শিশুর বিকাশে পরিবারের করণীয়

  • 0

শিশুর বিকাশে পরিবারের করণীয়

Category : health tips bangla

শিশুর বিকাশে পরিবারের করণীয়

শিশু আর খেলার মাঝে রয়েছে এক নিবিড় সম্পর্ক। একজন শিশুর মনোগত গুণগুরো ও ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যগুলো সবচেয়ে নিবিড়ভাবে বিকশিত হয় খেলাভিত্তিক কাজকর্মে। অন্য ধরনের যেসব কাজ পরে নিজস্ব এক গুরুত্ব অর্জন করে, সেগুলোও গড়ে ওঠে শিশুর খেলার সময়ে, খেলা স্বতঃপ্রণোদিত মনোজগত প্রক্রিয়াগুলোর গঠনকে প্রভাবিত করে। খেলার মধ্যে, স্বতঃপ্রণোদিত মনোযোগ ও স্বতঃপ্রণোদিত স্মৃতিশক্তি বিকাশ লাভ করতে শুরু করে। বিশেষভাবে আয়োজিত পরিস্থিতির তুলনায় খেলার পরিস্থিতিতে শিশুরা আরো ভালোভাবে মনোনিবেশ করে এবং আরো বেশি স্মরণে রাখে। শিশুর পক্ষে একটা সচেতন  লক্ষ্য বেছে নেয়াটা খেলার মধ্যেই সবচেয়ে আগে ও সবচেয়ে সহজে হয়। একটা খেলার মধ্যেই সবচেয়ে আগে ও সবচেয়ে সহজে হয়। একটা খেলার শর্তগুলো দাবি করে  যে, খেলার পরিস্থিতির অর্ন্তুভুক্ত বস্তুগুলোর দিকে এবং তার সাথে জড়িত কাজ ও বিষয়বস্তুর দিকে শিশুকে মনোনিবেশ করতে হবে। কোন শিশু যদি মনোনিবেশ করতে না চায়, খেলার নিয়মগুলো যদি মনে না রাখে তাহলে অন্যরা তাকে খেলা থেকে বাদ দিয়ে দেয়। আদেশ প্রদান আর ভাবাবেগত উৎসাহের প্রয়োজনই শিশুকে বাধ্য করে উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে মনোনিবেশ করতে এবং সবকিছু মনে রাখতে। খেলার পরিস্থিতি ও তার সাথে জড়িত কাজকর্ম শিশুদের মানসিক ক্রিয়ার বিকাশকে নিয়ত প্রভাবিত করে। খেলায় শিশু কাজ করতে শেখে একটি প্রতিকল্প বস্তু দিয়ে, যেটি হয়ে ওঠে চিন্তা করার মাধ্যমে। খেলার তুলনায় শেখার প্রতি প্রাপ্তবয়স্কদের যে আমূল ভিন্ন মনোভাব শিশুরও তার প্রতি ক্রমে ক্রমে মনোভাব বদলে যায়। সৃষ্টি হয় শেখার সম্ভাবনা এবং শেখার প্রারম্ভিক সামর্থ্য।

