরি অন্ধ হয়ে যাওয়ার চেয়ে রাতকানা রোগে আক্রান্ত হয় অনেক বেশি শিশু। গ্রামাঞ্চলে প্রতি একশটির শিশুর মধ্যে তিনটির এর শিকার। শহরে এই হার উচু।

অন্ধ বা রাতকানা হওয়ার আগে বেশিরভাগ শিশু অন্যন্য রোগে ভোগে। কারো ডায়রিয়া হয়। কেউ আক্রান্ত হয় হামে। কৃমি তো প্রায় সবারই থাকে। প্রতি দশ জনে নয় জন এর শিকার।

ভিটামিন এ র অভাবে কেবল শিশুরা নয়, গর্ভবতী মায়েরাও ভোগেন। আগামী দিনের শিশুর উপর পড়ে এর বিরূপ প্রভাব। এমনকি গর্ভবতী মহিলারও অপুষ্টির কারণে রাতকানা হয়ে যান। সারাদেশে এদের সংখ্যা কম নয়। বছরে প্রায় দু থেকে তিন লাখ।

বাংলাদেশে অনেক শিশুই মায়ের দুধ খায়। এরপরও এদের পুষ্টিহীনতা অনেক। কেন?

এ বিষয়ে বললেন জনসংখ্যঅ পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের ডাঃ সাঈদা বেগম। তিনি জানান, অনেক মা সঠিকভাবে শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে জানেন না। শক্ত খাবার দেয়ার নিয়ম কানুনও জানেন না অনেকে। ফলে শিশু ঠিকমত পুষ্টি পায় না। বিশেষ করে ভিটামিন এর অভাব রয়ে যায় শিশুর শরীরে। কেবল ভিটামিন এর অভাবে পূরণ করতে পারলে অনেক শিশুর জীবন বাচানো সম্ভব। আর্ন্তজাতিক সংস্থার জরিপ থেকে এ বক্ত্যেব্যের পক্ষে প্রমাণ পাওয়া গেছে।

এ বিষয়ে কথা পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের মেডিক্যাল অফিসার ডাঃ তাসনীর আরার সঙ্গে। তিনি জানান, খাদ্যভ্যাস খুব গুরুত্বপূর্ণ। এটা ঠিক না হলে শিশু শরীরে ভিটামিনের ঘাটতি দেখা দেয়। শিশুকে তাই কেবল ভাতের ভাউ বা এ ধরনের খাবার দিলে চলবে না। দিতে হবে অনেক কিছু। রঙ্গিন শাকসবজি। ফলমূল। মাছ ডিম দুধ। এছাড়া ভিটামিনের অভাব হলে নিতে হবে বিশেষ ব্যবস্থা। সরাসরি খাইয়ে দিতে হবে ভিটামিন ক্যাপসুল। তাহলে অনেক রোগের হাত থেকে তারা রেহাই পাবে।

এই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই ভিটামিন এ সপ্তাহের আয়োজন। দেশে প্রথমবারের মত পালিত হচ্ছে এই কর্মসূচি। এ সপ্তাহে ছ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুকে ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানো হচ্ছে। দেশের সব ওয়ার্ডে রয়েছে ৮ টি টিকা দান কেন্দ্র। এ কেন্দ্রগুলোতেই ভিটামিন এ খাওয়ানো হচ্ছে। পালাক্রমে একেকদিন একেকটি কেন্দ্রে। স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের মাঠকর্মীরা এ কাজ করছেন।

ভিটামিন এ কে বলা হচ্ছে সপ্তম টিকা। ইপিআই কর্মসুচির ছয়টি টিকার পর এটি সাত নম্বর। রোগ বালাই ও অপুষ্টি ঠেকানোর সংগ্রামে অন্যতম হাতিয়ার।

দুটি পর্যায়ে শিশুদের ভিটামিন এ খাওয়ানোর কৌশল হাতে নেয়া হয়েছে। একবার জাতীয় টিকা দিবসে। অন্যবার ভিটামিন এ সপ্তাহের মাধ্যমে। দুটো পর্যায়েই ব্যবহার করা হচ্ছে ইপিআই কেন্দ্রগুলো।

বাংলাদেশ ভিটামিন এ ক্যাপসুল বিতরণের কাজ অনেক আগে শুরু হয়েছে। প্রায় আড়াই দশক ধরে চলছে এ কার্যক্রম। ৭৩ সাল থেকে। কিন্তু সাফল্য তেমন আসেনি। ৮২-৮৩ সালে দেশে রাতকানার হার ছিল শতকরা ৩.৭৬ শতাংশ। ৮৯ সালে তা নেমে আসে ১.৭৮ শতাংশে। গত বছরে রাতকানা রোগের হার ছিল ১.১ শতাংশ।

কিন্তু বর্তমান হার সন্তোষজনক নয় মোটেও। বিশ্ব সংস্থার হিসেবে রাতকানার হার থাকতে হবে শতকরা এক ভাগের নীচে। এর উপরে হলে তা বিবেচিত হবে জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে। এই বিবেচনায় বাংলাদেশে অপুষ্টির কারণে রাতকানা রোগ এখনো একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা। সমস্যা মোকাবিলার জন্য তাই বিশেষ কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।

ভিটামিন এ বিতরণের জন্য আগে স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়ি বাড়ি যেতেন। ১৯৯৪ সাল থেকে এ পদ্ধতির পরিবর্তণ করা হয়। এখন ভিটামিন ক্যাপসুল খাওয়ানো হয় টিকা বা  স্বাস্থ্য কেন্দ্রে এনে।

নতুন পদ্ধতি প্রবর্তনের পর ইতিবাচক ফল পাওয়া যাচ্ছে। ৯৩ পর্যন্ত শিশুকে ভিটামিন ক্যাপসুল খাওয়ানোর হার ছিল শতকরা ৫০ ভাগ। বর্তামানে এই হার বেড়ে ৮৫ ভাগে দাঁড়িয়েছে।

অপুষ্টির হার কমানো ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য ভিটামিন এ খুব জরুরী। কেবল ক্যাপসুলের মাধ্যমে এই ভিটামিন এর উপাদান বাড়ানো দরকার। তাই ভিটামিন এ সপ্তাহ পালনের অংশ হিসেবে শিশুর খাদ্যমান বাড়ানোর জন্যও প্রচার চালানো হচ্ছে।


Leave a Reply