ঘুমের জন্য ওষুধ নয়

  • 0

ঘুমের জন্য ওষুধ নয়

Category : Health Tips

ঘুমের জন্য ওষুধ নয়

 ডাঃ তাজুল ইসলাম

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

কোন অসুখকে মানুষ সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়? হার্টের অসুখকে। কেননা তা মরণ ব্যাধি বলে চিহ্নিত। কোন দৈনন্দিন জীবনের সমস্যাকে আমরা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকি ? যৌন সমস্যা ও ঘুমের সমস্যাকে। কেননা সাধারণ মানুষ এমনকি অনেক শিক্ষিত ডাক্তাররাও এ দু টি বিষয়কে তাদের জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে বিবেচনা করে। সত্যি কথা বলতে গেলে এ দু টি বিষয়ের গুরুত্ব আমাদের সমাজে তত বেশি দেয়া হয় যে, অতি স্বাভাবিক ও সাধারণ মানের বিচ্যুতি বা ব্যতিক্রমকেই অনেকে গুরুতর সমস্যা বা রোগের লক্ষণ বলে পেরেসান হয়ে থাকেন। যৌন সমস্যা নিয়ে আলোচনা দূরে থাক এই শব্দটি লেখা পর্যন্ত সংবাদপত্রে অযাচিতভাবে নিষিদ্ধ করে রাখা হয়েছে যদিও সর্বরোগ নিরাময়কারীদের এ ব্যাপারে অর্ধ কিংবা পূর্ণ পৃষ্টা বিজ্ঞাপন প্রায় প্রতিদিন প্রকাশ করা হয়ে থাকে। তাই আমরা ঘুমের সমস্যাদি নিয়ে আলোচনা করবো। বিশেষ  করে এই নিদ্রাদেবীকে তুষ্ট করতে যারা ওষুধের উপর প্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন তাদের জন্য কিছু কথা বলবো।

আমরা কখনোই ঘড়ির কাটা ধরে একই সময়ে সবদিন নাস্তা খেতে বসি না কিংবা গোসল পর্বটি সেরে ফেলি তা নয়। তা যেমন প্রায় অসম্ভব এবং অপ্রয়োজনীয়, তেমনি সবদিন একই সময়ে ঘুম আসবে বা প্রয়োজনীয় (?) সময় নিয়ে ঘুমুতে পারবে না সেটাও তেমন কোন জরুরী বিষয় নয়। তবে একথাও সত্যি কারো কারো জন্য কখনো কখনো ঘুমের ব্যাঘাত একটি সমস্যা হিসেবেই দেখা দেয়।  এদের মধ্যে স্বল্প সংখ্যকের সমস্যা আবার অতিরিক্ত ঘুমের। আমরা অনিদ্রা বা ঘুমের ঘাটতি বা ব্যাঘাত নিয়েই আমাদের আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখবো। ঘুম কি, কেন আমরা ঘুমাই এর কি প্রয়োজনীয়তা এ নিয়ে প্রচুর বিতর্ক রয়েছে। এমনকি ঘুমের আদৌ কোন প্রয়োজনীয়তা রয়েছে কিনা সে ব্যাপারেও অনেক বিজ্ঞানী প্রশ্ন তুলেছেন। ‍কিন্তু ঘুমের ব্যাঘাত হলে পরদিন অনেকেই ক্লান্তি, অবসাদ, মনোযোগ হীনতা,  আবেগজনিত সমস্যা প্রভৃতির অভিযোগ করে থাকেন।

দেখা গেছে, ১০ -২০ %, ক্ষেত্রবিশেষ ৩০% লোক অনিদ্রা রোগে ভুগে থাকেন। এই অনিদ্রা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অন্য কোন ধরনের শারীরিক কিংবা মানসিক সমস্যার কারণে ঘটে থাকে। যেমন যেকোন ধরনের শারীরিক ব্যথা, বিষণ্নতা রোগ, উদ্বেগাধিক্য রোগ, ডিমেনশিয়া, হঠ্যাৎ করে ঘুমের ওষুধ বা মদ খাওয়া ছেড়ে দিলে কাশি, চুলকানি, কিংবা অতিরিক্ত চা বা মদ্যপান, জায়গা বদল হলে, বিছানা বদল হলে, দেশ বদল হলে,শিফটিং ডিউটি থাকলে, আবহাওয়াগত পরিবর্তণ (অত্যধিক গরম, অধিক শব্দ ইত্যাদি) প্রভৃতি।

তাছাড়া একটি কথা আমরা ভুলে যাই যে, বয়স বাড়লেই ঘুমের পরিমাণ এমনিতেই কমে যায়। বৃদ্ধদের অতিরিক্ত ঘুমের কোনই প্রয়োজন নেই। তদুপরি যদি দিনে ঘুমানোর অভ্যাস থাকে তা হলেও রাতে ঘুম আরো কম হবেই।

ঘুমের ওষুধ কেন নয় , তার কুফল কি তা নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ এখানে যেমন নেই, তেমনি খুব একটা প্রয়োজনও নেই। কেননা অনেকেই এ ব্যাপারে কমবেশি অবগত রয়েছেন। আমরা ওষুধ ছাড়া কিভাবে স্বাভাবিক ভাবে ঘুমানো যায় সহজভাবে কেমন করে নিদ্রাদেবরি কোলে মাথা রেখে সুখে স্বপ্নে রাত্রিটা কাটিয়ে দেয়া যায়, সে ব্যাপারে কয়েকটি সাধারণ নিয়মের কথা আলোচনা করবো।

