শিশুর স্মৃতিশক্তি

  • 0

শিশুর স্মৃতিশক্তি

Category : health tips bangla

শিশুর স্মৃতিশক্তি

অনেক অভিভাবক অনুযোগ করে থাকেন তাদের শিশুরা রীতিমতো পড়াশোনা করছে এবং শিখছেও। কিন্তু এ শেখা ক্ষণস্থায়ী। অল্প সময়ের মধ্যেই তা ভুলে যাচ্ছে। তা হলে কি ধরে নিতে হবে শিশুর স্মৃতিশক্তি দুর্বল ? এই দুর্বল স্মৃতিশক্তিকে কি ছড়িয়ে সতেজ করা যায় না ? এক কথায় এ প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বিষয়টার সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণে প্রবেশ করছি। আসলে স্মৃতিশক্তি জিনিস টা কী ? সোজা কথায় অধীত ও অভিজ্ঞতালব্দ কোনও কিছু মনে ধারণ করার ক্ষমতাকে স্মৃতিশক্তি বলা যেতে পারে। এটা এমন একটা মানসিক ক্ষমতা যার সাহায্যে প্রয়োজন অতীত স্মৃতিচারণ সম্ভব। অতীত তো মৃত নয় অতীতে সুপ্ত। তাকে জাগ্রত করে আমাদের স্মৃতিশক্তি। স্মৃতি আত্মশক্তির জাগ্রত অংশবিশেষ। এটা প্রতিটি ব্যাক্তির একান্ত নিজস্ব। প্রকৃতপক্ষে স্মৃতিশক্তি প্রকৃতিপ্রদত্ত। এটা নিয়ে ডাক্তারি করা চলে না। ইংরেজী আভিধানিক সংজ্ঞায়’- মেমোরি ইজ দ্য পাওয়ার অব রিটেইনিং অ্যান্ড রেসপন্ডিং মেন্টেল অর সেনসরি ইমপ্রেশন’। বস্তুতপক্ষে এই ক্ষমতার ওপর নির্ভর করেই আমাদের জীবন চালিয়ে যেতে হয়। জে এম ব্যারি স্মৃতিশক্তি সম্বন্ধে একটা সুন্দর কথা বলে গেছেন –’ গড গেইভ আস মেমোরি স দ্যাট উই মাইট হেভ রোজেস ইন ডিসেম্বর। তাহলে স্মৃতিশক্তি ঘিরে আছে ধারণা, ধারণাশক্তি এবং সংরক্ষিত ধারণার স্মৃতি অনেকটা সম্প্রতিকালে কম্পিউটারে ‘মেমোরি’ র মতো।

স্মৃতি – বিভ্রাট ও কারণঃ স্মৃতি বিভ্রাট আমাদের জীবনে নানা গুরুতর সমস্যার সৃষ্টি করে থাকে। সময় সময়  এটি জন্ম দেয় নানা যন্ত্রণাময় ও অস্বস্তিকর পরিস্থিতির। চিকিৎসকদের মতে স্মৃতিশক্তি হারানোর বা হ্রাসের অনেকগুলো কারণ থাকতে পারে। যেমন সন্ন্যাস রোগ, বার্ধক্য, তীব্র মানসিক নৈরাশ্য, মাথায় গুরুতর আঘাত, মস্তিস্কে জটিলতার কোনও ব্যাধি, উচ্চ রক্তচাপ প্রভৃতি। বর্তমান প্রবন্ধে লেখক সামগ্রিকভাবে স্মৃতিশক্তি নিয়ে বিচার না করে মুলত শিশুর স্মৃতিশক্তি নিয়েই আলোচনায় প্রয়াসী। দেখা গেছে, কিছু সংখ্যক ছাত্র ছাত্রী স্মৃতি বিপর্যের শিকার হচ্ছে। পরীক্ষায় আশানূরূপ ফল করতে ব্যর্থ হয়ে অনেকে মানসিক বিকারগ্রস্থ এমনকি আত্মহননের পথও বেছে নিচ্ছে। লেখক মনোবিজ্ঞানী নন। কাজেই মনস্তাত্বিক বিচার সম্ভব নয় সমাজতাত্বিক দৃষ্টি ভঙ্গি ও লেখকের অভিজ্ঞতালব্ধ বিচারে এ বিপর্যের জন্য দায়ী শিশুদের ওপর অতিরিক্ত চাপ। শিশুদের শিশুকালও অভিভাবক আগেই হরণ করে নিয়েছেন। তদুপরি নিজেদের উচ্চাশা চরিতার্থ করার মানসে এবং জীবনে নিজে যা হতে পারেন নি শিশুটিকে দিয়ে সেই প্রত্যাশা বাস্তবায়িত করার জন্য, শিশুর সামর্থ্য বিচারের কোনও তোয়াক্কা না করেই, শিশুদের ওপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন। তারা একবারও ভাবেন না ব্রেনেরও বিশ্রাম প্রয়োজন। মাত্রাধিক্য চাপে মস্তিস্কের সাধারণ ও স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয় ফলে শিশু স্মৃতিতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। আজকাল শিশুদের চিন্তা করার সময় নেই। বিনোদনের ব্যবস্থা থাকলেও তা থেকে তারা বঞ্চিত। বোঝাবুঝির ধার না ধারে হাইমার্কস পাওয়ার জন্য মুখস্ত আর মুখস্ত করতে ব্যস্ত। না বুঝে মুখস্ত করার ফলে স্মৃতিনির্ভর মধ্যম মেধা ছাত্রের স্মৃতি বিভ্রম  এক স্বাভাবিক পরিণতি। ডাফিন দ্যা মারিয়ার স্মৃতিশক্তি সম্বন্ধে লিখেছেন দেয়ার স্যুড বি এন ইনজেনশন দ্যাট বটলস আপ মেমোরি লাইক এ পারফিউম অ্যান্ড ইট নেবার পেডেড, নেভার গট স্টেট অ্যান্ড হোয়েনএভার আই ওয়ানটেড টু আই ক্যুড আনকর্ক দ্য বটল অ্যান্ড লিভ দ্য মেমোরি অল ওভার ‘এগেইন’। এটা তার নিজস্ব কল্প ভাবনার প্রকাশ। বাস্তবে তা তো সম্ভব নয়্ সবরকম ব্যাধিল চিকিৎসরা দাবি করেন, স্মৃতিশক্তি তারা বাড়াতে পারেন বা উন্নত করতে তারা সক্ষম। সত্যি কথা বলতে কী, স্মৃতিশক্তি ওষুধ ব্যবহারে বাড়ে  না। একমাত্র ইন্টারেস্ট বৃদ্ধিই পারে স্মৃতিশক্তিকে উন্নত করতে। কোনও টনিকিই স্মৃতিশক্তিকে টোনাআপ করতে সমর্থ্য নয়।

