ডায়াবেটিস রোগীর সতর্কতা

  • 0

ডায়াবেটিস রোগীর সতর্কতা

 

ডায়াবেটিস রোগীর হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুকি এড়াতে হলে কতকগুলো সতর্কতামুলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে-

প্রথমত-  রক্তচাপের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। অবশ্যই রক্তচাপকে ১৪০/৯০ এর নিচে রাখতে হবে। একজন ডায়াবেটিস রোগী যদি তার রক্তচাপকে সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে তার হৃদরোগের ঝুকি শতকরা ৫০ ভাগ এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি শতকরা ৮৫ ভাগ রোধ করা যায়। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস থাকলে রোগীর দেহের বৃহৎ ও ক্ষুদ্র রক্তনালীগুলো ক্ষতিগ্রস্থ হয় এবং ধীরে ধীরে সংকীর্ণ হয়ে যায়। ধমনীগুলো সংকীর্ণ হয়ে গেলে রক্তচাপের মাত্রা বৃদ্ধি পায় এবং এই উচ্চ রক্তচাপে দেখা দেয় হৃদরোগ। উচ্চ রক্তচাপ এবং মস্তিষ্কে সৃষ্টি সংকীর্ণ ধমনী ঘটাতে পারে সেরিব্রাভাস্কুলার রোগ বা স্টোক।

দ্বিতীয়তঃ ধুমপান পরিহার করা। ডায়াবেটিস রোগীর জন্য ধুমপান করা অত্যান্ত বিপজ্জনক। সিগারেটের ধোয়ার থাকা নিকোটিন রক্তনালীগুলোকে ধীরে ধীরে সংকীর্ণ করে ফেলে। ফলে রক্তচাপ বৃদ্ধি পায় স্ট্রোক ও হৃদরোগের ঝুকি বাড়ে। ডায়াবেটিস রোগীর এমনিতেই রক্তনালীর রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। ধুমপান করলে সেই সম্ভাবনাকে আরো বাড়িয়ে দেয়। ধমণীগুলো সংকীর্ণ হয়ে যাওয়ার দেহের সকল অঙ্গে রক্ত প্রবাহ কমে যায়। যার ফলে কিডনি রোগের ঝুকি বৃদ্ধি পায়, চোখে রেটিনোপ্যাথি নামক জটিল সমস্যা দেখা দেয়।

তৃতীয়তঃ দৈহিক ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা। ওজন কমানোর জন্য স্বাভাবিকভাবে কম খাওয়াই সব চেয়ে যুক্তিসঙ্গত উপায়। দৈনিক প্রধান আহারের মাঝে বারবার এটা ওটা খাওয়া বা শখের খাবারগুলো থেকে দূরে থাকতে হবে। এগুলো এড়িয়ে চললে ওজন কমিয়ে দেবার প্রতিশ্রুতি দেয়। সঠিক খাবার পরিমিত পরিমাণে খেতে হবে তবেই ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকবে। ভুল খাবার বেশি মাত্রায় খেলে সেটা সহজেই দৈহিক ওজন অতিরিক্ত ভারী করে দিতে পারে এবং ভারী হওয়ার সমস্যাগুলো নিজেকেই ভোগ করতে হবে।

