হৃদরোগ থেকে মুক্তি চাই

  • 0

হৃদরোগ থেকে মুক্তি চাই

Category : health tips bangla

হৃদরোগ থেকে মুক্তি চাই

 

বর্তমান সময়ে আমাদের দেশে করোনারি আর্টারি ডিজিজ বা হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ এই রোগে মারা যাচ্ছেন। একদিকে বাড়ছে হৃদরোগীর সংখ্যা, অন্যদিকে কমছে এতে আক্রান্তদের বয়স। প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো অত্যন্ত ব্যায়বহুল, তাছাড়া এগুলো কোন দীর্ঘস্থায়ী সুফলও বয়ে আনে না।

আপনি জেনে আনন্দিত হবেন  যে, হৃদরোগ প্রতিরোধ করা যায়, এমনকি প্রতিকারও আছে এর। যে নতুন যুগান্তকারী চিকিৎসা পদ্ধতির কথা বলা হবে এ রচনায় সে বিষয়ে বর্হিবিশ্বে  ইতিমধ্যেই  জনসচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে। হৃদরোগের প্রতিরোধ করা যায়, এমনকি প্রতিকারও আছে এর। যে নতুন যুগান্তকারী চিকিৎসা পদ্ধতির কথা বলা হবে এ রচনায় সে বিষয়ে বর্হিবিশ্বে ইতিমধ্যেই জনসচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে। হৃদরোগের প্রকৃত কারণ নির্ণয়ে যদি সমর্থ হই তবে কেন আমরা অসুস্থ থাকবো? হৃদরোগ মুক্তির এই বিকল্প পদ্ধতিতে রোগীকে নিবেদিতপ্রাণ হতে হয়। আর ধৈর্য ধরে একবার অভ্যস্ত হয়ে উঠলে পরবর্তীকালে মানুষেল জীবনধারাই বদলে যায়। লক্ষ্য করুন, একদিকে রয়েছে অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও ঝুকিপূর্ণ ওপেন হার্ট সার্জারি, যা আবার রোগমুক্তি ঘটায় সাময়িকভাবে। অন্যদিকে রয়েছে যোগব্যায়াম এবং শাকসবজি খেয়ে হৃদরোগের প্রতিরোধ করা। আপনি কোনটি বেছে নেবেন?

হৃদরোগ থেকে মুক্তি চাই

হৃদরোগ থেকে মুক্তি চাই

একটু অতীতের দিকে তাকানো যাক। দশকের পর দশক ধরে চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা অস্বীকার করে আসছিলেন যে, হৃদরোগ প্রতিকারযোগ্য। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণায় প্রমাণ মিলেছে যে, বিকল্প পদ্ধতিতে জীবধারা ইতিবাচকভাবে বদলে দিতে পারলে সেটা হৃদরোগের উর্দ্ধগতি থামিয়ে দেয়। একই সঙ্গে রুদ্ধ ধমনীগুলোও  (ব্লকেজ) খুলে যায়।

করোনারি আর্টারি ডিজিজ

এই রোগের কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকে: বংশানুক্রুমিক ধারা (অর্র্থ্যাৎ পিতা মাতার হৃদরোগ থাকলে), উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, উচ্চ মাত্রায় কোলেস্টেরল, ধুমপান ইত্যাদি। ব্যক্তির জীবনযাপন এবং মানসিক অবস্থাও সমভাবে গুরুত্ব বহন করে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ব্যাপারে। প্রতিকূল পরিস্থিতি, সামাজিক নিরাপত্তার অভাব এবং পরিহার ও কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ যুবা বয়সে হার্ট্ অ্যাটার্কের প্রধান কারণ।

প্রচলিত চিকিৎসা

হৃদরোগ চিকিৎসায় বর্তমানে যে পদ্ধতিটি বহুল ব্যবহৃত সেটি হলো হৃদযন্ত্রের ধমণীকে প্রসারিত করে তার ভেতরে রক্ত সঞ্চালণ করা এবং হৃদযন্ত্রের পেশিতে অক্সিজেনবাহিত রক্তের প্রয়োজন হ্রাস করা। সার্জিক্যাল চিকিৎসায় সংকীর্ণ ধমণীতে রক্ত সঞ্চালনের বিকল্প পথ তৈরি অথবা বেলুন প্রবেশের মাধ্যমে সেই পথ প্রসারিত করা হয়। এসবই রোগীকে সাময়িক উপশম দেয় বটে কিন্তু এর কোনটিই হৃদরোগের মূল সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।