যা করবেনঃ

১) অনিদ্রার যদি কোন কারণ খুজে পাওয়া যায়, যা ‍উপরে উল্লেখ  করা হয়েছে তার চিকিৎসা করতে হবে।

২) ঘুমানোর বিছানাকে শুধুমাত্র ঘুমানোর জন্যই ব্যবহার করবেন। অর্থ্যাৎ ঘুমুতে যাওয়ার আগে তাতে শুইবেন না এমনকি শুয়ে বইপড়া কিংবা টিভি দেখাও অভ্যাস করবেন না।  এই নিয়মের হেরফের করবেন না।

৪) ঘুমানোর পরিবেশ যাতে অনুকুলে থাকে তার নিশ্চয়তা বিধান করবেন। যেমন বিছানাটি পরিচ্ছন্ন, আরামপ্রদ হওয়া বাঞ্চনীয় যতটুকু সম্ভব শব্দহীন, আলোহীন রাখবেন। তাপমাত্রা আারামপ্রদ পর্যায়ে যাতে থাকে এমনকি বেডশীট, বালিশ প্রভৃতিও যাতে প্রীতিদায়ক ও সুখকর হয় সেদিক নজর রাখতে হবে।

৫) প্রতিদিন ব্যায়াম করার চেষ্টা করবেন তবে তা যেন অতিরিক্ত না হয় এবং অবশ্যই দিনের প্রথম ভাগে করে নেবেন। বিকেল থেকে ঘুমাবার সময় পর্যণ্ত সময়টিকে নয়।

৬) কারো কারো জন্য ঘুমানোর ‍আগে এক গ্লাস গরম দুধ খাওয়া কাজে লাগাতে পারে।

৭) আবার কারো কারো ক্ষেত্রে গরম পানিতে গোসল করে নিলেও সুবিধে হতে পারে।

৮) ঘুমাতে গেলে যদি ঘুম না আসে উঠে পড়ুন এবং অন্য একটি রুমে গিয়ে বসে থাকুন যতক্ষণ না খুব ঘুম পাচ্ছে। এর মাঝখানে নিজেকে শান্ত ও Relaxed করতে চেষ্টা করুন। এমন কিছু করবেন না যাতে মস্তিষ্ক বা চিন্তা আরো উন্নতি উদ্দীপ্ত হয়।

৯) ঘুমাতে যাওয়ার আগে প্রশান্ত হয়ে বিছানায় যাবেন। আপনার মনে যেন সিরিয়াস চিন্তা, কর্মপরিকল্পনা প্রভৃতি পোকা না থাকে তার দিকে নজর দিন। এসব ব্যাপার ঘুমানোর অন্তত ঘন্টাখানেক আগেই শেষ করে নিবেন।

১০) শিথীলকরণ পদ্ধতি (Relaxation Techniqe) নিয়মিত অনুশীলন করলে তা বিশেষ উপকারে আসবে।

১১) সবশেষে মনে রাখবেন মনে রাখবেন বেশি ঘুমানোর চেয়ে কম ঘুমানোই সবদিক দিয়েই উত্তম।

যা করবেন নাঃ

১) দুপুরে বা বিকেলে না ঘুমানোই ভালো।

২) বিকেলে দিকে ব্যায়াম বা অন্য কোন মস্তিস্ক উদ্দীপ্ত করতে পারে তেমন কিছুতেই নিয়োজিত না হওয়া।

৩) চা,  কফি প্রভৃতি সন্ধ্যার দিকে খাবেন না।

৪) রাতে ভুরিভোজ করবেন না।

৫) ক্ষুদা নিয়ে ঘুমাতে যাবেন না।

৬) বিছানায় শুয়ে টিভি দেখা বা পড়াশুনা করবেন না।

৭) ঘুমানোর আগে প্রচুর পানি কিংবা মদ খাবেন না।

অন্যান্য পদ্ধতিঃ

১) ক্রনোথেরাপী যদি দীর্ঘস্থায়ী অনিদ্রায় ভুগেন তবে বর্তমানে এই পদ্ধতি খবুই কার্যকরী বলে মনে করা হয়।

২) সাইকোথেরাপি বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে কখনো সাইকোথেরাপীর প্রয়োজন হতে পারে।

৩) কারো কারো জন্য EMG/ Tbeta বায়োফিডব্যাক এবং অন্য কারো জন্য বায়োফিডব্যাক কাজে লাগতে পারে।

৪) শিথীলকরণ পদ্ধতি কথাও পূর্বেই বলেছি।

সংক্ষেপে বলা যায়, উপরাক্ত ধরনের Sleep Hygiene বা ঘুমের পরিচর্যাগেো মেনে চললে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কোন ওষুধ ব্যতিরেকেই আপনি সুখে নিদ্রায় যেতে পারেন। মনে রাখবেন ঘুমের পিছনে ছুটে বেড়ানো আলসার পিছনে ছুটে বেড়ানোর মতোন। ঘুম কেন হয় না এই চিন্তা অস্থিরতা যেন ঘুম না আসার কারণ হয়ে না দাঁড়ায়।


Leave a Reply

Call Now!