সার্ভাইক্যাল স্পনডাইলোসিস – ঘাড়ের ব্যাথা হাড়ের ব্যাথা

সার্ভাইক্যাল স্পনডাইলোস ঘাড়ের ব্যাথা – হাড়ের ব্যাথা

ডা. এ কে এম সালেক

ফিজিক্যাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞ

ঘটনা এক:

তিনি নিজেও ডাক্তার। ডেন্টাল সার্জন। অহরহ রোগীদের চিকিৎসা দিচ্ছেন। হঠাৎ একদিন। এক রোগীর দাঁত তোলার সময় ঘাড়ে তীব্র ব্যথা অনুভব করলেন। একটি এ্যাম্বুলেন্স ডেকে ছুটলেন বন্ধু ডাক্তারের কাছে। এক্সরে এবং অন্যান্য পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখা গেলো তার মেরুদন্ডের ঘাড়ের হাড়ে ছোট ছোট প্রজেকশন দেখা যাচ্ছে। তিনি বুঝলেন তার সার্ভাইক্যাল স্পনডাইলোসিস হয়েছে।

ঘটনা দুই:

ড. হাসান একটি সিপ্মোজিয়ামে প্রবন্ধ পড়ার সময় হঠাৎ ঘাড় ফেরাতে গিয়ে তীব্র ব্যাথা অনুভব করলেন। ব্যাথা ডান হাতের বুড়ো আঙুল পর্য্ন্ত ছড়িয়ে পড়লো। কিছুতেই স্বস্তি পাচ্ছিলেন না। ডান হাতটি মাথার ওপরের দিকে নিতেই একটু আরামবোধ করলেন। সিম্পোজিয়াম শেষে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে গেলেন। পরীক্ষা নিরীক্ষার পর চিকিৎসক জানালেন সার্ভাইক্যাল স্পানডাইলোসিস

এই দুটো উদাহারণ বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে নেয়া। প্রতিদিন আমাদের কাছে কোনো না কোনো রোগী আসেন মেরুদন্ডের সমস্যা নিয়ে। ঘাড়ে ব্যাথা নিয়ে। এসব নিয়েই আজকের কথকতা। দুইটি হাড়ের মধ্যবর্তী অংশের ডিস্ক বা চাকতি শুকিয়ে ফাঁক খুব বেশি কমে যায়। দুই কাশেরুকার মাঝের ইন্টারভার্টিব্রার ছিদ্র দিয়ে আমাদের হাড়ের স্নায়ুগুলো বের হয়। যদি অসটিওফাইটগুলো স্নায়ুতে খোচা দেয় তবে সেই ব্যাথা বাহু এমনকি হাতের আঙুল পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে এই অবস্থাকে সারভাইকো ব্রাকিয়ালজিয়া বলে।

কি হয়?

অনেকের সার্ভাইক্যাল স্পনডাইলোসিস অজানা থাকে। কোন উপসর্গ ছাড়াই দীর্ঘদিন এমনকি আজীবনও সুস্থ থাকেন কেউ কেউ। উপরের ঘটনাগুলো থেকে স্পষ্টভাবে আপনারা এ রোগের লক্ষণ বুঝতে পারবেন।

  • হঠ্যাৎ করেই বা অ্যাকিউট অযথা ধীরে ধীরে এ ব্যাথা শুরু হতে পারে।
  • রোগী ঘাড়ের পিছনে ব্যাথা অনুভব করবেন।
  • ঘাড় নাড়াতে অসুবিধা হবে, সামনে ঝুকতে বা পাশে ফিরতে কষ্ট হবে।
  • ক্ষেত্রবিশেষ কাশি দিতে ইলেকট্রিক শকের মতো ব্যাথা হবে। খুব বেশি ব্যাথার ক্ষেত্রে রোগী হাত, মাথার উপর তুলে রাখতে আরামবোধ করবে। অনেকের ঢোক গিলতে অসুবিধা হবে।
  • এ রোগে যদি স্নায়ু আক্রান্ত হয়ে তবে একটি হাত বা তার অংশবিশেষ ব্যাথা থাকতে পারে।

কারা বেশি আক্রান্ত হন

ত্রিশোর্ধ্ব যেকোন বয়সী পুরুষ বা মহিলা এ রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। তবে যারা ঘাড় ঝুকিয়ে কাজ করেন বা ঘাড়ের মুভমেন্ট বেশি হয় এমন কাজ করেন, (যেমন সার্জন, দাঁতের ডাক্তার, অভিনেতা, গাড়ির ড্রাইভার প্রমুখ)

তাদের এ রোগ বেশি হয়।

দৈনন্দিন জীবনে ব্যক্তিগত অভ্যাসের তারতম্যের জন্যও এটি হতে পারে। যেমন দীর্ঘদিন মাথার নিচে মোটা বালিশ ব্যবহার করলে বা শুয়ে ঝুকে বই পড়লে কিংবা এসি নন এসি পরিবেশে ঘন ঘন অবস্থান পরিবর্তন করলে এ রোগের সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

রোগ নিরূপন

উপসর্গ এবং লক্ষণ বিবেচনায় ডাক্তারি পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে রোগ শনাক্ত করা হয়। ঘাড়ের এক্সরে এক্ষে্ত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করে।

তীব্র ব্যাথায় অবস্থাভেদে পূর্ণ বিশ্রাম নিতে হবে। প্রয়োজনে ব্যাথানাশক ও মাসল রিলাক্সেন্ট জাতীয় ওষুধ চিকিৎসকের পরামর্শানুযায়ী খেতে হবে। এক্ষেত্রে ঘাড়ের মাংসপেশিতে থার্মোথেরাপি, সর্টওয়েভ ডায়াথার্মি ও ট্রাকশন প্রয়োগ করে ভালে ফল পাওয়া যায়। ব্যাথা কমে গেলে বেশ কিছুদিন ঘাড়ের ব্যায়াম করতে হবে যাতে পরবর্তী সময়ে আবার আক্রান্ত হতে না হয়। ক্ষেত্রবিশেষ সার্ভাইক্যাল কলার পরতে হতে পারে

চিকিৎসাপ্রতিরোধ

যিনি একবার সার্ভাইক্যাল স্পন্ডিলাইটিসে আক্রান্ত হয়েছেন তাকে যে বিষয়গুলোতে সচেতন থাকতে হবে সেগুলো হচ্ছে-

  • ঘাড়ের প্রয়োজনীয় ব্যায়ামটি নিয়মিত করতে হবে।
  • শক্ত সমান বিছানায় একটি পাতলা বালিশে শোয়ার অভ্যাস করতে হবে।
  • লেখাপড়ার কাজে ‘শুণ্য’ ডেস্ক ব্যবহার করতে হবে। (শূণ্য ডেস্ক হলো যেখানে পিঠ সোজা রেখে হাত বুক বারবার রেখে লেখা যায়)
  • গোসলে গরম পানি ব্যবহার করা শ্রেয়।
  • ঘাড়ে কোনো ওজন বহন করা যাবে না।
  • কোনো প্রকার ম্যাসাজ ও মালিশ নিষিদ্ধ।

নিজেকে ঠান্ডা থেকে দূরে রাখতে হবে। এসব ব্যবস্থা যথাযথভাবে পালনের পরও যদি ঘাড়ে ব্যাথা হয় তাহলে অবহেলা না করে সঙ্গে সঙ্গে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।