দীর্ঘস্থায়ী ব্রংকাইটিস

  • 0

দীর্ঘস্থায়ী ব্রংকাইটিস

দীর্ঘস্থায়ী ব্রংকাইটিস

ব্রংকাইটিস হল শ্বাস নালীর প্রদাহ, যার ফলে শ্বাস নালীর ভিতরে দেয়াল লাল হয় এবং ফুলে যায়। শ্বাস নালীর ভিতরে বাতাস চলাচলের জায়গা সরু হয়ে যায় এবং প্রচুর শ্লেষ্মা তৈরি হয়। শ্বাস নালীর ভিতরে অক্সিজেনসহ বাতাস চলাচল বাধাগ্রস্থ হয় এবং প্রচুর শ্লেষ্মা তৈরির ফলে শ্বাস নালীর মধ্যে সংক্রামন হয়।  এর ফলে কাশি ও শ্বাসকষ্ট হয়। ব্রংকাইটিস দ্রই প্রকার ক্ষনস্থায়ী ও দীর্ঘস্থায়ী।

প্রঃ ক্রনিক (দীর্ঘস্থায়ী) ব্রংকাইটিস কি ?

উঃ এক নাগাড়ে ৩ মাসের বেশি সময় ধরে শ্লেষ্মাযুক্ত কাশি কমপক্ষে পরপর ২ বছরের বেশি সময় থাকে, তখন এ অবস্থাকে ক্রনিক ব্রংকাইটিস বলা হয়।

প্রঃ কোন বয়সে লোকদের মধ্যে ক্রনিক ব্রংকাইটিস হয় ?

উঃ সাধারণত ৪০ থেকে ৪৫ বয়সের পর এই রোগ বেশি হয়। কিন্তু অল্প বয়সেও এই রোগ হতে পারে, যদি জন্মগত কোন কারণ থাকে। উদাহারণ- আলফা ওরাল এন্ট্রি ট্রিপসিন এর ঘাটতির কারণে।

প্রঃ পুরুষ না মহিলাদের মধ্যে কাদের এই রোগ বেশি হয় ?

উঃ সাধারণত পুরুষেরা এই রোগে বেশি ভোগেন।

প্রঃ কি কারণে এই রোগ হয় ?

উঃ সঠিক কারণ এখন পর্যন্ত অজানা। তবে এই রোগ হবার জন্য কতগুলো নিয়ন্ত্রক দায়ী। সেগুলো হল-

ক) ধুমপানঃ ক্রনিক ব্রংকাইটিস এর প্রধান কারণ ধুমপান। সাধারণত শতকরা ৯৫ ভাগ ক্রনিক ব্রংকাইটিস ধুমপানের কারণে হয়। এই ধুমপান প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ উভয় প্রকারই হতে পারে। ধুমপানের পরিমাণের উপরে এই রোগ হওয়া নির্ভর করে।

পরিবেশ দুষণঃ যথা চুলার ধোয়া,  গাড়ির ধোয়া, গোবরের ধোয়া, রাস্তা ধুলাবালি ইত্যাদি। বায়ু দুষণ- অভ্যান্তরীন ও বাহ্যিক, বার বার ফুসফুসে সংক্রমণ, স্বল্প ও মধ্য আয়ের পরিবার ঘনবসতিপূর্ণ, কাচাঘর  ও আলো বাতাসের স্বল্পতা। পেশাগত কারণ- বিভিন্ন কলকারখানার কাজ করে এমন ব্যক্তি যেমন- সোয়েটার, পাট ও পাটজাত পন্য, তুলার কারখানা ইত্যাদি। জন্মগত কারণ- আলফা ওয়ান অ্যান্টি ট্রিপসিন  এর ঘাটতি।

-শ্বাস নালীর অতি সংবেদনশীতা।

প্রশ্নঃ রোগের পরিসংখ্যান কেমন ?

উঃ যেখানে যত বেশি ব্যক্তি ধুমপান করে সেখানে এই রোগ তত বেশি হয়। এছাড়া স্বল্প ও মধ্য আয়ের দেশে এই রোগের প্রবণতা বেশি। সাম্প্রতিক হিসাবে দেখা যায় পৃথিবীতে প্রায় ৮ কোটি লোক এই রোগের মৃতের সংখ্যা ৩০ লাখেরও বেশি এবং ২০২০ সাল নাগাদ এই রোগের মৃত্যু ৩য় প্রধাণ কারণ হয়ে দাড়াবে বলে ধারণা করা হয়। যা ১৯৯৯ সালে এই রোগের মৃত্যুর ৬ষ্ঠ কারণ ছিল।

প্রশ্নঃ কিভাবে রোগ নির্ণয় করা যায়।

উত্তরঃ রোগের ইতিহাস, রোগের উপসর্গ ও শারীরিক পরীক্ষা করে রোগ নির্ণয় করা যায়। বয়স ৪০ বছরের বেশি, ধুমপান যেহেতু প্রধান নিয়ামক সেহেতু ধুমপান কত বছর বয়স থেকে শুরু হয়েছে তা দেখতে হবে। প্রতিদিন কতটা সিগারেট খায়, এখনো সিগারেট খায় না বন্ধ করে দিয়েছে। পরাক্ষ ধুমপানের ইতিহাস আছে কিনা। যদি দৈনিক কোন ব্যক্তি ২০ টি সিগারেট বিরামহীনভাবে ১ বছল খায়, তাহলে তাকে এক প্যাক ইয়ার বলে।   এভাবে যদি ১০ বছর ধুমপান করে তাহলে ঐ ব্যক্তির এই রোগ হবার প্রবণতা বেড়ে যায়। এছাড়া পরিবেশ দুষণ, বায়ু দুষণ, বারবার ফুসফুসে সংক্রমণ, পেশাগত কারণের ইতিহাস পাওয়া যায়।

প্রঃ রোগের উপসর্গ কি ?

