এইডসের কারণে বক্ষব্যাধি

  • 0

এইডসের কারণে বক্ষব্যাধি

 এইডসের কারণে বক্ষব্যাধি

এইডস নামটি শুনলেই আমাদের সকলের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। কারণ এইডস হচ্ছে একটি মরণঘাতক সংক্রামক ব্যাধি। বর্তমানে আমাদের দেশসহ সারা বিশ্বের চিকিৎসা বিজ্ঞান অনেক উন্নত। কিন্তু এইডস এমন একটি ব্যাধি যার কোন চিকিৎসা পদ্ধতি বা প্রতিষেধক এখনও কোথাও আবিষ্কৃত হয়নি। এ বাধির শেষ পরিণতি হচ্ছে দুঃসহনীয় মৃত্যু। বুকের অসুখ বিসুখের সাথে এর ওতঃপ্রোত ও সম্পর্ক। এইডস হচ্ছে একটি জীবানু ঘটিত রোগ। এইডস জীবানুর সম্পূর্ণ নাম হচ্চে এইচআইভি। এইডস একটি ভয়ংকর মরণব্যাধি। এইডসের জীবানু যদি কোন ব্যক্তির দেহে সংক্রমতি হয় তাহলে তার দেহের সকল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। এইডসের জীবানু দ্বারা আক্রান্ত রোগীর রোগপ্রতিরোধ শক্তি সম্পূর্ন ধ্বংস হয়ে যায় এবং রোগী ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে পড়ে।

এইডস

এইডস

বিভিন্ন ধরনের রোগের জীবানুর কারণে এইডস রোগী অতিদ্রুত বক্ষ ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে থাকে, যেমন নিউমোসিসটিস কেরি নাই, নানা প্রকারের যক্ষার জীবানু, সাধারণ রোগ জীবানু (নিউমোক্কাস, এইচ ইনফ্লুয়েঞ্জি) ইত্যাদি। এ সকল জীবানুর মধ্যে নিউমোসিসটিস কেরি নাই নিউমোনিয়ার জীবানু এইডস রোগীদের বক্ষব্যাধির একটি অন্যতম কারণ।

দেশ ভেদে এইচআইভিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের বুকের রোগ বালাইয়ের কারণও বিভিন্ন হয়ে থাকে। যেমন- আফ্রিকার এইডস রোগীরা বক্ষব্যাধিতে ভুগে যক্ষার জীবাণু দ্বারা। কিন্তু ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় বক্ষব্যাধির প্রধান কারণ হল নিউমোনিয়া জীবানু।

কোন ব্যাধির জীবানু দ্বারা এইচ আইভিতে আক্রান্ত ব্যক্তি বক্ষ ব্যাধিতে ভুগছে তা নির্ণয় করা চিকিৎসকগণের নিকট একটু কষ্টসাধ্য কাজ। এর মধ্যে যক্ষার জীবানু দ্বারা যদি কোন ব্যক্তি বক্ষব্যাধিতে আক্রান্ত হয় তবে সেই ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া খুবই জটিল। কারণ এসকল ক্ষেত্রে কফ পরীক্ষা, বুকের এক্সরে এবং টিউবারকুলিন টেস্ট ইত্যাদি দ্বারা খুব বেশি সুফল পাওয়া যায না।

নিউমোসিসটিস কেরি নাই নিউমোনিয়ার জীবানু দ্বারা আক্রান্ত ব্যক্তির রোগ নির্ণয়ের জন্য কফ পরীক্ষা করা হয়, আবার কখনও ব্রংকোসকপির সাহায্যেও রোগ নির্ণয় করা হয়।

এইডসে আক্রান্ত কোন ব্যাক্তির দেহে যদি যক্ষার জীবানু সংক্রমিত হয় তবে তার ফুসফুসের বিশেষ ক্ষতি হবে না। কারণ এই জীবানু ফুসফুস ছাড়া অন্য স্থানে যেমন প্রন্থিতে সংক্রামণ ঘটায়। নিউমোসিটিস কেরি নাই নিউমোনিয়ার জীবানু দ্বারা আক্রান্ত ব্যক্তির ফুসফুস বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়।

যক্ষার বা নিউমোনিয়ার জীবানুকে ধ্বংস করার জন্য চিকিৎসকগণ সাধারণত কোট্রামোক্সজল ব্যবহার করে থাকেন। তবে এতে রোগী অল্প কিছুদিন সুস্থ থাকেন। পরে আবার জীবানু দ্বারা আক্রান্ত হন। কারণ এই জীবাণু একেবারে নির্মূল করা সম্ভব নয়। যক্ষার জীবানু দ্বারা আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি সাধারণত কখনও প্রচন্ড আকার ধারণ করে না। সব সময় খুশখুষে কাশি থাকে এবং কফের পরিমাণও অল্প হয়ে থাকে।