তাই বিকল্প  চিকিৎসা

এটা প্রমাণিত যে, এই পদ্ধতি গ্রহণে হৃদরোগে ভালো হতে শুরু করে এবং  জীবনধারায় পরিবর্তণ  এনে রোগের মাত্রা থামিয়ে দেয়া যায়। এসব পরিবর্তনের ভেতর রয়েছেঃ মেদযুক্ত খাদ্য পরিহার, অত্যন্ত স্বল্পে মেদযুক্ত  এবং নিরামিষ আহার গ্রহণ, ধুমপান বর্জন, মনোদৈহিক চাপ ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত ব্যায়াম করা এবং মনোসামাজিক সহায়তা দান। এই জীবনধারা তাদের জন্য সুপ্রযোজ্য ও অত্যন্ত উপকারী যারা বাধ্য হয়ে বাইপাস সার্জারি বা এনজিওপ্লাস্টি করার ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করেছেন। এই বিকল্প চিকিৎসা গ্রহণ করলে বিশাল সাশ্রয় হবে। অনেকেই জানেন না যে, বিরাট খরচ করে বাইপাস সার্জারি/ এনজিওপ্লাস্টি করা হলেও ৫ বছরের মধ্যে হৃদযন্ত্রের ওইসব ধমনীর শতকরা ৫০ ভাগ পর্যন্ত ব্লকড হয়ে যেতে পারে। এছাড়া এনজিওপ্লাস্টি করা ধমনী ৩০ থেকে ৫০ ভাগ পর্যন্ত আবারও রুদ্ধ হয়ে যায় চার থেকে ছয়মাসের মধ্যে। সেক্ষেত্রে পুনরায় বাইপাস সার্জারি ও এনজিওপ্লাস্টি করা জরুরি হয়ে ওঠে। তার মানেই হলো আবারও বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যয়। তাই বিকল্প পদ্ধতির চিকিৎসাধারায় ব্যাপক প্রচলন হওয়া দরকার গরীব মানুষেল স্বার্থেই। এই লক্ষ্যপুরণে আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ। এর সাফল্য থেকেই আমরা অনুপ্রেরণা পেয়েছি। একটার সঙ্গে যুক্ত আরেকটা রোগ, হৃদরোগ প্রতিরোধ ও প্রতিকারে স্বল্পব্যায়ে এই বিকল্প পদ্ধতির কোন বিকল্প নেই।

আমাদের এই বিকল্প চিকিৎসা প্রোগামে রয়েছেঃ

  • ডায়েট কাউন্সেলিং বা পরামর্শ অনুযায়ী খাবার গ্রহন।
  • নিয়মিত ব্যায়াম, যেমন প্রতিদিন ৩০-৪০ মিনিট হাটা প্রাণায়াম, যোগ ব্যায়াম।
  • গভীর প্রশান্তির জন্য চাপ গ্রহণ ও চাপমুক্তির ব্যায়াম।
  • মেডিটেশন এবং দৃশ্যমান ইমেজারি
  • অণুভূতি ভাগাভাগির ওপর জোর দিয়ে গ্রুপ আলোচনা।

কখন শুরু করবেন ?

জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়ে যৌবনেই এই সঠিক জীবনধারা গ্রহণ করা সমীচিন। পুরুষের ৩৫ বছর এবং নারীর ৪০ বছর হলেই প্রতি বছর কার্ডিয়াক বা হৃদযন্ত্রের চেকআপ জরুরি। একইসঙ্গে হৃদরোগ প্রতিরোধে ব্যবস্থা গ্রহণও আবশ্যক।

অপারেশন ছাড়াই হৃদরোগ প্রতিরোধে আরো দুটি পদ্ধতি

১। বায়োকেমিক্যাল এনজিওপ্লাষ্টি বা চীলেশন থেরাপি

বেশ কিছুকাল আগে একটি কেমিক্যাল ফ্যাক্টরিতে গিয়ে আমি জেনেছিলাম যে, পাইপ ভিতর দিয়ে কেমিক্যাল যাওয়ার ফলে ওই পাইপের দেয়ারে পুরু পর্দা জমে এবং এক পর্যায়ে পাইপটি রুদ্ধ হয়ে যায়। আমি এর প্রতিকারের উপায় সম্পর্কে জানতে চাইলাম প্রকৌশলির কাছে। তিনি বললেন, একই পাইপ দিয়ে ভিন্ন ধরনের কেমিক্যাল প্রবেশ করালে ওই পর্দাটি দূর হয়ে যায়। বিষয়টি অনেকটা এরকম যে, বাড়ির গৃহিনী রান্নাঘরের পাইপে জমে থাকা পুরু ময়লা অপসারনের জন্য পরিষ্কারক পদার্থ প্রবেশ করান পাইপে। এ থেকে এটাই প্রমাণিত হয় যে, বাইরের থেকে কোনো পদার্থ কোথাও জমলে সেটা সরানো যায় ভিন্ন পদার্থের সাহায্যে নিয়েই। একই ভাবে হৃদযন্ত্রের ধমনীর ব্লক অপসারন সম্ভব বায়োকেমিক্যাল মিশ্রণের মাধ্যমে। তবে সেটা হতে হবে মানবদেহের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং পরিমিত মাত্রায়। এই কেমিক্যাল মিশ্রণে থাকে অ্যান্টি অক্সিডেন্টস,  ইডিটিএ, ভিটামিন, আইসোটনিক, পিএইচ ভারসম্যপূর্ণ ওষুধ। এই কেমিক্যাল মিশ্রণটি শিরার মাধ্যমে রোগীর দেহে প্রবেশ করানো হয় আড়াই ঘন্টা সময় নিয়ে। অনেকটা স্যালাইন দেয়ার মতোই বিষয়টি।

