এমডিআর টিবি । যক্ষা

  • 0

এমডিআর টিবি । যক্ষা

এমডিআর টিবি – যক্ষা

যক্ষা নিয়ন্ত্রণের অন্ধকার দিক

যক্ষা শুধু বাংলাদেশের অন্যতম জনস্বাস্থ্য সমস্যাই নয়, এটা একটি সামাজিক সমস্যা। যক্ষা রোগের সার্বিক চিকিৎসা বিনামূল্যে দেয়া হলেও রোগ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া, পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য রোগ নির্ণয় কেন্দ্রে যাওয়া আসা এবং রোগ সনাক্ত হওয়ার পরে চিকিৎসা  কেন্দ্র করে ওষুধ আনা নেয়া ইত্যাদির খরচ বহন করতে গিয়ে এই রোগীর পরিবার দারুন অর্থকষ্টে পতিত হয়। এছাড়া বেশিরভাগ যক্ষা রোগীর কর্মক্ষম বয়সে (১৫-৪৫ বৎসর) রোগে আক্রান্ত হওয়ায় দেশের উৎপাদন ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্থ হয়। এদিক দিয়ে বিচার করলে যক্ষা আমাদের দেশে একটি অর্থনৈতিক সমস্যাও বটে। ১৯৯৩ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশেল ৪টি উপজেলায় প্রথম ডটস পদ্ধতির সর্বাধুনিক চিকিৎসা শুরু হয় এবং পর্যাক্রমে ১৯৯৮ সালের মধ্যে এই চিকিৎসা পদ্ধতি সারা দেশে সম্প্রসারিত হয়। ফলে পূর্বের শহর ভিত্তিক ৫৬ টি রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা কেন্দ্রের বদলে সারা দেশে যক্ষা রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা কেন্দ্রের সংখ্যা দাড়িয়েছে ৬০০ এর ওপরে। বাংলাদেশে যক্ষা রোগী সনাক্তকরণ ও চিকিৎসা সফলতার হার ইতিমধ্যেই আর্ন্তজাতিক মান অতিক্রম করেছে। রোগী সনাক্তকরণ ও চিকিৎসা সফলতার আর্ন্তজাতিক হার যেখানে যথাক্রমে ৭০ ও ৮৫ শতাংশ সেখানে ২০০৭ সালে বাংলাদেশে রোগী সনাক্তকরণ ও চিকিৎসা সফলতার হার দাড়িয়েছে ৭১ দশমিক ৫ ও ৯২ শতাংশ। বাংলাদেশের এই সফলতার সাথে সরকারের পাশাপাশি এনজিওরাও সম্পৃক্ত। ব্রাক এবং আরো ৮টি আর্ন্তজাতিক এনজিও সরকারের পাশাপাশি যক্ষা নিয়ন্ত্রণে কাজ করে যাচ্ছে। এ সবই সরকারের যক্ষা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সফলতার দিক।

তবে এই রোগ নিয়ন্ত্রণের সরকারের এই ব্যাপক সফলতার পরেও পৃথিবীর ২২টি যক্ষাপ্রবণ দেশের তালিকায় এখনও বাংলাদেশের অবস্থান ৬ নম্বরে। এ ছাড়াও বাংলাদেশে যক্ষার প্রিভ্যালেন্স ৫ লাখ ৫৯ হাজার (প্রতিলাখে ৩৯১ জন), ইনসিডেন্স প্রায় ৩ লাখ ২২ হাজার (প্রতি লাখে ২২৫ জন) এবং এর মধ্যে প্রায় দেড় লাখ ( লাখে ১০১ জন) কফে জীবানুমুক্ত নতুন রোগী। মৃত্যুর সংখ্যা বছরে প্রায় ৬৫ হাজার ( লাখে ৪৫ জন)। ভয়ের ব্যাপার হলো বাংলাদেশে মাল্টি ড্রাগ রেজিস্টেন্ট টিবির (এমডিআর টিবি) আর্বিভাব। জাতীয় যক্ষা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচী (এনটিপি) প্রদত্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী (বার্ষিক প্রতিবেদন ২০০৭) বাংলাদেশে এমডিআর টিবির হার নতুন রোগীদের মধ্যে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ এবং পুরাতন (পুনর্চিকিৎসিত) রোগীদের বেলায় ১৯ শতাংশ। এই হিসাবে ২০০৭ সালে সনাক্তকৃত ও চিকিৎসিত নতুন ও পুরাতন রোগীর মধ্যে এমডিআর রোগীর সংখ্যা ৪৭০০ এর উপরে। এসব মাল্টিড্রাগ টিবি রাগীর চিকিৎসার কোন কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়া হলে ২০০৮ সালের শেষ দিকে এই সংখ্যা দাড়াবে ১৪ হাজারের উপরের। যত বেশী রোগী ধরা পড়বে তত বেশি হবে এমডি আর টিবি রোগীর সংখ্যা। যক্ষা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে এটাই সব থেকে ভয়ের কারণ এবং এনটিপি ব্যর্থতার দিক।