এইচআইভিতে আক্রান্ত রোগীর দেহে নিউমোনিয়ার জীবানু বিশেষভাবে ফুসফুসেই আক্রমণ করে। ফলে রোগী প্রচন্ড জ্বরে ভোগে, খাবারে অনীহা দেখা দেয়। ওজনের পরিমাণ কমতে থাকে এবং রোগীর ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে মৃত্যুর পথে চলে যায়।  এইডস রোগীদের যক্ষার জীবানু ঘটিত বক্ষব্যাধির চিকিৎসা করা কষ্টসাধ্য ব্যাপার। এসকল ক্ষেত্রে যক্ষার প্রতিষেধকসমূহ সাধারনত রোগীর দেহে কোন কার্যকরী ফল দেয় না। এইডস  এমন একটি ব্যাধি যার প্রতিকার কখনও সম্ভব নয়। তবে একটু সচেতন থাকলে এটি খুব সহজেই প্রতিরোধ করা সম্ভব। বাংলাদেশসহ সমস্ত বিশ্বে এইচআইভি রোগীর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। তাই আমাদের সকলের উচিত সচেতন হয়ে চলা এবং সকলকে এ ব্যাপারে সর্তক করা। আমাদের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা দ্বারাই সম্ভব এ অভিশাপ থেকে সকলকে মুক্ত করা।

 

ডা. কে এম মোস্তফা হোসেন

পরিচালক, জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল

মহাখালী, ঢাকা।


  • 0

অ্যাজমা বা হাঁপানীর আধুনিক চিকিৎসা

অ্যাজমা বা হাঁপানীর আধুনিক চিকিৎসা

 

শ্বাসকষ্টের ফলে  যে রোগের উদ্ভব হয়ে থাকে তাকেই সাধারণত হাপানি বা অ্যাজমা বলা হয়। এটি মানুষের দেহের একটি মারাত্মক যন্ত্রণাদায়ক ব্যাধি। বর্তমানে সারা বিশ্বের প্রায় লাখ লাখ মানুষ এ রোগে আক্রান্ত। যে কোন বয়সেই মানুষ এ রোগের কবলে পড়তে পারে। একজন সুস্থ ও সাধারণ মানুষের চেয়ে এ ধরনের রোগীর শ্বাসনালী সহজে স্পর্শকাতর হয়। তাই বিভিন্ন কারণে শ্বাসনালী সংকুচিত হয় এবং শ্বাসকষ্টের শুরু হয়।

সাধারণত বংশগতভাবে হাপানির সংক্রমণ হতে পারে। এছাড়া অ্যাজমা বা হাঁপানির আর একটি প্রধান কারণ হচ্ছে নানা ধরনের এলার্জি। এলার্জি সৃষ্টিকারী যে কল উপাদান যেমন ঘাসের বা ফুলের রেণু, ধোঁয়া, ঘরে বা অফিসে জমে থাকা ধুলাবালি, পোষা প্রাণীর লোম, নানা ধরনের ছত্রাক ইত্যাদি নিঃশ্বাসের সাথে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে সর্দি, কাশি এবং শ্বাসকষ্টের উপক্রম হয়। যা কিনা পরবর্তীতে হাঁপানিতে রূপ নেয়। শ্বাসকষ্ট বা অ্যাজমার এখন পর্যন্ত কোন যুগোপযুগি পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়নি। এ রোগটি সম্পূর্ণ প্রতিকার করা সম্ভব নয়। তবে বর্তমানে এর এমন চিকিৎসায় পদ্ধতি এবং ওষুধ আবিষ্কৃত হয়েছে যার দ্বারা হাপানি বা শ্বাসকষ্ট ব্যাধিটি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রেখে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন যাপন করা সম্ভব।

অ্যাজমা কোন ছোয়াচে রোগ নয়। এটি সাধারণত হয় শ্বাসনালীতে প্রদাহের কারণ। অ্যাজমা একটি শ্বাসকষ্টজনিত বক্ষব্যাধি। এ রোগের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। আবার শ্বাসকষ্ট মানেই যে হাপানি তা কিন্তু নয়। এর জন্য চিকিৎসক প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নিরীক্ষা করে নিশ্চিত হবার পর রোগীকে চিকিৎসা প্রদান করে থাকেন।

যে সকল পরীক্ষা নিরীক্ষা পদ্ধতি দ্বারা হাঁপানি বা অ্যাজমার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায়: অ্যাজমা রোগীদের রোগ নির্ণয়ের সহজ পদ্ধতি হচ্ছে লক্ষণ চিহ্নিত করা। হাঁপানি রোগীদের রক্তে ইওসিনোফিল ও আইজি এর পরিমাণ বেশি থাকে আইইজি পরীক্ষা করেও অ্যাজমার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায়।