শিশুর বিকাশে পরিবারের করণীয়

শিশুর বিকাশে পরিবারের করণীয়

মানসিক বিকাশে শিশুর স্থান

শিশু যে অবস্থার মধ্যে বাস করে ও বিকাশ লাভ করে এবং তার চারপাশের লোকের তার প্রতি যে মনোভাব গ্রহণ করে, মনস্তত্বে তাকে ব্যাক্তিত্বের বিকাশের গর্ত বরে বিবেচনা করা হয়। পরিস্থিতি শিশুকে স্থাপন করে এক উন্নত সামাজিক কাঠামো বিশিষ্ট ও ক্রিয়াশীল জাতীয় ঐতিহ্যসম্পন্ন এক বিশেষ সামাজিক পরিবেশে, শিশুর সাথে সম্পর্কিতরূপে এই পরিবেশ সামাজিক সম্পর্ক ব্যবস্থায় তার স্থানের এক বাহ্যিক বিষয় হিসেবে প্রতিভাত হয় এবং ব্যাক্তিত্বের বিকাশে বিশেষতাগুলো নির্ধারণ করে। একজন লোক কোথায় বাস করে তা একটি বাহ্যিক বিষয় হতে পারে। অতি ছোট একটি গ্রাম,  বড় গ্রাম বা লাখ লাখ মানুষের একটি শহরের অধিবাসীরা তাদের অস্তিত্ব ও বিকাশের অবস্থার ছাপ বহন করে সামাজিক সম্পর্ক ব্যবস্থায় শিশুর স্থান নির্ণীত হয় স্ত্রী পুরুষ প্রভেদ দিয়েও। পুরুষ ও নারীর সামাজিক ভুমিকা শিশুর কাছে সামাজিক মান হিসেবে প্রতিভাত হয় এবং শিশু সাধারণত সেসব ভুমিকাই অধিকার করতে চেষ্টা করে যেগুলো তার সহজাত সত্তার সঙ্গে মিলে যায়। এই অভিমুখিতাই একজন পুরুষের বা নারীর ব্যক্তিগত গুণাবলি গঠন করে, প্রতিটি ব্যাক্তিকে ব্যাক্তিস্বাতন্ত্র্য প্রদান করে।

আদান প্রদান ও ক্রিয়াকর্মে শিশুর মনোগত বিকাশ

মানুষ হয়ে ওঠার অর্থ চারপাশের লোকজন ও বস্তুনিচয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত রূপে কাজ করতে শেখা এবং নিজেদের মানিয়ে নেয়া ঠিক সেভাবে যেটা মানুষের বৈশিষ্ট্যসূচক। আমরা যখন বলি যে প্রাপ্তবয়স্কদের নির্দেশণায় শিশুটি সামাজিক  অভিজ্ঞতা ও মানব সংস্কৃতি আয়ও করে, তখন আমরা বোঝাতে চাইছি ভাষার মারফত অন্য লোকের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ার দক্ষতা আয়ত্ত করার দক্ষতা, সামাজিক প্রথা অনুযায়ী আচরণ করার দক্ষতা আয়ত্ত করার কথা।

এভাবে শিশুর চাহিদা আর আগ্রহ নিয়তই প্রাপ্তবয়স্কদের সঙ্গে সংযুক্ত। শিশুর সামর্থে্যর প্রসারসাপেক্ষে   এই সংযোগ নতুন নতুন রূপ লাভ করে। নতুন নতুন চলন চালন আয়ত্ত করায় তার সামর্থ্য বাড়ে এবং সেটা প্রধান কাজের নতুন নতুন রূপের আত্মপ্রকাশের একটা পুর্বশর্ত। কিন্তু নতুন চলন চালন আয়ত্ত হলেই নতুন ধরনের কাজ দেখা দেয়  না। একটি শিশুকে খেলনা দিয়ে বিশেষ বিশেষ গতিবিধির কাজ শেখানো যেতে পারে (পুতুলকে দোলানো, তাকে বিছানার শোয়ানো) কিন্তু তার চারপাশের প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের ব্যাপারটায় একটা আগ্রহ, প্রাপ্তবয়সস্কের ক্রিয়াগুলো করার তীব্র বাসনা যদি তার মধ্যে গড়ে না ওঠে, তাহলে এ সমস্ত কাজের ফলে ভূমিকা পালনের ক্রিয়াটি ঘটে না।

শিশুর আত্মস্বীকৃতির চাহিদা

সমাজে শিশু তার স্থান অধিকার করে নিতে চায়। তার মূল্যটা অন্যের কাছে কতটা, কতটা সে স্বীকৃত পেল, প্রশংসা পেল, তার ওপর নিজের মূল্যবোধ নির্ভর করে। শিশুর কাজের প্রশংসা তাকে মর্যাদা দেয় এবং নিন্দা করলে তাকে তুচ্ছ করা হয় বলে মনে করে। প্রশংসায় যে তৃপ্তি শিশু লাভ করে, তাই আত্মস্বীকৃতির চাহিদা মেটায়। অন্যের স্বীকৃতি তার সম্মানবোধ জাগ্রত করে এবং অন্যের নিন্দায় সে অমর্যাদা অনুভব করে। আত্মস্বীকৃতির বাস্তব উদ্দেশ্য হচ্ছে শিশুর মনে প্রেষণা জোগানো। এই প্রেষণার বশে আবার সে প্রতিযোগীতামূলক কার্য সম্পাদন করার প্রেরণা পায় এবং সেই কাজে তারই কৃতকার্যতার আনন্দ তাকে দেয় আত্মবিশ্বাস। পুণঃসংযোজিত আত্মবিশ্বাস তাকে নতুন কাজে নতুন ভাবে অনুপ্রাণিত করে। শিশু ভালো কাজ করলে, ভালোভাবে সুন্দরভাব পড়ালেখা ও পড়ালেখা সংক্রান্ত কাজ সুন্দরভাবে সম্পন্ন করলে যেমন প্রশংসা ও আত্মতৃপ্তি লাভ করে, অণ্যদিকে অনেক সময় নীতিগর্হিত শিক্ষাবিরোধী আচরণের দ্বারাও সে সমবয়সীদের চোখে নেতা বনে যায়। সেও এক ধরনের স্বীকৃতি লাভ।