ডটস পদ্ধতির আওতায় পরিমিত, ক্রমাগত নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ওষুধ না খাওয়ার কারণে এমডিআর টিবি হয়। এছাড়া রেকর্ডিং রিপোর্টি ও ফলোআপের ব্যবস্থা না থাকাও এমডিআর টিবি হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। শহরাঞ্চলে চিকিৎসকের তুলনায় চিকিৎসাভুক্ত যক্ষা রোগীর সংখ্যা খুবই কম ( মোট রোগী মাত্র ১৮% বার্ষিক প্রতিবেদন ২০০৭) যা মোটেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। ঢাকা শহরে পরীক্ষা মুলকভাবে পিপিএম ডটস প্রকল্প বাস্তবায়নপূর্ব সমীক্ষায় দেখা গেছে প্রাইভেট চিকিৎসকগণ দৈনিক গড়ে একাধিক যক্ষা রোগীর চিকিৎসা দেন। কিন্তু প্রাইভেট খাতে রেকর্ডিং, রিপোর্টিং ও ফলোআপ না থাকার কারণে এসব  রোগী জাতীয় রেজিষ্ট্রারে অন্তর্ভুক্ত হয় না। এছাড়া যক্ষা নিয়ন্ত্রণে প্রণীত জাতীয় গাইড লাইন সম্পর্কে তাদের কোন ওরিয়েন্টেশন নেই এবং তারা ডটস পদ্ধতিও অনুসরণ করেন না। ফলে প্রাইভেট চিকিৎসকদের যক্ষা রোগ নির্ণয় ও সঠিক চিকিৎসা প্রদানে ভুল হওয়া এবং রোগী ড্রপআউটের সম্ভাবনা বেশি থাকে। এসব কারণেও মাল্টি ড্রাগ রেজিস্টেন্ট টিবি হয়।

প্রাইভেট চিকিৎসকদের রোগী ড্রপআউটের হার বিবেচনায় আনলে দেশে মাল্টি ড্রাগ রেজিস্টেন্ট টিবি রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি হতে বাধ্য। এমডিআর টিবির চিকিৎসা পদ্ধতি খুবই জটিল, ব্যায় সাপেক্ষ এবং বিষক্রিয়া পূর্ণ। এছাড়া চিকিৎসার ফলাফলও তেমন আশাপ্রদ নয়। এসব কারণে এমডিআর টিবি চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধ করাটাই উত্তম এবং চিকিৎসা সাশ্রয়ী। বাংলাদেশের মত  একটি গরীব দেশের পক্ষে  এত বেশী এমডিআর রোগীর চিকিৎসা দেয়া সম্ভব নয়। এটা করতে হলে অবিলম্বে শহরাঞ্চলের সব প্রাইভেট চিকিৎসকদের পর্যায়ক্রমে এই রোগ নিয়ন্ত্রণে কর্মসূচিতে সর্ম্পক্ত করার কোন বিকল্প নেই। পর্যায়ক্রমে এদের জাতীয় যক্ষা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির আওতায় এনে জাতীয় গাইড লাইন আনুযায়ী প্রশিক্ষণ দেয়া এবং প্রাইভেট সেক্টরে যক্ষা রোগীর চিকিৎসার ক্ষেত্রে রেকর্ডিং, রিপোর্টিং ও ফলোআপ ব্যবস্থা চালু করতে হবে। যাতে কোন রোগী চিকিৎসাকালীন সময়ে অনুপস্থিত থাকার সুযোগ না পায়। এ ব্যাপারে এবং কেন্দ্রীয় মনিটরিং কর্তৃপক্ষ তৈরি করে বিষক্রিয়া দেখভালের দায়িত্ব তাদের উপর ছেড়ে দিতে হবে কারণ প্রাইভেট চিকিৎসকদের সঙ্গে সরকারি অফিস সময়ের হেরফের হওয়ার কারণে এটা সরকার বা অন্য কোন এনাজিও এর পক্ষে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশে এইচ আই ভি / এইডস বৃদ্ধি প্রবণতার মুখে এমডিআর রোগীর সংখ্যা বাড়তে দিলে দেশে চরম বির্পযয় নিয়ে আসেতে পারে। তখন শত চেষ্টা করেও পরিস্থিতি পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না।

ডাঃ এ কে. এম ডি আহসান

যক্ষা ও বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