রোগীর বয়স ও শরীরের অবস্থা অনুযায়ী এই মিশ্রণ প্রয়োগের মাত্রার রকমফের ঘটে। একজন অভিজ্ঞ ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসকই কেবল এই মাত্রার বা ডোজের বিষয়টি সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে পারেন।  এই বায়োকেমিক্যাল এনজিওপ্লাষ্টি অনেক বেশি কার্যকর হয়ে থাকে যদি রোগীর জীবনধারায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা হয়।

প্রাকৃতিক বাইপাস থেরাপি বা ইসিপি( এক্সার্টনাল কাউন্টার পালসেশন)

স্রষ্টা আমাদের হৃদযন্ত্রে শত সহস্র ধমনী দিয়ে দিয়েছেন। তিনটি প্রধাণ ধমনী ১০টি শাখায় সজ্জিত, যেখান থেকে ১০০ টি প্রশাখা ছড়িয়ে পড়েছে। এর আবার রয়েছে হাজারো প্রশাখা। এগুলোকে বলা হয় ক্যাপিলারিস। অনেকটা জালের মতো এগুলোর ভেতর অন্তঃসম্বন্ধ রয়েছে; আবার প্রতিটিই অপরটির সঙ্গে রক্ত গ্রহণ ও প্রদানের সম্পর্কে সম্পর্কযুক্ত।  একটি প্রধাণ বা অপ্রধান ধমণীতে ব্লক সৃষ্টি হরে ওই শত সহস্র রক্তনারি হৃৎপিন্ডের পেশিতে রক্ত সঞ্চালণে প্রয়োজনীয় ভূমিকা রাখতে পারে। যদি কোনো উপায়ে ওই রক্তনালিগুলোর চ্যানেলটি মুক্ত ও বিস্তৃত রাখা যায় তাহলে হৃদযন্ত্রের রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়া সংহত থাকে। এটাকে বলা হয় প্রাকৃতিক বাইপাস। এটা চালু রাখার জন্য যে চিকিৎসা পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয় তাকে বলা হয় প্যান বাইপাস বা Pneumaticaly Assisted Natural Bypass.

এই প্রাকৃতিক চ্যানেলটি খেলোয়াড় ও অ্যাথলেটের ক্ষেত্রে সাধারণত উপস্থিত থাকে। যেহেতু তাদের প্রচুর ব্যায়াম করা লাগে পুরো ক্যারিয়ার জুড়েই। তাই তাদের বেলায় ক্যাপিলারিস পরিণত হয় বর্ধিত টিউবে। এই টিউবের কারনেই শতকরা ৮০ থেকে ৯০ ভাগ ব্লকেজ দেখা দিরেও এরা বুক ব্যথা বা এনজিনায় ভোগেন না। এমনকি ১০০ ভাগ ব্লকেজ হলেও এদের হৃদপিন্ডের মাংসপেশি বিকল হয়ে পড়ে না। এখন প্রশ্ন হরো কিভাবে এই প্রাকৃতিক বাইপাস চ্যানেল সৃষ্টি করা যায়।

না, আমরা একজন হৃদরোগীকে দৌড়বিদের মতো দৌড়ানোর পরামর্শ দেবো না। তাদেরকে আমরা এমন কোন কঠিন ব্যায়ামও দেবো না। যাতে বুকের সম্প্রসারণ হয়ে বুক ব্যথা অনুভুত হবে। তবে বর্তমানে বিজ্ঞানীরা এমন একটি যন্ত্র আবিষ্কার করেছেন যেটা সমান্তরাল রক্ত চ্যানেল সৃষ্টিতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। মেশিনটি কৃত্রিমভাবে ধমনীতে রক্তপ্রবাহ বাড়ায়। মেশিনের এক ঘন্টার সহায়তার এই সমান্তরাল আর্টারি/ ক্যাপিলারি সিষ্টেম চালু করে দেয় এবং হৃৎপিন্ডের পেশিতে অতিরিক্ত রক্ত সঞ্চালণ শুরু করে। সম্পূর্ণরূপে প্রাকৃতিক চ্যানেল চালু করার জন্য এই মেশিনের মাধ্যমে ত্রিশটির মতো সেশনের প্রয়োজন পড়ে। এভাবে খুব সহজেই বাইপাস সার্জারির বিকল্প হতে পারে এই মেশিন।  এসব বিকল্প হৃদরোগ চিকিৎসার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর জন্য রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া লাগে না, কর্মক্ষেত্রে থেকে সাময়িক অবসরে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না, বা এসব শরীরের ওপর কোন আঘাতও হানে না। অপারেশনে রয়েছে নানাবিধ পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া। অপারেশনে রয়েছে নানাবিধ পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া। অপারেশনহীন এই বিকল্প হৃদরোগে চিকিৎসায় সে সবের কোনো বালাই নেই।

 

ডা. গোবিন্দ চন্দ্র দাস

হলিষ্টিক হেলথ কেয়ার সেন্টার

৫৭/১৫, পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা।


Leave a Reply