উঃ শ্লেষ্মাযুক্ত দীর্ঘ দিনের কাশি (সকালের দিকে বেশি)। ক্রমবর্ধমান শ্বাসকষ্ট, প্রথম সব কাজ স্বাভাবিকভাবে করতে পারে, এরপর পরিশ্রম করলেই শ্বাসকষ্ট হয় এবং ধীরে ধীরে শ্বাসকষ্ট বাড়তে থাকে। সামান্য একটা সিড়ি বেয়ে উপরে উঠলেই শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। জ্বর থাকতে পারে, বাশির মত শব্দ। এছাড়া রোগের জটিলতার হিসাবে শরীরের ওজন কমে যাওয়া বা গা ফুলে যাওয়া।

প্রঃ রোগের শারীরিক পরীক্ষা করে কি কি পাওয়া যাবে ?

উঃ রোগীর শারীরিক পরীক্ষা করে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো পাওয়া যাবে-

মুখ দিয়ে শ্বাস নেয়া, ঘন ঘন শ্বাস নেওয়া, শ্বাস নেবার সময় বুকের মাংসপেশী ও ত্বক বুকের খাচার ভিতরে ডুকে যাওয়া, কোন কোন সময় শরীর যথা জিহ্বা ও ঠোট নীল হয়ে যায়। পা ফুলে যেতে পারে।

প্রঃ কি কি ল্যাবরেটরি পরীক্ষা করা যায় ?

উঃ বুকের এক্সরে কারণ অন্য রোগকে আলাদা করার জন্য এবং উক্ত রোগের জটিলতা আছে কিনা তা দেখার জন্য। স্পাইরোমেট্রি। অবসট্রাকটিভ না রেস্টিক্রটিভ রোগ। হাপানী থেকে আলাদা করার জন্য রিভারসিবিলি পরীক্ষা করা হয়।

রক্তের পরীক্ষা। TC, DC, ESR, HB%, HRCT.

প্রশ্নঃ কি চিকিৎসা দেয়া হয়।

উঃ প্রথম ও প্রধানত ধুমপান ত্যাগ করা। ধুলাবালি, ধোয়া, পরিবেশ দুষণ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করা, চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া, ব্রংকাইটিস জাতীয় ওষুধ ব্যবহার করা, ইনহেলার ব্যবহার করা, ইনহেলার ব্যবহার করা উত্তম। চেস্ট ফিজিওথেরাপি নেয়া। রোগের তীব্রতা দেখা দিরে নেবুলাইজেশন, ব্রাকোডাইলেটর সলুশন দিয়ে ব্যবহার করা। লো ফ্লো অক্সিজেন ব্যবহার করা প্রয়োজনমত। প্রয়োজনমত সঠিক এন্ট্রিবায়োটিক জাতীয় ওষুধ ব্যবহার করা। মিউকোলাইটিক জাতীয় ওষুধ ব্যবহার করা যায়,যদি শ্লেষ্মা বেশি ঘন হয়। প্রতি বছর ইনফ্লুয়েঞ্জা ভেকসিন এবং প্রতি পাচ বছর অন্তর অন্তর নিউমোনিয়া না হওয়ার জন্য প্রতিষেধক ভেকসিন নেয়া উত্তম, যদি বয়স ৬৫ বছরের বেশি হয়।

প্রঃ সঠিক চিকিৎসা না দিলে কি কি সমস্যা হতে পারে ?

উঃ কর পালমোনেইল, ফুসফুস বিকল হয়ে যায়, ফুসফুসে ঘন ঘন সংক্রমণ হতে পারে। ফুসফুসে বাতাস জমে যেতে পারে।

প্রঃ এই রোগ থেকে কিভাবে বাচতে পারি ?

রোগের প্রতিরোধ-

এই রোগ একবার হয়ে গেলে আর সম্পূর্ণ ভাল হয় না। তবে নিয়মিত ওষুধ খেলে রোগ সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। রোগ প্রতিরোদের জন্য নিম্নের ব্যবস্থা নিতে হবে- ধুমপান থেকে বিরত থাকতে হবে। নিয়মিত ব্যায়াম করা ভাল। পরিবেশ দুষণ থেকে মুক্ত থাকতে হবে। ঘন ঘন বুকে ইনফেকশন যাতে না হয়, তার কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে হবে।

 

ডাঃ এ কে এম মোস্তফা হোসেন

পরিচালক

জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল

মহাখালী, ঢাকা-১২১২।