আধুনিক যুগে শ্রেণীকক্ষে যারা অপরাধমূলক কাজ করে তারা কিছু ছাত্র ছাত্রীর কাছে এমন বাহবা পায় যে, অনেক সময় তারা ভালো ছেলেদের চেয়েও অধিক স্বীকৃতি লাভে সমর্থ হয়। এটা স্বীকৃতি লাভের একটা ত্রুটিও বলা যায়। আবার কিছু কিছু দুর্বলভাবাপন্ন ছেলে আছে যারা অন্যদের সাথে কথায়, পড়ালেখায় বা গায়ের জোরে  এটে উঠতে পারে না।

শিক্ষার মুদ্রাদোষ অবহেলা করবেন না

মুদ্রাদোষজনিত আচরণ বাল্যকাল ও কৈশোরকালের মানসিক চাপের লক্ষণযুক্ত আচরণের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বেশি দেখা যায়। হাতে, মুখে মাথায় বা ঘাড়ে, গলার পেশিতে সাধারণত মুদ্রাদোষজনিত পেশি সঞ্চালণ দেখা যায়। এই বেশি সঞ্চালন সম্পর্কে শিশুর কখনো জ্ঞান থাকে না। অজ্ঞাতভাবেই এই সঞ্চালন ঘটে থাকে। মুদ্রাদোষের পর্যায়ে পড়ে-

  • নাক কোচকানো
  • ক্ষণে ক্ষণে হাই তোলা।
  • ঘাড় বাকানো
  • মাথা নাড়ানো
  • হাত পা দোলানো ইত্যাদি

মুদ্রাদোষের কারণ অবদমিত চাহিদার অতৃপ্তি অথবা অবদমিত অন্তর্দ্বন্ধ্ব। মুদ্রাদোষের স্বরূপ থেকে অনেক সময় অন্তনির্হিত দ্বন্ধের স্বরূপ জানা যায়। কখনো কখনো এমন মুদ্রাদোষও দেখা যায়, যা প্রত্যেক্ষ করলে মনে হবে ব্যক্তি বুঝি কোনো মানুষের প্রতি আক্রমণাত্বক ভাবভঙ্গি প্রকাশ করেছে। মুদ্রাদোষের মতো অস্থির বিচরণের এ সমস্যা মা বাবার কঠোর শিক্ষাদানে পদ্ধতির কুফল হিসেবে দেখা দেয়। অনেক শিশুকে দেখা যায় যে, স্থিরভাবে এক জায়গায় বসতে পারে না, কেবল ইতস্তত ঘুরে বেড়ায়। মা বাবার কঠোর শাসন পীড়নের হাত থেকে বাচার জন্য যে ইতস্তত নড়াচড়াগুলো তাকে সম্পাদন করতে হয়েছে, অভ্যাসগত অস্থিরতা ও চঞ্চলতা তারই পুনরাবৃত্তি মাত্র। শিশুর মাঝে কোনো ধরনের মুদ্রাদোষ দেখা দিলে অবিলম্বে মনোবিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন।

 

অধ্যাপক ডা. এএইচ মোহাম্মদ ফিরোজ

পরিচালকঃ মনোজগত সেন্টার, রোড নং-৪, বাড়ি নং-৫, ধানমন্ডি, ঢাকা।

অধ্যাপক, সাইকিয়াট্রিঃ রয়েল কলেজ অব ফিজিশিয়ান্স অ্যান্ড সার্জন্স


Leave a Reply