চতুর্থতঃ উচ্চ চর্বিযুক্ত খাবার পরিহার করা। ডায়াবেটিস রোগীর উচ্চ রক্তচাপ এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য খাবার থেকে উচ্চ চর্বি বা সম্পৃক্ত চর্বি পরিহার অত্যান্ত জরুরি কারণ সম্পৃক্ত চর্বি দেহকে বেশি পরিমাণ কোলেস্টেরল উৎপাদনে বাধ্য করে বা রক্তনালীর দেয়ালে জমা হয়ে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের কারণ হতে পারে। যদি কোন লোকের রক্তে উচু মাত্রার কোলেস্টেরল থাকে তবে তার খাদ্য তালিকা থেকে ডিমের কুসুম, মাংস, ঘি, মাঘন, পনির অনেকটা কমিয়ে দিতে হবে বা বাদ দিতে হবে। প্রতি ১০০ মিলি রক্তে মোটামুটি ১৫০ মিলিগ্রাম কোলেস্টেরল থাকাই স্বাভাবিক, যদি ২০০ থেকে ২৪০ মিলিগ্রাম হয় তবে বিপদযুক্ত এলাকার সীমানা। ডায়াবেটিস রোগীর জন্য উত্তম খাবার হচ্ছে আশজাতীয় খাবার। এটা তার ওজন, কোলেস্টেরল এবং সুগার নিয়ন্ত্রণে পরোক্ষ ভূমিকা পালন করে। সাধারনত উদ্ভিদ জাত খাদ্য আশসমৃদ্ধ। সব সবজি এবং ফলের মধ্যেই প্রচুর আশ রয়েছে। এই আশগুলো, পরিপাক তন্ত্রে গিয়ে স্পঞ্জের মত কাজ করে। এরা চর্বি, পানি, সুগারসহ অন্যান্য খাদ্যাংশকে শোষণ করে স্পঞ্জ আকার ধারণ করে পরিপাক নালীতে খাদ্য অতিক্রম করার গতি বাড়িয়ে দেয়। যেহেতু চর্বিজাতীয় খাবার হজম এবং শোষণ হতে অধিক সময় লাগে সে জন্য আঁশজাতীয় খাবার গ্রহণ এদের শোষণ কমিয়ে দেয় ফলে ডায়াবেটিস রোগীর দৈহিক ওজন এবং রক্তের কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করে। দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় ফলমুল এবং শাকসবজি অবশ্যই রাখতে হবে। সুতারাং সাদা ময়দা বা সাদা রুটির চেয়ে পূর্ণ গমের আটার রুটি অনেক বেশি পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যসম্মত। শিম, মসুর ডাল এবং অন্যান্য শুটির মধ্যে প্রচুর আশ থাকে অথচ এগুলোতে চর্বির মাত্রা অত্যান্ত কম থাকে। অন্যদিকে মাংস ও অন্যান্য পশুজাত প্রোটিনগুলো হল অত্যান্ত উচুমাত্রার চর্বিযুক্ত ও অনেক কম আশযুক্ত খাবার। কাজেই প্রচুর আশযুক্ত খাবার খেলে একজন ডায়াবেটিস রোগীকে পূর্ণ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতে সহায়তা করবে। নিরামিষ খাবার যদি ভারসাম্যপূর্ণ হয় তবে সেটা আসলেই স্বাস্থ্যসম্মত খাবার হয় যাতে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, স্ট্রোক, ক্যান্সার ও অনেক গুরুতর রোগের ঝুকি কম থাকে।

পঞ্চমতঃ রক্তের সুগারের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসে দেহের ধমনীগুলো ধীরে ধীরে কঠিনীভুক্ত এবং সংকীর্ন হয়ে যায় যার ফলে সৃষ্টি হয় উচ্চ রক্তচাপ যেটা হৃদরোগ ও স্ট্রোকের জন্য একটা প্রধান বিপদের কারণ।

ষষ্ঠতঃ  নিয়মিত ব্যায়াম করা। প্রতিদিন অন্তত আধঘন্টা করে ব্যায়াম করা প্রয়োজন। ব্যায়াম দৈহিক ওজন কমাতে এবং রক্তের কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। ব্যায়াম হল যে কোন ওজন কমানোর কর্মসূচির একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ব্যায়ামের পর ক্ষুধা বৃদ্ধি পায় তখন খেয়াল রাখতে হবে যেন বেশি খেয়ে ফেলা না হয়। একজন ডায়াবেটিস রোগীর জন্য ব্যায়া তার ডায়াবেটিসে নিয়ন্ত্রণে এবং এর জটিলতা প্রতিরোধ সাহায্য করতে পারে। ব্যায়াম মাংসপেশিতে থাকা ইনসুলিন গ্রাহকগুলোতে ইনসুলিনের প্রতি বেশি সংবেদনশীল করে দেয় ফলে রক্ত থেকে গ্লুকোজ সহজেই পেশিতে পৌছাতে পারে। যার ফলে রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে। এভাবে ব্যায়াম দেহে ইনসুলিন ও গ্লুকোজকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে সহায়তা করে। ব্যায়াম ক্ষুদ্র রক্তনালীর মধ্যকার রক্ত সঞ্চালনের উন্নতি ঘটায় ফলে ডায়াবেটিস রুগীদের পায়ের পাতা ও পায়ের নলীর সমস্যা প্রতিরোধ করা যায়। ব্যায়াম হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুকি কমিয়ে দেয়। ব্যায়াম করলে রক্তের কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইড স্তর নিচে আসে এবং এইচডিএল বা উচ্চ ঘনত্বের লিপোপ্রোটিনের মাত্রা বেড়ে যায় যা হৃদরোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে। নিয়মিত ব্যায়াম করতে হৃদপিন্ডের পাম্প করার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং দেহকে অধিকতর সুস্থ থাকার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।

 

ডা. জ্যোৎস্না মাহবুব খান

মুক্তগাছা, ময়মনসিংহ