স্মৃতিশক্তিকে সতেজ ও উন্নত করতে ইন্টারেস্টের সহায়ক ভূমিকায় থাকতে হবে একাগ্রতা, মনোযোগ, ধৈর্য, প্রতিনিয়ত অনুশীলন ও প্রচেষ্টা।  এগুলোর যুগপৎ সমন্বয়ই বাড়াতে পারে স্মৃতিশক্তির উৎকর্ষতা। তবে এ কথা স্বীকার্য যে চিকিৎসা বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নতির ফলে চিকিৎসরা এখন মস্তিষ্কের বিভিন্ন ধরনের দুরারোগ্য ব্যাধি সারাতে তদাজনিত বিলোপ স্মৃতিশক্তিকে ফের জাগ্রত করতে অনেক ক্ষেতে সক্ষম। তাছাড়া, বয়স্ক ব্যাক্তিদের বয়সজনিত স্মৃতিশক্তির ক্রম অবনতির ধারাকে রুখতে বা বিলম্বিত করতে পারেন। কিন্তু স্মৃতিশক্তির বিকাশ বা বৃদ্ধি তাদের চায়ের কাপ নয়।

স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধির উপায়ঃ স্মৃতিশক্তির উৎকর্ষতা সাধনে নিম্ন প্রদত্ত বিষয়গুলো প্রনিধানযোগ্য অভিভাবকদের সংবেদনশীল হতে হবে। অভিভাবক শিশুদের শিক্ষার জন্য যথেষ্ট যত্নবান হবেন তাতে কারও কোন দ্বিমত হওয়ার কথা নয়। কিন্তু নিজ উচ্চাশা চরিতার্থ করার জন্য শিশুর গ্রহণ ক্ষমাত উপেক্ষা করে শিশুর ওপর অতিরিক্ত পড়ার বোঝা চাপানো শিশুস্মৃতি বিনাশের অন্যতম কারণ। গাড়ি বা বইতে পারে ততটুকুই, তার চেয়ে বেশি বোঝা চাপাতে যাবেন না। শিশুদের পঠিতব্য বিষয়বস্তু ধৈর্য, মনোযোগ সহ ভাল করে বুঝেই শিখতে হবে। অর্থ্যাৎ অভিভাবকদের শিশুদের লজ্যিকাল মেমোরির আশ্রয় নিতে উৎসাহিত করতে হবে। এ কথা ভুললে চলবে না, আহূত বিদ্যা আর উপলব্ধ জ্ঞানের মধ্যে যতটুকু ব্যবধান, ‍বুঝে শিখা ও না বুঝে  মুখস্ত করার মধ্যে রয়েছে ততটুকু ফারাক। শিশুদের সন্দেহ নির্দেশ দিতে হবে। শিশুরাও আর চারাগাছ নয়, আপনা আপনি বৃদ্ধি পাবে। তাদের সান্নিধ্যে এসে জানতে হবে কিসে তাদর ইন্টারেস্ট বা আগ্রহ এবং ক্রমাগত অনুশীলনের ওপর জোর দিয়ে সেই বিশেষ ইন্টারেস্টকে জীবিত রাখতে হবে। তা হলেই শিশুর স্মৃতিশক্তি আর তাদরে বিপদে ফেলবে না ও বিস্মৃতিপ্রবণতা থেকে রেহাই পাবে। শিশুবেলা থেকেই শিক্ষার্থীদের বিখ্যাত কবিদের নির্বাচিত কবিতা, ছড়াকারদের ছড়া, ইংরেজী, ছন্দবৃদ্ধ কবিতা, বিখ্যাত নাট্যকারদের বিশেষ বিশেষ সংলাপ, নীতিশ্লোক, প্রভৃতি আবৃত্তি ও পাঠ্যভ্যাস করার জন্য উৎসাহিত করতে হবে। আজকাল যদিও মুখস্ত করে আবৃত্তির ওপর তেমনটা জোর দেয়া হচ্ছে না। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে  এ জাতীয় আবৃত্তির অভ্যাসে শিশুরাও যথেষ্ট আনন্দ ও উৎসাহ ‍দুই ই পেয়ে থাকে। দেখা গেছে, এ অভ্যাসে শুধু  তাদের স্মৃতিশক্তি উন্নত  হয় তা নয়, তাদের ধারণক্ষমতাও বাড়ে। সকাল বিকাল মিনিট পাচেক করে দু বেলা ধ্যান অভ্যাস ও স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধির ক্ষেতে যথেষ্ট সহায়ক। অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের অভিমত, গর্ভবতী মাতাদের শিশুদের জন্মাবার আগে পুষ্টিকর  ও সুষম খাদ্য খেতে দিতে হবে। তা না হলে শিশুটি অপরিণত ব্রেণ নিয়ে জন্মাবার শংকা থাকে। তারা আরো বলেন, শিশু জন্মাবার পরও অনুরূপ খাদ্য চালিয়ে যেতে হবে, নতুবা শিশুটির শারীরিক ও মানসিক বিকাশ হবে না। সুক্ষ ও উন্নত ব্রেন উন্নত স্মৃতিশক্তি ভান্ডার। শিশুরা যদি রোজ অধীত পাঠ টেবিলের ওপর দাড়িয়ে বাড়ির সবার সামনে বক্তৃতার মতো করে শোনায় এবং বিদ্যালয় মঞ্চে দাড়িয়ে বক্তৃতা অভ্যাস করে, তাহলে স্মৃতিশক্তি বিকাশ ঘটে।

স্মৃতিশক্তি তা ছাত্র জীবনেই হোক বা পরবর্তী অধ্যায়েই হোক সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ। স্মৃতি বিভ্রাট আমাদের কেবল অস্বস্তিকর অবস্থাতেই ফেলে না সৃষ্টি করে নৈরাশ্য ও বিস্মৃতিপ্রবণতা। বৃদ্ধ বয়সে স্মৃতিশক্তি অবনতি প্রায় সার্বিক এই অবনতি থেকে অব্যাহতি পাওয়ার বিশেষ কোনও প্রতিবিধান অথবা উজ্জীবিত করার পন্থা না থাকলেও অবনতির গতিবেগ মন্থর করা সম্ভব হতে পারে নিম্নলিখিত নির্দেশনামায় অপেক্ষাকৃত কঠিন ও দুরূহ পুস্তক ও জটিলতর প্রবন্ধে পাঠ এবং নিবন্ধ রচনা। এতে প্রয়োজন হয় মস্তিস্কের পূর্ণ সঞ্চালন। নিজেকে সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত না রেখে সমাজসেবা ও সামাজিক দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসতে হবে। এতেও ব্রেনের সঞ্চালন হয়। প্রতিদিনের হিসাব, বাজারের হিসাব, মাসিক দুধের হিসাব প্রভৃতি মনে মনে কোনও ক্যালকুলেটরের সাহায্যে ছাড়া যোগ বিয়োগ করার অভ্যাস এবং মাল্টিপ্লেকশন টেবিল বিশেষ করে ১৩, ১৫, ১৭,১৯ এর নামতা মনে রাখার চেষ্টা।  এগুলো ই হচ্ছে স্মৃতিশক্তির অধঃগতির নিবারণী ওষুধ পেনাসিয়া। তা হলে স্মৃতিশক্তির অবস্থা হয়ে দাঁড়াবে হান্টিং হর্নস হুজ সাউন্ড ডাইজ অন দা উইন্ড’ এর অনুরূপ।

 

আফতাব চৌধুরি

সাংবাদিক কলামিস্ট


Leave a Reply