Peak Expiratory Flow Meter (PEFM) এর সাহায্যে শ্বাসনালীর প্রতিবন্ধকতা নির্ধারণ করা হয়। রোগীর ত্বক পরীক্ষা করে অ্যালার্জেন নির্ণয় করা হয়। যেমন- স্কিন প্রিক টেস্ট

এলার্জি ছাড়া অন্য কোন কারনে অ্যাজমা হয়েছে কিনা তা বুকের  এক্সরের সাহায্যে পরীক্ষা করা হয়।

PEFM এর সাহায্যে রোগীর শ্বাসকষ্টের তীব্রতা পরিমাপ করা হয়।

চিকিৎসা ব্যবস্থাঃ এক জরিপে দেখা গেছে যে, শ্বাসকষ্টের প্রকোপ বৃদ্ধির একটি অন্যতম উপাসন হলো অ্যালার্জেন। তাই অ্যাজমা বা শ্বাসকষ্ট নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য এলার্জি সৃষ্টিকারী অ্যালার্জেন হতে যতটা সম্ভব দূরে থাকতে হবে। হাপানির ক্ষেত্রে যখন হঠ্যাৎ শ্বাসটান ওঠে তাৎক্ষনিক শ্বাসকষ্ট কমানোর জন্য উপশমকারী  ইনহেলার কিচু সময় পরপর ব্যবহার করতে হবে। সোজা হয়ে আরাম করে বসতে হবে। ধীরে ধীরে শ্বাস ফেলতে হবে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে নিতে হবে। অ্যাজমা বা শ্বাসকষ্ট ব্যাধির চিকিৎসা বুলতে বুঝায় এর লক্ষণ বা উপসর্গগমূহ দূর করে রোগটি নিয়ন্ত্রণে রাখা।

রোগীকে এ রোগ ও চিকিৎসা সম্পর্কে অবগত করা। বর্তমানে এ ব্যাধির অনেক আধুনিক ওষুধ রয়েছে। সেগুলো সঠিকভাবে ব্যবহার করলে রোগী দীর্ঘদিন নিরোগ থাকতে পারে। শ্বাসনালকে সংকুচিত হতে না দিয়ে এর প্রসারণে সহায়তা করে যে সকল ওষুধ সেগুলো হলো ব্রঙ্কোডাইলেটর যেমন- সালবুটামল, থিওফাইলিন বা এমাইনোফাইলিন,  ইপ্রাটেরিয়াম, ব্যামবুটারল ইত্যাদি।

অ্যামাইনোজ্যালথিন যেমন- অ্যামাইনোফাইলিন থিওফাইলিন। প্রদাহবিরোধী (এন্টি ইন্সফ্লামাটরি) ওষুধ যেমন- কার্টিকোস্টেরয়েড, ( বেকালোমেথাসন, ফ্লোটিকাসন, ট্রাইঅ্যামাসিনোলোন (ইত্যাদি ইনহেলার, রোটাহেলার ও একুহেলার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আর নিউকোট্রাইন নিয়ন্ত্রণের জন্য যেগুলো ব্যবহৃত হয়- মন্টিলুকাস্ট, জেফরিলুকাস্ট  ইত্যাদি।

এছাড়া হাঁপানির তীব্রতা অনুযায়ী নেবুলাইজার ব্যবহার করা হয়।

হাঁপানি বা শ্বাসকষ্টের রোগীদের একটি উত্তম চিকিৎসা পদ্ধতি হচ্ছে ভ্যাকসিন বা ইমিইনোথেরাপি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক স্বীকৃত এটি একটি আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি, ওষুধের পাশাপাশি এটি ব্যবহার করলে রোগীদের কার্টিকোস্টেরয়েডের ব্যবহার কমে যায়। তবে সাম্প্রতিককালে আমেরিকার বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এসব ভ্যাকসিন বা এলার্জি টিকার কার্যকারিতা বেশি দিন থাকে না।

ব্যায়াম, খেলাধুলা বা ঠান্ডায় যাবার পূর্বে সোডিয়াম ক্রোমোগ্লাইকেট ব্যবহার করা হয়। হাঁপানি বা অ্যাজমা হলে এখন আর ভয় বা দুশ্চিন্তা করার কোন কারণ নেই। সুষ্ঠু সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে এ রোগ সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। বাংলাদেশেও এখন উন্নত দেশগুলোর মতো চিকিৎসা পদ্ধতি চালু হয়েছে। শ্বাসকষ্টের প্রকোপ দেখা দিলে অবহেলা করা উচিত নয়। ফলে এটি দীর্ঘস্থায়ী হয়ে যায়। হাপানি নিরাময়ে চিকিৎসক, রোগীসহ সমাজের সকল স্তরের মানুষকের সচেতন থাকতে হবে।

 

ডাঃ  এ কে, এম মোস্তফা হোসেন

সহযোগী অধ্যাপক, রেসপিরেটরি মেডিসিন

জাতীয় বক্ষ্যবাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, মহাখালী, ঢাকা।


Call Now!