হাসপাতালের পোড়া ওয়ার্ড থেকে

  • 0

হাসপাতালের পোড়া ওয়ার্ড থেকে

হাসপাতালের পোড়া ওয়ার্ড থেকে

এসিডদগ্ধ মেয়েদের নিয়ে এখন পত্রপত্রিকায় নানা রিপোর্ট ছাপা হয়। এসিডে পোড়া কয়েকজন মেয়ে বিদেশেও গেছে চিকিৎসার জন্য। কিন্তু এই যে প্রেমের আহ্বানে ব্যর্থ হলেই মেয়েদের এসিডদগ্ধ করা এই জঘন্য অপরাধ বন্ধ হবে কবে? এই ছবির মেয়েট সেও হয়েছে জঘন্য জেদের শিকার। শুধু সে নয় এসিডে ঝলসে গেছে তার ছোট ভাইটির মুখ। বিভৎস্য সেই ছবিটি আমরা ইচ্ছা করেই ছাপলাম না। 

সেরিন ফেরদৌস

২৮-১০-২০১৮ তারিখ সকাল ৯টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে ঢুকতেই কোণার দিকের একটি বিছানায় বাচ্চার কাতরানির আওয়াজ কানে আসে। আত্মীয় স্বজন ঘিরে রেখেছে জায়গাটি। ডাক্তার তখনো আসেননি। কী হয়েছে জানতে এগিয়ে গিয়েই দেখি ডাক্তারদের একটি দল রুমে ঢুকলেন। পাশে সরে যাই। এ বিছানার মেয়েটিও ফুঁপিয়ে কাদছে। এই দুজন আজই ভর্তি হয়েছে, একটু আগেই। আয়েশা আক্তার (১৫) ও তার ছোট ভাই (১১)। ডাক্তার চলে  যেতেই বাচচাটির কান্না আরো উচ্চকিত হয়। ডাক্তারদের ধমকে আত্মীয় স্বজনের ভিড় কমে আসে। দুদিন আগেই পুড়ে যাওয়া শিশুটির আর্তনাদ ছড়িয়ে পড়েছে সমস্ত ওয়ার্ডে। সেই বেদনার ধ্বনি কানে শোনা কষ্টকর।

ঘুমন্ত অবস্থায় এসিড ছুড়ে মারা হয়েছিল আয়েশাকে লক্ষ্য করেই। আয়েশার মুখের ও শরীরের অর্ধাংশ পুড়ে গেলেও ছোট ভাইটি ঝলসে যায় বেশি। দাউকান্দির নোনারচর গ্রামের আয়েশা বেগম আমেনা সুলতানা সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর ছাত্রী। তার ভাই ষষ্ঠ শ্রেণীর। নভেম্বরের ১৫ তারিখে আয়েশার টেস্ট পরিক্ষা শুরু হওয়ার কথা। বাবা মোসলেম উদ্দিন তালুকদার পাথর ও মাছের ব্যবসা করেন। ৫ ভাই ও ৫ বোনের বিশাল পরিবারের আয়েশা বোনদের মধ্যে সবার ছোট এবং বড়ো তিন বোনেরই বিয়ে হয়ে গিয়েছে। একই গ্রামের ফারুক ও পারভেজ আয়েশা কে পছন্দ করতো। তার স্কুলে আসা যাওয়ার পথে ডিস্টার্ব করতো। রাস্তা- ঘাটে আটকে তাকে বিভিন্নভাবে প্রেমের প্রস্তাব দিতো। পড়তে বসলে জানালা দিয়ে চিঠি ছুড়ে দিতো, আয়েশা এ বিষয়ে অভিভাবকদের সাথে কথা বলতে বলে। ঘটনা ঘটার ৫/৬ মাস আগে রাত ৯ টার দিকে আয়েশার বাবা খেতে বসলে ২/৩ যুবক এসে মুখ দিয়ে জোরে শব্ধ করলে তিনি চমকে ওঠেন। ওরা সাথে সাথে পালিয়ে যায়। তার একটু পরেই ওদের চালে ঢিলা পড়া শুরু হয়। আয়েশার কলেজে পড়া বড় ভাই দৌড়ে গিয়ে একজনকে ধরে ফেলে ও থাপ্পড় মারে এবং তার বাবা মা কে গিয়ে নালিশ করে। ফারুকের বাবা মা ও ভাই ছেলের পক্ষ হয়ে মাফ চেয়ে নেয়। ফারুক ও পারভেজ এরপর হুমকি দেয় বার বছর পরে হলেও এর উসুল নেবে তারা। অবশ্য ৫/৬ মাস পরেই তারা উসুল নেয় এসিড ছুড়ে মেরে।

২৫-১০-২০১৮ তারিখ রাত ৩.৩০ টার দিকে ওরা আসে। অনেকেরই পায়ের ছাপ লেগে ছিলো মাটির ভিটাতে। পায়ের চাপে ভিটা ভেঙে যায়। দরজা জানালা বন্ধ থাকায় ওরা জানালা বেয়ে উঠে ওপরের ফাঁকা জায়গা দিয়ে এসিড ছুড়ে মারে। এর আগে সন্ধ্যা রাতেই আলিমুল্লা নামের প্রতিবেশী একটি ছেলে বাড়ির চারপাশে ঘোরাঘুরি করছিলো। আয়েশা কোথায় ঘুমায়, কিভাবে এসিড মারার যাবে, এই বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করাই ছিলো তার উদ্দেশ্য । তার সন্দেহজনক ঘোরঘুরি দেখে তাকে জিজ্ঞেস করা হলে এমনিতেই এসেছে বলে জানায়। পাশাপাশি খাটের একখাটে আয়েশা ও তার ছোট ভাই। অন্য খাটে বেড়াতে আসা বড়ো বোন ঘুমাচ্ছিল। ওরা ডিম লাইটের আলোয় আয়েশার খাট শনাক্ত করে। প্রথমে ডিমলাইটে সরিয়ে নিয়ে যায় হাত দিয়ে পরে এসিড ঢালে। আয়েশা গরম পানি মেরেছে বলে চিৎকার করতে থাকে। ছোট ভাইটির সম্পূর্ণ মুখ পুড়ে যায় ও একটা চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়।  সঙ্গে সঙ্গে দুজনকেই পাশের ডাক্তারখানা হয়ে গৌরিপুর হাসপাতালে পাঠানো হয়।


Leave a Reply